রবিবার ৩, জুলাই ২০২২
EN

অপরাধ করে দেশে, আশ্রয় নেয় ভারতে

নাছির উদ্দিন শোয়েব : শীর্ষ সন্ত্রাসী, দাগি অপরাধী এবং জালিয়াত চক্রের সদস্যরা দেশে অপরাধ করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং সীমান্ত রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে তারা দেশ ছাড়ছে তা নিয়ে প্রশ্ন ঊঠছে। কতিপয় ব্যক্তির ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য পর্যন্ত নেই। এদের কাউকে কাউকে ধরতে ইন্টারপোলে রেড আ্যালার্ট জারি করা হয়।

তবে পালিয়ে যাওয়া কয়েকজনকে ভারতে আটকের পর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় এ ধরণের পলাতক ব্যক্তিকে ফিরে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এরআগে পুশব্যাকের মাধ্যমেও কয়েকজনকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে।

বাংলাদেশের এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর হাজার কোটি টাকা লোপাট মামলার মূল অভিযুক্ত ও পলাতক আসামি প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ভারতে গ্রেফতার হয়। এ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন এবং তার দুই সহযোগী ভারতে পালিয়ে গিয়ে গ্রেফতার হয়।

বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতাল প্রতারণা মামলার প্রধান আসামি শাহেদ ওরফে রিজেন্ট শাহেদকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এদিকে সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করে হত্যার প্রধান আসামি এসআই আকবর হোসেন ভারতে পালিয়ে গিয়ে আটক হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, মিরপুরের পাইকপাড়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ বেশ কয়েক বছর আগে ভারতে পাড়ি জমায়। মিরপুরের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেনও ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয় এবং সুব্রত বাইনও একই ভাবে পার্শ্ববর্তী দেশটিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

এছাড়াও চাঞ্চল্যকর মামলার আরও কয়েকজন সন্ত্রাসী পার্শ্ববর্তী দেশটিতে আত্মগোপন করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো মনে করছে এদের অনেকেই এখন আর ওই দেশটিতে অবস্থান করছে না। তাদের অবস্থান সনাক্ত করা গেলে দেশে ফিরিয়ে এনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।

জানা গেছে, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর হাজার কোটি টাকা লোপাট মামলার মূল অভিযুক্ত পি কে হালদার ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভুয়া কোম্পানির নামে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। সেই অর্থ তিনি ভারতে পাচার করেন। পি কে হালদারের এসব কোম্পানির কোনও অস্তিত্ব নেই। পরবর্তীতে ব্যাংকগুলো পি কে হালদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারে এবং বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অভিযোগ দায়ের করে।

পরে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এই বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। কিন্তু দেশের টাকা এভাবে অবাধে পাচার করা হলেও দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে আসেনি। এমনকি বিপুল পরিমান টাকা পাচারের পর দেশ থেকে পালিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

তবে এ ঘটনায় দেশে হৈচৈ পড়ে গেলে বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে রেড আ্যালার্ট জারি করে ইন্টার পোল। এরপর পি কে হলদার এতদিন কোথায় ছিল তা জানা ছিল না দেশের নিরাপত্তা সংস্থার। এমনকি ভারতে গ্রেফতার হওয়ার পরই কেবল বাংলাদেশ গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারে।

এদিকে ভারতে গ্রেপ্তার প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পি কে হালদার) দেশে ফেরাতে দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে অফিসিয়ালি বাংলাদেশ এখনো ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অবহিত না হলেও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কে দোরাইস্বামী বলেছেন, বাংলাদেশি পলাতক ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে আটক করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর হাইকমিশনার গণমাধ্যমকে বলেন, এখন আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এটি একটি প্রক্রিয়া, এর বাইরে বিশেষ কিছু নয়। গত ১৪ মে পি কে হালদারসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। পরে তাকে কয়েক দফা রিমান্ডে নেয়া হয়।

এরআগে ২০২০ সালে সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর ভারতে গিয়ে ধরা পড়ে। ঘটনার পর পালিয়ে থাকার ২৮ দিনের মাথায় সিলেটের কানাইঘাটের ডনা সীমান্ত থেকে জেলা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই তখন জানায়, জেলা পুলিশের একটি দল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আকবর হোসেনকে গ্রেফতার করে।

একটি সূত্র জানায়, ভারতের মেঘালয়ের শিলচরের ডোনা বস্তি এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখে স্থানীয় খাসিয়ারা। পরে আকবরকে আটক করে তারা বেধে রাখে।

পরে তারা তাকে বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ীদের কাছে হস্তান্তর করে। গরু ব্যবসায়ীরা তাকে রহিম নামের স্থানীয় এক লোকের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর তাকে ডোনা ক্যাম্পে রাখা হয়। সেখান থেকে কৌশলে পুলিশ তাকে দেশে ফেরত আনে।

এরআগে ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাতখুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন পাঁচ সহযোগীসহ কলকাতায় গ্রেফতার হয়। কলকাতা পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম স্কোয়াডের (এটিএস) এসিপি অনিমেষ সরকারের নেতৃত্বে একটি টিম এ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।

স্টেশনের একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কৈখালী এলাকার একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে নূর হোসেনসহ সাত খুন মামলার আসামি আনোয়ার হোসেন আশিক, সুমন, শামীম সহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।

জানা যায়, গ্রেফতারের সময় নূর হোসেনের কাছ থেকে গুলিভর্তি একটি রিভলবার, বাংলাদেশ ও ভারতের ১০টি মোবাইল সিম কার্ড, একটি ল্যাপটপ, পেনড্রাইভ, সিডি ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়।

বাংলাদেশ পুলিশ তখন জানায়, ইন্টারপোলের সহায়তায় তাদের গ্রেফতার করা হয়। সেখানে চিকিৎসার নাম করে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিলেন নূর হোসেন।

নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৭ মে রেড ওয়ারেন্ট জারি করে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। আর ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাকে বাংলাদেশের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *