মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

আফগানিস্তানে তালেবান সফলতার নেপথ্যে

এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত ইস্যূ হচ্ছে আফগানিস্তান ও তালেবান। যার বর্তমান অবস্থা ও পরিস্থিতি অর্থাৎ আফগানিস্তানে তালেবানের দ্রুত অগ্রযাত্রা এশিয়া এবং বিশ্বকে নতুন মাত্রা ও মেরুকরন করতে বাধ্য করছে। একদিকে আফগানিস্তানে তালেবান সদস্যরা দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা অর্থাৎ ৩৪ টি প্রদেশের ১৯ টি প্রদেশ ইতিমধ্যে দখল করে নিয়েছে। বিশেষকরে পাক-চীন সীমান্ত তালেবানদের নিয়ন্ত্রনে। অপরদিকে তালেবান নেতৃবৃন্দ যুক্তরাষ্ট্র,রাশিয়া, চীন,ভারত-পাকিস্তান সহ আঞ্চলিক ও বিশ্বনেতাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনায় অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। ফলে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হোক তারা সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে একের পর এক।

এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত ইস্যূ হচ্ছে আফগানিস্তান ও তালেবান। যার বর্তমান অবস্থা ও পরিস্থিতি অর্থাৎ আফগানিস্তানে তালেবানের দ্রুত অগ্রযাত্রা এশিয়া এবং বিশ্বকে নতুন মাত্রা ও মেরুকরন করতে বাধ্য করছে।

একদিকে আফগানিস্তানে তালেবান সদস্যরা দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা অর্থাৎ ৩৪ টি প্রদেশের ১৯ টি প্রদেশ ইতিমধ্যে দখল করে নিয়েছে। বিশেষকরে পাক-চীন সীমান্ত তালেবানদের নিয়ন্ত্রনে।

অপরদিকে তালেবান নেতৃবৃন্দ যুক্তরাষ্ট্র,রাশিয়া, চীন,ভারত-পাকিস্তান সহ আঞ্চলিক ও বিশ্বনেতাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনায় অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। ফলে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হোক তারা সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে একের পর এক।

সুইডেনের আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষক অ্যান্ডার্স ফেঞ্জ তালেবানদের এত দ্রুত অগ্রসর হতে পারার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন।

কারণগুলোর হচ্ছে :

দুর্বল আফগান সেনাবাহিনী, তালেবানের প্রতি পাকিস্তানের গোপন সমর্থন, আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে নতুন কৌশল, পুরনো যুদ্ধবাজদের বিশৃঙ্খলা এবং যুদ্ধক্লান্ত জনগোষ্ঠী মুখ্য।

১) দুর্বল আফগান সেনাবাহিনী :

আফগান সরকারের সেনাবাহিনীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী তালেবানদের সৈন্য সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার থেকে ৮৫ হাজারের মধ্যে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তান ত্যাগ করে তখন আফগান সেনাবাহিনী হঠাৎ করেই বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে।

সুইডিশ ডিফেন্স রিসার্চ এজেন্সির (এফওআই) আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেলেন ল্যাকেনবাউয়ার বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আফগান সেনাবাহিনীর কার্যকরী কোনো বিমানবাহিনী নাই।

আফগানিস্তানের নিজস্ব যে বিমানবাহিনী রয়েছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা নির্মিত এবং অর্থায়নে কাজ করত। কিন্তু যখন তারা যখন আফগানিস্তান ত্যাগ করে, তখন বিমানবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ এবং অর্থায়ন স্থগিত হয়ে যায়।

এছাড়াও তালেবানরা আফগান বিমানবাহিনীর পাইলটদের বিশেষভাবে টার্গেট করে হামলা এবং হত্যা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বোমারু বিমান পারস্য উপসাগর এবং কাতার ঘাঁটি থেকে সঙ্গে কিছুটা বিমান সহায়তা প্রদান করলেও, সে আক্রমণের কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

সুইডেনের আফগান বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডার্স ফেঞ্জ বলেন, আফগান সরকারের মতো সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনীও দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং গুরুতর আমলাতন্ত্রের ডামাডোলে ভুগছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তানে একটি কার্যকরী রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনী তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে।

২) তালেবানের প্রতি পাকিস্তানের গোপন সমর্থন :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আফগানিস্তান সরকার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, ইরান এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে তালেবানদের সমর্থন ও সহযোগীতা করার অভিযোগ এনেছে, যদিও তারা সবাই এটা অস্বীকার করে আসছে।

তালেবানদের অগ্রযাত্রায় পাকিস্তানের সমর্থন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অ্যান্ডার্স ফেঞ্জের বলেন, পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল দ্বিমুখী।

শুরু থেকেই বলে আসছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আছে, কিন্তু একই সঙ্গে তালেবান নেতৃত্বকেও সুরক্ষা দিয়েছে এবং তাদের পাকিস্তানে থাকার অনুমতি দিয়েছে।

পাকিস্তান তালেবানদের সামরিক সরঞ্জাম দিয়েও সাহায্য করছে বলে মন্তব্য করেন ফেঞ্জ।

৩) আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে নতুন কৌশল :

উত্তর আফগানিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই তালেবানদের জন্য একটি দুর্বল পয়েন্ট। ১৯৯০-এর দশকে ’উত্তর-জোট’ নামে প্রতিরোধ আন্দোলন এবং তালেবানদের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে একটি শক্তিশালী জনসমর্থন ছিল।

উত্তর আফগানিস্তানে তাজিক এবং উজবেকরা বৃহত্তম জাতিগত গোষ্ঠী হলেও তালেবান সংগঠিত হয়েছে আফগানিস্তানের বৃহত্তম জাতিগত গোষ্ঠী পশতুনদের নিয়ে। মার্কিন প্রত্যাহারের সময়ে তালেবানরা উত্তরে তাদের কৌশল পরিবর্তন করার জন্য প্রচুর সময় পেয়েছে।

অ্যান্ডার্স ফেঞ্জ বলেন, তালেবানরা উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় গণআন্দোলন বন্ধে তাদেরকে ছোট ছোট জাতিগত গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে আন্দোলন করতে উৎসাহিত করেছে এবং পরবর্তীতে যারা তাদের দ্রুত অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।

এছাড়াও ১৯৯০-এর দশকে তারা উত্তরের এলাকাগুলো জয় করে সেখানে পশতুন গভর্নরদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল।

কিন্তু এবার তারা পশতুনদের না বসিয়ে অন্যান্য সংখ্যালঘু, যেমন উজবেক, তাজিক এবং হাজারাদের ক্ষমতায় আনার জন্য কাজ করেছে বলে জানান অ্যান্ডার্স ফেঞ্জ।

৪) পুরনো যুদ্ধবাজদের বিশৃঙ্খলা :

অতীতে তালেবানদের সঙ্গে লড়াই করা মিলিশিয়া এবং আফগান যুদ্ধবাজরা আগের তুলনায় কম সংগঠিত এবং সজ্জিত।

সুইডিশ ডিফেন্স রিসার্চ এজেন্সির (এফওআই) আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেলেন লেকেনবাউয়ার বলেন, প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি তালেবান বাহিনীর পাশাপাশি উত্তর-জোট গঠনকারী যুদ্ধবাজদেরও বিরোধিতা করেছেন যা যুদ্ধবাজদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে।

তালেবানদের ঠেকাতে আশরাফ গনি তাদের একত্রিত করার জন্য যা করতে পারতেন, তা করেননি।

তালেবানরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তাদের প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দমিয়েছে এই প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে যে, তাদের সৈন্যরা প্রতিপক্ষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড়। স্বভাবতই তালেবানদের প্রতিহত করার সময় আফগান জনগণের শক্তি এবং ইচ্ছা কম দেখা গেছে।

৫) যুদ্ধক্লান্ত জনগোষ্ঠী মুখ্য :

হেলেন ল্যাকেনবাউয়ার বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বারা আক্রান্ত যুদ্ধের নিপীড়িত মানুষ আফগানরা। আফগানরা যুদ্ধবিগ্রহ এলাকায় বেঁচে থাকার জন্য তাদের সুযোগ-সুবিধাগুলো অনুকূল রাখার চেষ্টা করে।

কৌশল হিসেবে তারা উভয় পক্ষকে সমর্থন করারও চেষ্টা করে। দু’টি সন্তান থাকলে একটিকে সরকারি সেনাবাহিনীতে এবং অপরটিকে তালেবানদের কাছে পাঠায়।

অনেক দরিদ্র মানুষের পালানোর কোনো জায়গা নাই এবং স্বভাবতই তালেবানদের শর্তাবলী গ্রহণ করা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প পথও থাকে না, বলে মন্তব্য করেন হেলেন।

আফগানিস্তানে তালেবান আন্দোলনের মতাদর্শ প্রাচীন সাংস্কৃতিক কোড ’পশতুনওয়ালির’ সঙ্গে ইসলামের একটি মৌলবাদী ব্যাখ্যার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে 'তালেবান' নামকরণ করা হয়।

তালেবান আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করলেও এর ভিত্তি অনেক আগেই পাকিস্তানি শরণার্থী শিবিরে স্থাপন হয়েছিল যখন ১৯৭৯ সালে অনেক আফগান সোভিয়েত আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পাকিস্তানে পালিয়ে এসেছিল।

১৯৮৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয় ও প্রত্যাহারের পর যুদ্ধবাজ আফগানরা নিজেদের মধ্যে অর্ন্তকলহে জড়িয়ে পড়ে যাতে ঘি ঢালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে তালেবান গোষ্ঠী কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে।

পরবর্তিতে ২০০১ সালের মার্কিন আগ্রাসনের মধ্যদিয়ে তালেবানের পতন ঘটে সরকারী অবস্থান থেকে এবং শুরু হয় যুদ্ধ। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় আবারও তালেবান কাবুল দখল ও রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে। বাকিটা সময়ের অপেক্ষায় হয়তো নতুন করে ইতিহাসের পাতায় লিখিত হবে।

এইচএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *