সোমবার ১৭, জানুয়ারী ২০২২
EN

ইলমুল ফিক‌হ যুগের সূচনা ও সময়কাল

রাসূলুল্লাহ (সা) এর ওফাত পরবর্তী সময় অর্থাৎ দশম হিজরী থেকে ফিকহে’র সাহাবা যুগের শুরু। এর ব্যপ্তি ৯০ বা ১০০ হিজরী পর্যন্ত ধরা যায় কারণ এ সময়ের পর কোন অঞ্চলে আর কোন সাহাবী জীবিত ছিলেন না।

রাসূলুল্লাহ (সা) এর ওফাত পরবর্তী সময় অর্থাৎ দশম হিজরী থেকে ফিকহে’র সাহাবা যুগের শুরু। এর ব্যপ্তি ৯০ বা ১০০ হিজরী পর্যন্ত ধরা যায় কারণ এ সময়ের পর কোন অঞ্চলে আর কোন সাহাবী জীবিত ছিলেন না।

কুফায় সর্বশেষ সাহাবী মারা যান ৮৬/৮৭ হিজরীতে, মদীনার সর্বশেষ সাহাবী সাহল ইবনে সাদ (রা) ৯১ হিজরীতে, বসরার শেষ সাহাবী আনাস ইবনে মালিক (রা) ৯১ বা ৯৩ হিজরীতে ও দামেস্কের শেষ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ৮৮ হিজরীতে মারা যান।

১০০ হিজরীতে সর্বশেষ সাহাবী আমির ইবনে ওয়াসিলাহ ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বিদায় নেয়ার মধ্য দিয়ে সাহাবা যুগের সমাপ্তি ঘটে।

সাধারণভাবে এই সুদীর্ঘ সময়ে পুরোটাকে সাহাবা যুগ নাম দিলেও এর মধ্যে প্রধান দুটো ভাগ আছে যা উল্লেখযোগ্যভাবে পরস্পর থেকে পৃথক। এই যুগ বিভাগ দুটি হচ্ছে:

ক) খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (চল্লিশ হিজরী পর্যন্ত)
খ) খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী সাহাবা (রা) দের যুগ ও এর সমান্তরালে তাদের শিক্ষাপ্রাপ্ত তাবঈদের যুগ (চল্লিশ হিজরী হতে একশ হিজরী)
ক) খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ: (চল্লিশ হিজরী পর্যন্ত)

“আমার পরে তোমরা খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরন করবে।” [হাদীস]

রাসূলুল্লাহ (সা) এর ওফাতের পর খুলাফায়ে রাশেদীনের সোনালী যুগে বিভিন্ন জয়ের মাধ্যমে ইসলাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লে নতুন নতুন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সামনে চলে আসে। ক্রম প্রসারমান সেই সভ্যতার চাহিদা পূরণে এবং বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নবাগত সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর উপর গভীর গবেষনা করার প্রয়োজন তীব্রতর হয় সে প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতেই ‘ফিকহ’ আরো বিকশিত হতে থাকে।

এ যুগেই ফিকহ এর তৃতীয় উৎস তথা ইজমা আস সাহাবা অস্তিত্ব লাভ করে। ইজমাকে এ যুগে সংগঠিত ও

প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এজন্য যোগ্যতা সম্পন্ন ও নেতৃস্থানীয় সাহাবা (রা) গণের একটি কমিটি গঠিত হয় আর তাদেরকে যথাসম্ভব খিলাফতের কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করা হয় যাতে করে উদ্ভুত কোন নতুন বিষয়ের ফায়সালা সরাসরি কুরআন - সুন্নাহতে না পাওয়া গেলে তাদের পারস্পরিক পরামর্শ ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে এর ফয়সালা বের করা যায়। উল্লেখ্য যে, সাহাবা (রা) গণ নিজ থেকে কোন ধারণা বা পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে এসব মত দিতেন না

হযরত আবু বকর (রা) এর যুগ :-

কোন বিষয়ে ফিকহ-এর বিধান আহরণে হযরত আবু বকর যে পদ্ধতি অনুসরণ করতেন, মায়মুন ইবনে মাহরান তা এ ভাবে বর্ণনা করেছেন,
“আবু বকর (রা)-এর শাসনকালে কোন সমস্যা উপস্থিত হতে তিনি কুরআন খুলে দেখতেন। যদি তাতে সংশ্লিষ্ট বিবাদ মীমাংসার জন্য কিছু পেতেন তবে তার ভিত্তিতে উদ্ভুত বিবাদ মীমাংসা করতেন। যদি কুরআনে এ ব্যাপারে কোন সমাধান না পেতেন তবে তিনি রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মীমাংসা করতেন। যদি সুন্নাহতেও উল্লেখিত বিষয়ে কিছু না পেতেন তাহলে তিনি মুসলিমদের নিকট গিয়ে বলতেন, অমুক অমুক বিষয় আমার নিকট পেশ করা হয়েছে।

তোমাদের কারো এ বিষয়ে রাসূল (সা)-এর কোন ফয়সালার কথা জানা আছে কি? ঐ বিষয়ে যদি কেউ তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিত এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সরবরাহে সক্ষম হত তখন হযরত আবু বকর (রা) বলতেন: “আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা যে, তিনি আমাদের মধ্যকার কোন কোন ব্যক্তিকে রাসূলের (সা) নিকট থেকে তাঁর শ্রুত বিষয় স্মরণ রাখার সামর্থ্য দিয়েছেন।”


যদি তিনি রাসূল (সা)-এর এরূপ কোন সুন্নাহও না পেতেন তাহলে নেতৃস্থানীয় ও উত্তম লোকদের সাথে পরামর্শ করতেন। তারা ঐকমত্যে পৌছালে তার ভিত্তিতে তিনি রায় দিতেন। [ইলমূল মুওয়াকিঈন; সংগ্রহ, ইসলামী উসূলে ফিকহ]


“ঐভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে সমাধান না পেলে তাঁর ব্যক্তিগত বিচক্ষনতার সাহায্যে ‘নস’ ব্যাখ্যা করে অথবা তার মর্মার্থ থেকে অথবা কেবল ইজতিহাদের ভিত্তিতে তার নিজস্ব মত গঠন করতেন” [হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ]


যেমন : হযরত আবুবকরের সামনে যখন দাদীর মীরাস সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলো তখন তিনি বললেন যে, এ বিষয়ে কুরআনে কোন নির্দেশ নেই এবং এ বিষয়ে কোন হাদীসও তাঁর জানা নেই, তাই এ বিষয়ে অন্যদের জিজ্ঞাস করতে হবে। অতঃপর যোহরের নামাজের পর তিনি সমবেত লোকদের এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মুগীরা বিন শোবা (রা) ও মুহম্মদ বিন সালামা (রা) দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলেন যে এ বিষয়ে তাদের হাদীস জানা আছে এবং তা হলো রাসূলুল্লাহ (সা) দাদীকে মৃতের রেখে যাওয়া সম্পদের এক ষষ্ঠাংশ দিয়েছেন। অতঃপর আবু বকর (রা) এ অনুযায়ীই ফায়সালা দিলেন।


এ বর্ণনা হতে ফিকহ এর ব্যাপারে আবু বকর (রা) এর কর্মপন্থা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ যেকোন সমস্যা সমাধান তিনি প্রথমে, কুরআন, তারপর সুন্নাহ, অতঃপর ইজমা-আস-সাহাবা এবং পরিশেষে কিয়াস এর সাহায্য নিতেন। এই কর্মপন্থাই পরবর্তী যুগের জন্য দলীল হয়ে যায়।


আবু বকর (রা) কৃত ইজতিহাদ :-


যেমন ‘কালালাহ’ শব্দের অর্থ সম্পর্ক তিনি বলেন, “কালালাহ সম্পর্ক আমি যা বললাম তা আমার নিজের রায় এর ভিত্তিতে। আমার মতামত যদি সঠিক হয় তবে তা আল্লাহর কাছ থেকে, আর যদি ভুল হয় তবে তা আমার নিজের ও শয়তানের কাছ থেকে। সেই ব্যক্তিই ‘কালালাহ’ যার পিতা-মাতাও নেই, সন্তানও নেই। তাঁর আরো ইজতিহাদের উদাহরণ হচ্ছে, যাকাত অস্বীকারকারী গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ও পরে ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য বায়তুল মাল থেকে সমান বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি।


হযরত উমর (রা) এর যুগ :-


হযরত উমর (রা) এর যুগে ফিকহ’ এর অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। তিনি নিজে ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ ফকীহ। তিনি খুব দ্রুত কোন সম্পূরক বিষয়কে মূল বিষয়ের সাথে তুলনা করতে পারতেন। ফলে তিন তাঁর শাসনকালে ইসলামী আইনের এক বিশাল ভান্ডার রেখে যান। বিখ্যাত তাবেঈ ইবরাহীম নখঈ যথার্থই বলেছেন যে, “উমর (রা) শহীদ হওয়ার সথে সাথে ইলমের দশ ভাগের নয় ভাগ দুনিয়া থেকে তিরোহিত হয়ে গেছে” [১১. পূর্বোক্ত]


‘ফিকহ’ এর বিষয়ে হযরত উমর (রা) কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতির মধ্যে লক্ষনীয় বিষয় ছেল যে, ফায়সালা গ্রহণের জন্য তিনি সর্বোৎকৃষ্ট উপায় উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে সাহাবীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ করতেন, বিতর্ক সভা করতেন। যখন তাঁর সামনে কোন ফিকহী সমস্যা উপস্থাপন করা হতো তিনি বলতেন, “ডাকো আলীকে ডাকো যায়েদকে” অর্থাৎ অন্যান্য সাহাবা (রা)-দের ডাকতেন, তিনি তাদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং এভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছাতেন।


মৌলিকভাবে তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি হযরত আবু বকর (রা) এ প্রায় অনুরূপ ছিল। আগত সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান তিনি প্রথমে কুরআন, অতঃপর তাঁর সুন্নাহ’র জ্ঞান ভান্ডারে খুজতেন, যদি সেসব থেকে সরাসরি কিছু না পেতেন এবং বাকী সাহাবীদের কাছ থেকেও তার অজানা কোন হাদীসের সন্ধান না পেতেন তখন সবার সাথে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন অথবা ইজতিহাদ করে রায় দিতেন।


যেমন : হযরত উমর (রা) নিকট গর্ভস্থ সন্তানের দিয়তের বিষয় উত্থাপিত। তখন মুগীরা ইবনে শোবা (রা) এ বিষয়ক একটি হাদীস জানালে উমর (রা) সে অনুযায়ী ফায়সালা করেন। অনুরূপে অগ্নি পূজকদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করা সম্পর্কে তিনি আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে অবগত হন এবং অতঃপর এর ভিত্তিতে আইন করেন।

অনুরূপে স্ত্রী স্বামীর দিয়তের রক্তপন অংশীদারী হবে কিনা এ সম্পর্কে তিনি দাহহাক বিন সুফিয়ান আল-কালাবি (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে অবগত হন এবং বলেন, “যদি আমরা এ হাদীস না শুনতাম, তবে ভিন্ন হুকুম দিতাম।” [১২, রাফউল মালাম, ইবনে তাইমিয়্যাহ]


অনেক সময় তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাদীস না পেলে ইজতিহাদের মাধ্যমে রায় দিতেন; কিন্তু পরে এ সম্পর্কে কোন হাদীস জানতে পারলে পূর্ব রায় ত্যাগ করে হাদীস অনুসরে রায় দিতেন। যেমন : হাতের আঙ্গুলের দিয়তের ব্যাপারে তাঁর মত ছিলো, উপকারীতার পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন আঙ্গুলে দিয়ত ও কমবেশী হবে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আবু মুসা (রা) ও ইবনে আব্বাস (রা) হতে সব আঙ্গুলের দিয়ত সমান হওয়া সম্পর্কিত হাদীস শুনে সে অনুযায়ী রায় দেন।


‘ফিকহ’ এর ব্যাপারে তাঁর অনুসৃত আরেকটি নীতি হচ্ছ, তাঁর কাছে যদি হাদীসটি বিশুদ্ধ পন্থায় না পৌছাতো তবে তিনি তা গ্রহণ না করে বরং সুস্পষ্ট আয়াত বা হাদীসের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করে রায় দিতেন। এই নীতি পরবর্তীতে ফিকহের অনেক ইমাম আরো সুসংবদ্ধ করেছেন। উদাহরণ: তালাকের পর ইদ্দত কালীন ভরনপোষণ বিষয়ে হযরত উমর (রা) ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা) এর হাদীস বর্জন করেন এবং কিতাবুল্লাহ অনুযায়ী ফায়সালা প্রদান করেন।


এভবেই উমর (রা) ‘ফিকহ’ এর ব্যাপারে বিভিন্ন নীতিমালার বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বিভিন্ন কাজী ও গভর্ণরদের কাছে চিঠি লিখতেন এবং তারাও তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন বিধান জানতে চেয়ে চিঠি লিখতেন। ঐসব গভর্ণররা নিজেরাই ছিলেন মর্যাদাবান সাহাবী ও শীর্ষস্থানীয় ফকীহ। তাই তারা নিজেরাও প্রয়োজনে বিভিন্ন বিষয়ে ইজতিহাদ করে আইন দিতেন। এভাবেই উমর (রা) এর পুরো খিলাফত জুড়েই ফিকহের ব্যাপক উন্নতি ঘটে।


হযরত উসমান (রা) এর যুগ :-


হযরত উসমান (রা) কে এই শর্তে খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছিল যে, তিনি কুরআন, সুন্নাহ, ও পূর্ববর্তী দু’ইজন খলীফার অনুসৃত নীতি অনুসরণ করবেন। তাই তার খিলাফত কালে তিনি নিজে কদাচিৎ ইজতিহাদ করতেন বরং অধিকাংশ বিষয়ে পূর্ববর্তী দুই খলীফার সময় নেয়া সিদ্ধান্ত গুলোর বাস্তবায়নকেই প্রাধান্য দিতেন। তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদের উদাহরণ হচ্ছে মিনায় সালাত সংক্ষিপ্ত না করা বিষয়ে তার আমল।

তবে তিনি নিজে স্বাধীন ইজতিহাদ কম করলেও পূর্ববর্তী দুই যুগের ন্যায় এ যুগেও সাহাবা (রা) ও বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্ব প্রাপ্ত ওয়ালী ও কাজীরা আগত নতুন নতুন বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমায়ে সাহাবার ভিত্তিতে সমাধান করে ‘ফিকহ’ এর অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখেন।

মাহমুদ.

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *