শুক্রবার ৩, ডিসেম্বর ২০২১
EN

ইসরাইলকে কেন স্বীকৃতি দেয়া সঙ্গত নয়?

শাহ্ আব্দুল হান্নান: সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃক ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার ওপর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর আগে কেবল মিসর ও জর্দান ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। এর পরে গত ৩০-৩৫ বছর আর কোনো মুসলিম রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি।

শাহ্ আব্দুল হান্নান: সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃক ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার ওপর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর আগে কেবল মিসর ও জর্দান ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। এর পরে গত ৩০-৩৫ বছর আর কোনো মুসলিম রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি।

এর পরে কথা উঠে যে, আরো কয়েকটি আরব দেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে পারে। তবে অন্যান্য আরব দেশ এটা অস্বীকার করেছে। ওআইসি বলেছে, ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া সঙ্গত হবে না। পাকিস্তান বলেছে, তারা ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবেন না।

মনে পড়ে ২০০৩ সালের শেষ দিকের কথা। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটি অংশ দাবি করেছিল ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য। তাদের কথা ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে একটি বিল আনা হয়েছে যে, ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দিলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্য নেবে না।’ এই কথায় আমাদের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ঘাবড়ে যান এবং তারা এ দাবি উত্থাপন করেন। অথচ তখন তারা এটা ভাবেননি। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক এর সাথে ইসরাইলের স্বীকৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটা শুধু আমেরিকার সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়। তার সাথে ইসরাইলের স্বীকৃতির কি সম্পর্ক আছে? একজন কংগ্রেস সদস্য একটা বিল উত্থাপন করলেন বলে সাথে সাথে ঘাবড়ে যেতে হবে কেন? আমার মনে পড়ে, এ ঘটনার পরপরই একটি থিংকট্যাংক সংগঠনের ঘরোয়া সভায় উপস্থিত ছিলাম। ১৫ জনের মতো লোক সেখানে ছিলেন। বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও ছিলেন। সেনাবাহিনীর কয়েকজন সাবেক জেনারেল ছিলেন। কয়েকজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকও ছিলেন। সেখানেও ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি চলে আসে। সেখানে একজন সাংবাদিক অনেক যুক্তি দেখালেন- কেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া দরকার এবং আমাদের তা না করার কোনো যুক্তি নেই। তার মতে, মিসর ও জর্দান ইসরাইলের সাথে চুক্তি করেছে; তাহলে আমরা কেন করব না? লক্ষ করলাম, তার বক্তব্যের পর হাউজের সাত-আটজন মোটামুটিভাবে তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করে বসলেন।

তখন আমি নিজে কথা বললাম। জোর দিয়ে এর বিরোধিতা করলাম। আমার যুক্তি পেশ করলাম। আবার একই জায়গায় আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হলো। লক্ষ করলাম, সেখানেও দু-একজন ‘ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করলেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু লোক ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে। তাদের কাছে এটা বড় প্রশ্ন নয় যে, ইসরাইল অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্র। তাদের কাছে এটাও বড় প্রশ্ন নয় যে, ইসরাইল জাতিসঙ্ঘের অন্তত ৫০টির বেশি প্রস্তাব ভঙ্গ করেছে এবং ফিলিস্তিনের দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা জবরদখল করে রেখেছে দীর্ঘদিন। তারা পূর্ব জেরুসালেম দখল করে রেখেছে, যেটা তাদের নয়। যদি আমরা মেনেও নিই, ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘ তাদের যা দিয়েছিল তা তাদের থাকবে, তাহলেও পূর্ব জেরুসালেম তাদের বহু আগেই ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল। ওরা পশ্চিম তীরে দুইশ’-আড়াইশ’ বসতি গড়ে তুলেছে অবৈধভাবে। গাজাতে ও বসতি গড়েছিল। টিভিতে প্রায়ই আমরা ফিলিস্তিনিদের দুঃখ বেদনার চিত্র দেখি। ইসরাইল রাষ্ট্র তাদের ওপর এখনো অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। যারা ইসরাইলের পক্ষে আছেন, তাদের দৃষ্টিতে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস কিংবা নির্যাতন করাটা অন্যায় কিংবা দোষের নয়। গাজায় এখনো আকাশ ও সমুদ্রসীমা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু তারা এসব কিছু ভাবতে রাজি নন। তারা একে খুব সাদামাটা দৃষ্টিতে দেখেন। অথচ মুসলিম বিশ্বের ৫৭টি দেশের মধ্যে মাত্র পাঁচ-সাতটি দেশ ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক রেখেছে। তার কারণ কী, তাও আমরা জানি। মুসলিম বিশ্বের মূল অংশ আজো ইসরাইলকে স্বীকার করেনি।

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবের মাধ্যমে। তখন জাতিসঙ্ঘের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০ বা ৫৫। তাদের প্রায় সব দেশই ছিল আমেরিকান, লাতিন আমেরিকান অথবা ইউরোপের। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশ ছিল গুটিকয়েক মাত্র। তখন ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে সবেমাত্র জাতিসঙ্ঘের সদস্য হয়েছে। ১৯৪৮ সালে যে ভোটাভুটি হয় পাকিস্তান এর বিরোধিতা করেছিল। আমার জানা মতে, সেই সময় ভারতও বিরোধিতা করেছিল। কাজেই বলা যায়, ইসরাইল পাশ্চাত্যের চাপিয়ে দেয়া একটা কৃত্রিম ও অবৈধ রাষ্ট্র। আর তা করা হয়েছিল তখনকার জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে। সে সময় শক্তির জোরে পাশ্চাত্য একটা প্রস্তাব পাস করেছিল। মনে রাখতে হবে, সেই প্রস্তাবটি মূলত অবৈধ। আজ আমরা শুধু ইতিহাসের বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ করছি। কিন্তু এটাও তো ঠিক, বর্তমান ইসরাইলি ভূখণ্ডে একটি মাত্র রাষ্ট্র থাকার কথা। তার নাম প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন। ইসরাইল রাষ্ট্র কখনো বিশ্বে ছিল না। সেখানে জোর করে ইহুদি বসতি স্থাপন করা হলো, ইহুদি নিয়ে আসা হলো। জোর করে সীমান্ত করে দেয়া হলো। ওরা একের পর এক যুদ্ধ করে ফিলিস্তিনের সবটুকুু জায়গা দখল করে নিলো। স্থানীয় অধিবাসীদের বের করে দিলো। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর গোটা ফিলিস্তিন দখল করে নিলো। তাও ৫৩ বছরের বেশি হয়ে গেছে।

ইসরাইল রাষ্ট্রের পেছনে কোনো নৈতিকতা নেই, তাকে জবরদস্তিমূলক বৈধতা দেয়া হয়েছে। সামরিক আইনের যেমন আইনগত বৈধতা নেই, তেমনি ইসরাইল জোর করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র হওয়ার কারণে তারও আইনগত কোনো বৈধতা নেই। এই অবৈধ রাষ্ট্র এখনো ফিলিস্তিনিদের বৈধ রাষ্ট্র করতে দিচ্ছে না; জেরুসালেম মুক্ত করতে দিচ্ছে না। উদ্বাস্তুদের ফিরতে দিচ্ছে না। এরকম অনেক সমস্যা অদ্যাবধি বিরাজমান। একটি অবৈধ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার এমন কি প্রয়োজন পড়ে গেল? তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে ফিলিস্তিন যদি ইসরাইলকে স্বীকার করে নেয়, তখন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলকে স্বীকার করে নিতে পারে। ইসরাইল তেমন বড় কোনো দেশ নয় যার সাথে সম্পর্ক না রাখলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ক্ষতি হবে। এ স্বীকৃতি কি মানবতার, ইনসাফের বা ইসলামের দাবি? মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর উচিত ইসরাইলের নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ করা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। কোনোভাবেই কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের উচিত হবে না ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া।

লেখক: সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই) 

এমবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *