মঙ্গলবার ৭, ডিসেম্বর ২০২১
EN

আবুল বাশার: প্রকাশনা জগতে অনন্য নাম

মানুষ সম্পদের মালিক হয় দু’টি উপায়ে-একটি উত্তরাধিকার সূত্রে অন্যটি নিজেই সে সম্পদ অর্জন করে নিজ প্রতিভাবলে, শ্রমের মাধ্যমে বা অন্যায় পথে।

মানুষ সম্পদের মালিক হয় দু’টি উপায়ে-একটি উত্তরাধিকার সূত্রে অন্যটি নিজেই সে সম্পদ অর্জন করে নিজ প্রতিভাবলে, শ্রমের মাধ্যমে বা অন্যায় পথে। কিন্তু সাহিত্য সংস্কৃতির খ্যাতি লাভ করতে হলে চাই পারিবারিক উত্তরাধিকার।

আর এ জন্য যেতে হয় শেকড়ের সন্ধানে, যেখানে স্বার্থের কোনো হাতছানি নেই, নেই কোনো ধন সংগ্রহের উদগ্র বাসনা। এমনি একটি পরিবার থেকে এসেছেন বাংলাদেশের পুস্তক প্রকাশনা শিল্প ‘গতিধারা’র প্রখ্যাত স্বত্বাধিকারী সিকদার আবু বাশার।

তিনি শুধু একজন প্রকাশকই নন, সৃজনশীল গবেষক, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও অঙ্কন শিল্পীর। জ্ঞান আহরণের কোনো বয়স নেই, নেই কোনো সীমারেখা। জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত এর বয়সসীমা, সৃষ্টিকর্তার বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী এর সীমানা।

বহু অনুষ্ঠানে বহু মিডিয়ায় তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছেন ক্ষুধা দারিদ্র্যের মধ্যে তার শৈশবকাল কেটেছে। আর এ ক্ষুধা ও দরিদ্রতার কারণেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শেষ সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। এ জন্য তার দুঃখ থাকলেও অনুতাপ নেই, নেই কোনো অনুশোচনা। তাই এই দুঃখকে অতিক্রম করতে গিয়ে তিনি স্বাক্ষর রেখেছেন সাহিত্য-সংস্কৃতি শিল্পের বিস্তৃত পরিসরে। শ্রমলব্ধ মেধা ও ঐকান্তিক অনুশীলনের অদম্য ইচ্ছা তাকে এই সফলতা এনে দিয়েছে।

আর্থিক অনটন ও টানাপোড়নের মধ্যে প্রকাশনা শিল্পকে আঁকড়ে ধরে আছেন যক্ষের ধনের মতো। তার আদিপুরুষ নবাব সিরাজ উদ্দেৌলার রাজসভার কর্মচারী ছিলেন। নবাবদের পতনের পর তার পূর্বপুরুষেরা চলে আসেন তৎকালীন বঙ্গদেশের নদীবেষ্টিত সাবেক জেলা বরিশালের ঝালকাঠির প্রখ্যাত তারুলি গ্রামে। তখন বরিশাল ছিল প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ বাকলা নামক এক প্রাচীন জনপদ।

পরবর্তীতে যা বাকেরগঞ্জ বা বরিশাল নামে ইতিহাসের পাতায় পরিচিতি লাভ করে। বরিশাল জেলার ঝালকাঠি মহকুমার (বর্তমানে জেলা) তারুলি গ্রামে যে শেকড় নবাবি আমলের শেষ দিকে প্রোথিত হয়েছিল, তারই উত্তরপুরুষ আজকের সিকদার পরিবারের আবুল বাশার। তৎকালীন ঝালকাঠি অঞ্চলের সাহিত্য সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে বিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে নিজ বাড়ির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় এবং একটি পাঠাগার। তৎকালীন বঙ্গদেশের অশিক্ষিত, অবহেলিত মুসলিম সমাজে নিকষ গাঢ় অন্ধকারে সিকদার পরিবার ছিল শিক্ষিত অগ্রগামী হিন্দুসমাজের বিরুদ্ধে প্রজ্বলিত এক দীপশিখা।

আর এ দীপশিখার আলোকে ব্রিটিশভারতে সিকদার পরিবারের বহু ব্যক্তিত্ব সততা, সমাজসেবা এবং ন্যায়বিচারের জন্য যেমন লাভ করেছিলেন নানা খেতাব, সম্মাননা তেমনি বিভাগোত্তর যুগে নতুন দেশ পাকিস্তান সরকারের বড় বড় পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। জ্ঞানগরিমা, আর সংস্কৃতিসেবী এ পরিবারের ছিন্ন মুকুলের মতো সিকদার আবুল বাশার বাস্তুচ্যুত হলেও ঐতিহ্যচ্যুত হননি।

সিকদার আবুল বাশারের বয়স এখনও ৫০ পূর্ণ হয়নি। ১৯৯২ সালে বাংলাবাজারে এ প্রকাশনা সংস্থার প্রতিষ্ঠা হলেও ২০০০ সাল থেকে পাবলিকেশনের কাজ শুরু করেন সিকদার। ছোটকাল থেকে পারিবারিক ঐতিহ্যের পথ ধরে তিনি বই পড়ার নেশায় পাগল ছিলেন।

এ বই পড়ার নেশা তাকে জগন্নাথ কলেজের পাশে অবস্থিত বাংলাবাজারের পুস্তক জগত টেনে আনে। ১৯৮৬ সালে জগন্নাথ কলেজে বিএ. পড়ার সময় বইয়ের সাথে সখ্য গড়ার এক নিবিড় পরিবেশ গড়ে ওঠে। কিন্তু হতাশ হয়েছিলেন চটুল-হালকা বইয়ের রমরমা ব্যবসা দেখে। হতাশ হলেও হতোদ্যম হননি। জগন্নাথে অধ্যয়নকালে গড়ে তুলেছিলেন গতিধারা সাহিত্য-সংস্কৃতি নামে নাট্য সংগঠন যার পথ ধরে তিনি নবযাত্রা শুরু করেন। যে গ্রন্থ নিজ দেশ, জাতির আত্মপরিচয়ে কোনো অবদান রাখতে পারে না তার দ্বারা জাতির ইনটেলেকচুয়্যাল বিকাশ হতে পারে না। জাতি, দেশ, সাহিত্য- সংস্কৃতির শেকড় খোঁজায় তিনি বাংলাবাজারের রমরমা বই ব্যবসার বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধের নীরব ঘোষণা দেন।

সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে তার ত্রিমুখী অভিযান শুরু হয়। বিরাট ভূখণ্ড জয় করলেই ভালো শাসক হওয়া যায় না, যদি না বিজিত অঞ্চলে শাসন-সংস্কারে ভূমিকা রাখতে পারে। বই প্রকাশনা করলেই বড় প্রকাশক হওয়া যায় না, যদি না পাঠক সৃষ্টি করা যায়। তাই সিকদারের যাত্রা পথটি হয়েছিল একদিকে যেমন গ্রন্থ প্রকাশক হবার অন্যদিকে তেমনি সেসব গ্রন্থের পাঠক সৃষ্টি করার। ধীরে হলেও তিনি তাতে সফলতা লাভ করেছেন।

সে কারণেই প্রকাশনা শিল্পে গতিধারা একটি অনন্য নাম। আশা মতো অর্থ উপার্জন হয়নি, তবুও অর্জনের খ্যতি কম নয়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন যথেষ্ট। ২০০১, ২০০২ এবং ২০০৩ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদশিল্পীর পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৮ সালে সেরা মানের গ্রন্থ প্রকাশনা সম্মাননা লাভ করেন বাংলা একাডেমি কর্তৃক অমর একুশে গ্রন্থমেলায়।

বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটি পরিচালিত Cultural Survey of Bangladesh প্রজেক্টের তিনি ঝালকাঠি জেলার গবেষণা-সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষণাকাজের পথ ধরে তার আঞ্চলিক ইতিহাস লেখার এক চলমান গতিধারার উন্মেষ ঘটে। নিজের রচিত ‘ঝালকাঠি জেলার ইতিহাস’ ‘পটুয়াখালি জেলার ইতিহাস’ এবং ‘বৃহত্তর বরিশাল জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থ সম্পাদনায় তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব প্রদর্শন করছেন।

১৮৭৬ সালে লন্ডন থেকে এইচ বেভারিজের প্রকাশিত ‘The District of Bakerganj:Its History and Statistics’ গ্রন্থখানি সিকদার আবুল বাশার তার ‘গতিধারা’ প্রকাশনী থেকে বাংলায় অনুবাদ করে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। এটি তার লেখকজীবনের অমূল্য অবদান যেখানে প্রাচীন বরিশালের বহু অজানা তথ্যকে তিনি বর্তমান গবেষক ও পাঠকদের নিকট তুলে ধরেছেন।

এ ছাড়াও প্রাচীন বরিশালের লেখকের রচিত অনেক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ (১৮৯৫ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত) পুনঃপ্রকাশিত করে বরিশাল অঞ্চলের এক অজানা অধ্যায়কে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছেন। এছাড়া ‘সিকদার বাড়ির ইতিকথা’ শিরোনামে তার ইতিহাস গ্রন্থখানি নিজ পরিবারের সাথে এ বিশাল জনপদের কিছু বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জীবনকাহিনীর বিবরণও এসেছে।

এভাবেই তিনি বাংলাদেশের প্রায় ৬৪টি জেলার আঞ্চলিক ইতিহাস ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর গ্রন্থ প্রকাশ করে আঞ্চলিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় এক বিরাট দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। আমাদের দেশে কবিতা, নাটক, নভেল, উপন্যাস পড়ার লোকের অভাব নেই। কিন্ত একটি জাতি নিজ জনপদের ইতিহাস জানা ছাড়া আত্মপরিচয়ের কোনো বিকল্প নেই।

আর এ আত্মপরিচয়ের চেতনার উন্মেষ ঘটাতে তিনি এদেশের মানুষের মাঝে জ্ঞানদীপমালা প্রজ্জ্বলনের দায়িত্ব নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছেন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক এদেশের আঞ্চলিক ইতিহাস লেখার সূচনা হয় ১৮০৭ সালে ড. হ্যামিলটন বুকাননের মাধ্যমে। তিনি রংপুর ও দিনাজপুরের জেলা গেজেটিয়ার্সের লেখা শেষ করে দেশে ফেরেন। অতঃপর প্রায় ৭০ বছর পর (১৮৭৫-৭৭) উইলিয়াম উইলসন হান্টার তৎকালীন বঙ্গদেশের ২০টি জেলার গেজেটিয়ার্স ‘স্টাটিস্টিক্যাল একাউন্ট অব বেঙ্গল’ শিরোনামে ২০ খণ্ডে প্রকাশ করেন।    

গত শতাব্দীর প্রথম দ্বিতীয় দশক থেকে এ দেশের লেখকেরা আঞ্চলিক ইতিহাস লেখার সূচনা করেন। দু’একজন ছাড়া প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। দেশ বিভাগের পর তারা সবাই চলে যান ভারতে। যার জন্য তাদের প্রকাশিত বইসমূহ আর পূণর্মুদ্রণ করা সম্ভব হয়নি।

ফলে বাংলা উৎস থেকে আঞ্চলিক ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান লাভের পর বাঙ্গালি উচ্চশিক্ষত মুসলমান কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদের মধ্যে আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থরচনার দিকটা সম্পূর্ণভাবে অবহেলার শিকার হয়।

পাকিস্তান শাসনামলে স্বল্প পরিসরে সরকারি পর্যায়ে সাবেক জেলাসমূহের গেজেটিয়ার প্রকাশের মাধ্যমে সে সব কাজ করা হতো। সমাজ, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে সেখানে লেখার পরিসর খুব অল্প ছিল। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় গত শতকের শেষ দশক থেকে তারও প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, জেলা বোর্ড বা জেলা কাউন্সিলের মাধ্যমে দু’চারটি স্থানীয় লেখকদের নিজ অঞ্চলের প্রাচীন রাজনৈতিক আন্দোলন ধর্মীয়- নৃতাত্ত্বিক বিবরণ সংস্কৃতি, সমাজজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, ভৌগলিক পরিবেশ, ইত্যাদি নিয়ে প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে জনগণকে সমাজসচেতন করতেন।

আজকাল জেলা পরিষদও সে রকম কাজ বহু আগেই বিদায় দিয়েছে। সেসব অর্থ এখন সরকারের দলীয় কর্মীদের লেখালেখির নামে অপচয় হচ্ছে। জেলা তথ্য বিভাগ থেকে স্বল্প পরিসরে মাঝে মাঝে যে প্রকাশনাসমূহ বের হয় তারও অবস্থা একই রকম।

এদিকে সাবেক জেলাসমূহে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আঞ্চলিক ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চার বিগত শতকের আট দশক থেকে শুরু হলেও সেখানে সরকারের কোনো অবদান ছিল না বললেই চলে। তবে এ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটি জেলা উপজেলা পর্যায়ে-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমীক্ষা, লোক-সাহিত্য, প্রবাদ ও প্রবচন, শ্লোক সমীক্ষা ইত্যাদি প্রকল্পের মাধ্যমে জেলা উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় লেখকদের কিছু বই প্রকাশ করলেও তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

একইভাবে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণামূলক কাজ অনেক হলেও তাও সাধারণ মানুষের জানার বাইরে। সেক্ষেত্রে ‘গতিধারা’ প্রকাশনী একটি সাধারণ প্রকাশনা সংস্থা হলেও এ পর্যন্ত সেখান থেকে বই প্রকাশিত হয়েছে ১৬০০র অধিক।

এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয়-আঞ্চলিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছাড়াও সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিকে লেখা গ্রন্থসমূহ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে জীবনানন্দ দাসের ৪খণ্ড রচনাবলীসহ কাব্য সংগ্রহ, উপন্যাস সংগ্রহ, গল্পসমগ্র, প্রবন্ধসমগ্র, প্রফেসর ওয়াকিল আহমদের : বাংলা লোকসাহিত্য, লোক সংস্কৃতি, লোক সংগীতে প্রায় ২ ডজন গ্রন্থের বিপুল সমাহার। আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতা সমগ্র, উপন্যাসগ্রন্থ প্রায় ১০ খণ্ড। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর সম্পাদিত দীনেশচন্দ্র সেনের ময়মনসিংহ গীতিক, পূর্ববঙ্গ ময়মনসিংহ গীতিকার গোটা পাঁচেক গ্রন্থ। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন লেখকের কবিতা, ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ কাব্য, নির্বাচিত কবিতা, গল্প ছাড়া ও জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ওপর লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থ।

আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ না করলে গতিধারা প্রকাশনা সংস্থার আরেকটি প্রকাশনা জগতের অধ্যায় অনুল্লেখ থেকে যাবে। সাবেক শ্রীহট্ট জেলার ইতিহাস (কয়েক খণ্ড), চট্টগ্রাম জেলার ইতিহাস, বাকেরগঞ্জ জেলার ইতিহাস, ঢাকার ইতিহাস, বিক্রমপুরের ইতিহাস, রাজশাহীর ইতিহাস, যশোহর-খুল্নার ইতিহাস, নোয়াখালীর ইতিহাসসহ বহু সাবেক জেলার ইতিহাস যা গত শতকের প্রথম দশক থেকে তিন দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের হিন্দু লেখকেরা প্রকাশ করেছেন, গতিধারা সে দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থসমূহ নতুনভাবে প্রকাশ করে সে সব জেলার প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

লেখক, প্রকাশক, পরিবেশক, অনুবাদক ছাড়াও প্রকাশনার জগতে তিনি খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী। তার প্রায় সমস্ত গ্রন্থের প্রচ্ছদ নিজে অঙ্কন করে বিরল প্রতিভার অধিকারী হয়েছেন। নামকরণ অনুয়ায়ী প্রচ্ছদের ব্যাকগ্রাউণ্ড, রংয়ের সমাহারের সাথে তুলির আঁচড়ে সুন্দর লেটারিং সবকিছু মিলে এক অভূতপূর্ব চিত্রশিল্পীর বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই তার সৃষ্টির মধ্যে।

তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন চিত্র অঙ্কন শিল্পী হিসেবে তার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি ছিল না। তবে দীপংকর চক্রবর্তীর ছত্রছায়া তাকে অঙ্কনজগতের এত বড় অঙ্গনে এনেছেন। দীপংকর বাবু শুধু তার অঙ্কন শিক্ষকই নন, তার প্রকাশনা শিল্পের একজন অভিভাবকও বটেন। সে ব্যপারে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্ত নেই।

পয়সা আর মেধার মাধ্যমে মানুষ তার প্রতিভা বিকাশের শীর্ষে আরোহণ করতে পারে। কিন্তু জনাব সিকদারের কথায় তিনি না ছিলেন বিত্তবান না ছিলেন অসীম প্রতিভার অধিকারী। এতদসত্বেও চিত্তের বিশালতা তাকে করেছে যেমন বিত্তবান তেমনি প্রতিভা অর্জন করেছেন অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে। তার কথায় একজন মানুষের ঐকান্তিক সদিচ্ছাই তাকে বৃহৎ কাজে কৃতকার্যতা এনে দেয়ে।

প্রত্যেক মানুষের অন্তত তিনটি ভালো কাজ করা দরকার। উপযুক্ত সম্মান তৈরি করা, অন্তত একটি গাছ রোপণ করা অথবা সমাজ দেশ জাতির জন্য কোনো ভালো বই রচনা করে যাওয়া। এখান থেকে তিনি প্রেরণা লাভ করে লেখনী ও প্রকাশনার মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক জগতের এক অক্ষয় স্থানে স্থাপনের প্রয়াস খুঁজছেন।

ড. মুহম্মদ মনিরুজ্জামান : গবেষক, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও সস্কৃতিবান ব্যক্তিত্ব। অধ্যাপক (অব.), সরকারি কারমাইকেল কলেজ, রংপুর।

ওএফ

          

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *