মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

অপরাধ, ধর্ষণ ও বিশ্বাসভঙ্গ

ইবনে নূরুল হুদা: অপরাধ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সঙ্গত কারণেই কোন জাতিরাষ্ট্রই অপরাধ মুক্ত নয়। তাই অপরাধমুক্ত বিশ্ব কল্পনারও অতীত। আইনের দৃষ্টিতে অপরাধকে সভ্যতার অবদান বলা হয়। কারণ, সভ্যতা যখন ছিল না তখন অপরাধও চিহ্নিত করা হয়নি। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে অপরাধও চিহ্নিত হয়েছে এব তা নিয়ন্ত্রণে আইন ও আইন প্রয়োগকারী আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। স্থাপিত হয়েছে আদালত। অপরাধের ধরন অনুযায়ী বিচারের মাধ্যমে অপরাধীকে যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়ার প্রথাও চালু হয়েছে। যা প্রতিটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব ও সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

ইবনে নূরুল হুদা: অপরাধ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সঙ্গত কারণেই কোন জাতিরাষ্ট্রই অপরাধ মুক্ত নয়। তাই অপরাধমুক্ত বিশ্ব কল্পনারও অতীত। আইনের দৃষ্টিতে অপরাধকে সভ্যতার অবদান বলা হয়। কারণ, সভ্যতা যখন ছিল না তখন অপরাধও চিহ্নিত করা হয়নি।

সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে অপরাধও চিহ্নিত হয়েছে এব তা নিয়ন্ত্রণে আইন ও আইন প্রয়োগকারী আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। স্থাপিত হয়েছে আদালত। অপরাধের ধরন অনুযায়ী বিচারের মাধ্যমে অপরাধীকে যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়ার প্রথাও চালু হয়েছে। যা প্রতিটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব ও সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

সাধারণ ধারণা অনুযায়ি কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্ঠি অথবা সমাজের সমস্যা সৃষ্টি হয় বা কারো অধিকার ক্ষন্ন করে এমন কাজই অপরাধ। খুন, জখম, চুরি, ডাকাতি, আত্মসাৎ, লুটপাট, গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যা, রাহাজানি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নারী নিগ্রহ, ধর্ষণ, জালিয়াতি ও অর্থপাচারসহ মানুষের অধিকার হরণকারী সকল কর্মকাণ্ডই অপরাধ। আর সকল দেশের দণ্ডবিধিতে এসব অপরাধকে শাস্তিযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরাধ প্রবণতা প্রতিটি সমাজ-রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী রিচার্ড কুইনী সমাজ এবং অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন। তার ভাষায়, অপরাধ হচ্ছে সামাজিকতার দৃশ্যমান প্রতিফলন। তার বক্তব্যে তিনি ব্যক্তির অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক আদর্শ, ন্যায়-নিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের উপলদ্ধিবোধ জাগ্রতকরণ-উভয় দিকই বিবেচনা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মূলত আইনের শাসনের দুর্বলতা ও গণসচেতনার অভাবেই অপরাধ এখন আমাদের দেশে রীতিমত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

আর সুশাসনের অনুপস্থিতি, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপপ্রয়োগ আমাদের দেশে ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতার কারণ। অবশ্য দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কক্ষচ্যুতি ও নেতিবাচক রাজনীতিকেও এজন্য দায়ি করা হয়। বস্তুত, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই অপরাধ প্রবণতার ভ্রূণ সৃষ্টি হয় এবং তা নেতিবাচক রাজনীতির ছত্রছায়ায় পত্র-পল্লবে পরিপুষ্ট হয়ে এক সময় মহীরূহের রূপ লাভ করে। যেমনটি হয়েছে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে।

দেশে অপরাধপ্রবণতা যে একেবারে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে তা মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রতিবেদন থেকেই উপলব্ধি করা যায়। এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সারা দেশে নানাবিধ অপরাধ প্রবণতাসহ নারীর প্রতি সহিংসতা; বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ি, উল্লেখিত সময়ে দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত ও ক্রসফায়ারে মোট ২১৬ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

শুধুমাত্র ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৭৫ জন নারী; যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৬১ জন; পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৩২; যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ১৬৮ জন; এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ২১ নারী; ৬২৭ শিশু ধর্ষণ ও ২০টি বলাৎকারের ঘটনা ঘটেছে এই সময়ের মধ্যে। পেশাগত কাজ করতে গিয়ে ২০৯ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক সংগ্রামের বর্ষীয়ান সম্পাদক আবুল আসাদকে গ্রেফতারের মত নিন্দনীয় ঘটনাও ঘটেছে এই সময়ের মধ্যে। এ সময়ে ভারতীয় সীমান্তে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন এবং সারাদেশে গণপিটুনিতে মারা গেছেন মোট ৩০ জন। যা আমাদের দেশে ক্রমাবনতিশীল মানবাধিকার, বল্গাহীন অপরাধপ্রবণতা ও ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ অপরাধ প্রবণতা বাড়ার সাথে সাথে নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ বেড়েছে গাণিতিক হারে। দেশের অপরাধপ্রবণতার পরিসংখ্যানগুলোতে বিষয়টি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। যা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে দেশের আত্মসচেতন মানুষকে। সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলে গৃহবধূকে গণধর্ষণ ও নোয়াখালীতে বিবস্ত্র করে নারী নিগ্রহের ঘটনা পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। কিন্তু অতীতের ধর্ষণ বা নারী নিগ্রহের ঘটনায় অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ায় এধরনের অপরাধের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না বরং এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিদিনই খবরের কাগজের পাতা জুড়ে থাকছে নারীর প্রতি সহিংসতাসহ ধর্ষণের খবর। পরিসংখান অনুযায়ি চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জনগণের জানমাল, ইজ্জত-সম্ভ্রম রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের হলেও রাষ্ট্র সে ক্ষেত্রে সফলতার পরিচয় দিতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ, রাষ্ট্র নারীর সম্ভ্রম রক্ষার গ্যারান্টি দিতে পারছে না।

ধর্ষণের গতি-প্রকৃতি ও সংজ্ঞা নিয়ে নানা কথা প্রচলিত থাকলেও মূলত ‘ধর্ষণ’ এক ধরনের যৌন আক্রমণ। এটি বলপ্রয়োগ বা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে। ধর্ষণের অভিযোগ, বিচার ও শাস্তি প্রদান শাসনব্যবস্থাভেদে ভিন্নতর। তাই ধর্ষণের সংজ্ঞায়ও ভিন্নতা রয়েছে। সময়ের সাথে ধর্ষণের সংজ্ঞায় পরিবর্তনও ঘটেছে। ২০১২ সালের পূর্ব পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ধর্ষণকে কেবল নারীদের বিরুদ্ধে পুরুষদের দ্বারা সংঘটিত একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যৌবিক কাজে পুরুষকে বাধ্য করাকেও ধর্ষণের সংজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। যা ইতিবাচক হিসেবেই মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

২০১২ সালের পূর্ব পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ধর্ষণকে কেবল নারীদের বিরুদ্ধে পুরুষদের দ্বারা সংঘটিত একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করত। পূর্ববর্তী সংজ্ঞাটি ১৯২৭ সাল থেকে অপরিবর্তিত ছিল এবং এটিকে পুরাতন ও সংকীর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হত। নতুন সংজ্ঞাটি স্বীকার করে নেয় যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই ধর্ষক বা ধর্ষিত হতে পারে। এফবিআই কর্তৃক এই সংজ্ঞাটি গ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বা রাজ্য ফৌজদারি আইনের কোনো পরিবর্তন ঘটায় নি কিংবা বিচারব্যবস্থায়ও কোনো প্রভাব ফেলে নি বরং এর উদ্দেশ্য ছিল দেশজুড়ে যেন সঠিকভাবে ধর্ষণের অভিযোগ আসে।

সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই ধর্ষণ একটি গর্হিত ও ঘৃণিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে ধর্ষণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়ন এবং দণ্ডবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতীতে ধর্ষণের জন্য দণ্ডবিধিতে শুধু শাস্তির কথায় উল্লেখ থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে তার পরিবর্তন ও পরিমার্জন হয়েছে এবং ধর্ষণের জন্য অপরাধীর শাস্তির সাথে সাথে জরিমানার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের দণ্ডবিধিতে। কিন্তু এতেও ধর্ষণ বা নারীর প্রতি সহিংসতার লাগাম টেনে ধরা যায়নি। সম্প্রতি ধর্ষণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাণদণ্ড বিষয়ক রাষ্ট্রপতি একটি অধ্যাদেশ জারী করেছেন এবং তা এখন আইনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র দণ্ডবৃদ্ধি করে এই সামাজিক ব্যাধির অবসান হবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। তারা এজন্য সুশাসনের ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন। সুশাসন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া দেশ থেকে ধর্ষণ সহ অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ কোন ভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, আইন কোন চলৎশক্তি সম্পন্ন সত্তা নয় যে, আইনের কঠোরতার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে অপরাধ প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে। এমন কল্পনা করাও সঙ্গত নয়।

ধর্ষণ শুধু আমাদের দেশে নয় বরং বিশ্বের সবদেশেই সংঘঠিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটে খুবই সীমিত পরিসরে। কিন্তু আমাদের দেশে ধর্ষণবিষয়ক আইন বেশ কঠোর হলেও প্রায়োগিক দুর্বলতা ও উদাসীনতার কারণেই আমরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। ফলে এই অশুভপ্রবণতা আমাদের দেশে ক্রমবর্ধমান। এমনকি বয়স, জাতি, সংস্কৃতি বা ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণির নারীই এখন ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আমাদের অবক্ষয় এতই প্রান্তিকতায় পৌঁছেছে যে, ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু ও বৃদ্ধারাও। যা আমাদের দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আইনের দুর্বল প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগের কারণেই দেশে নারী নিগ্রহসহ ধর্ষণ এখন মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। কোন ভাবেই এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না বা টানা হচ্ছে না। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে যৌনসন্ত্রাসকে ধর্ষণ বলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য ‘ধর্ষণ’ শব্দের অপপ্রয়োগও লক্ষ্য করা হচ্ছে। যেহেতু আমাদের দেশে ধর্ষণের শাস্তি বেশ কঠোর তাই একশ্রেণির বিপথগামী নারী বিষয়টির অপব্যবহারও করতে শুরু করেছে সম্প্রতি। স্বতোপ্রণোদিত বিবাহবহির্ভূত যৌনাচারকে প্রতিপক্ষকে হয়রানী করা বা ফাঁসানোর জন্য ধর্ষণ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার একটা অশুভপ্রবণতা শুরু হয়েছে। এমন ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে। সম্প্রতি ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নূরু ও তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে এমনই একটি মামলা করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে অভিযোগকারীরা খানিকটা আইনী আনুকূল্যও পাচ্ছে। কারণ, আইনের ছিদ্র পথেই এসব ঘটনা ঘটছে।

দেশে সম্প্রতি আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যদণ্ড নির্ধারণ করা হলেও ধর্ষণের সংজ্ঞায় কোন সংশোধনী আনা হয়নি। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বিষটিকে অত্যাবশ্যকীয় বলেই মনে করছেন। তাই আইনটি পরিমার্জন হওয়া দরকার বলে মনে করেন আইনবিদরা। কারণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ৯(১)-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত ষোল বছরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করে অথবা ষোল বছরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনচারে লিপ্ত হয়, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলে গণ্য হবে।’ এই আইনে স্পষ্ট যে ১৬ বছরের নীচে হলে নারীর সম্মতি থাকলেও তা ধর্ষণ। কারণ নারী প্রাপ্তবয়স্ক নয়। তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়েও কিছুক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে তা প্রতিপক্ষকে নাজেহালের হাতিয়ারও বানানো হচ্ছে।

কারণ, ধর্ষণে যে জোরপূর্বক বা বলপ্রয়োগের বিষয় থাকে তা এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যখন শারীরিক সম্পর্ক হয় তখন সেটাকে ধর্ষণ হিসাবে গণ্য করা সঙ্গত নয়। কিন্তু পরে যখন বিয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা বা কোন কারণে বনিবনা হয় না তখন ধর্ষণ মামলা করা হয়। বিষয়টিকে ধর্ষণ নয় বরং রীতিমত প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গ সঙ্গত। তাই এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রতারণার ধারায় বিচার করায় যুক্তিযুক্ত। আর এজন্য প্রচলিত ধর্ষণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন আইনে অপরাধের হাল নাগাদ ও সময়োপযোগী ব্যাখ্যা এবং আলাদা শাস্তির বিধান থাকা উচিত। ভারতীয় আদালতের রায়েও তা পরিস্কার করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে পারস্পরিক সম্মতিতে দৈহিক সম্পর্ক ধর্ষণ নয় বরং প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আমাদের দেশেও এতদসংক্রান্ত আইন একইভাবে সংশোধিত হওয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যা খুবই যুক্তিসঙ্গত ও সময়ের দাবি।

মূলত, পারস্পরিক সম্মতিতে দৈহিক সম্পর্কের পর বিয়ে করতে অস্বীকৃতি বড় ধরনের প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গ। কিন্তু কোন বিবেচনায় তা ধর্ষণ হতে পারে না। কারণ, ধর্ষণের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের বিষয়টি এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। আমাদের দেশের দণ্ডবিধিতে এই ধরনের প্রতারণার বিচার ও শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্তু যেহেতু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এটা ধর্ষণ তাই দণ্ডবিধির ওই ধারায় কেউ মামলা করেন না। দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে অপরাধী সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদন্ডে দণ্ডিত হবে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ধারায় কাউকে মামলা করতে দেখা যায়নি বরং ঘটনার পুরো দায় পুরুষের ওপর চাপিয়ে ধর্ষণ মামলা করা হয়েছে। যা অসঙ্গতিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক।

আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অপপ্রয়োগের রয়েছে। বিবিসির ভাষ্যমতে, ২০১৮ সালের ১৫ হাজার মামলার অভিযোগের ৪ হাজারটির কোনোই সত্যতা মেলেনি। ২০১৭ সালে মাত্র সাড়ে ৭০০-র মতো মামলার বিচার হয়েছে। জামিন-অযোগ্য অপরাধ হওয়ায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বা প্রতিশোধ নিতে অনেক নারীকে এসব মিথ্যা মামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে। নারী নির্যাতন (নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ, ১৯৮৩, এবং ১৯৯৫ ও ২০০০ সালের আইনেও শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই ছিল। কিন্তু আইনের প্রায়োগিক দুর্বলতার কারণে বিচার সম্পন্নের হার মাত্র সাড়ে তিন ভাগের মতো। শাস্তির হার এক ভাগেরও নিচে।

বর্তমানে নারী ধর্ষণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে নতুন আইন প্রণীত হয়েছে। এমতাবস্থায় ধর্ষণের সংজ্ঞা বিষয়ক জটিলতা হালনাগাদ করারও আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। কারণ, বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার অপরাধকে যদি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয় তাহলে তা হবে লঘু পাপে গুরুদণ্ডের শামিল। ধর্ষণকে ধর্ষণ আর প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গকে সেভাবেই বিবেচনায় আনতে হবে। অন্যথায় ধর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুদণ্ডে সমস্যার সমাধান হবে না বরং তা সামাজিক বিপর্যয়ই সৃষ্টি করবে। কারণ হবে জনদুর্ভোগের।

inhuda71@gmail.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *