বুধবার ১৯, জানুয়ারী ২০২২
EN

উইঘুর মুসলিমদের ভাগ্য বিড়ম্বনা

উইঘুর জাতি মধ্য এশিয়ার তুর্কি বংশোদ্ভূত ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতিগোষ্ঠী। মূলত তারা চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে বসবাস করেন। উইঘুররা এই অঞ্চলের সরকারিভাবে স্বীকৃত ৫৬টি নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অন্যতম। এখানকার ৮০% উইঘুর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তারিম বেসিনে বসবাস করেন। জিনজিয়াং এর বাইরে উইঘুরদের সবচেয়ে বড় সম্প্রদায় দক্ষিণ মধ্য হুনান প্রদেশে রয়েছে।

উইঘুর জাতি মধ্য এশিয়ার তুর্কি বংশোদ্ভূত ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতিগোষ্ঠী। মূলত তারা চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে বসবাস করেন। উইঘুররা এই অঞ্চলের সরকারিভাবে স্বীকৃত ৫৬টি নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অন্যতম। এখানকার ৮০% উইঘুর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তারিম বেসিনে বসবাস করেন। জিনজিয়াং এর বাইরে উইঘুরদের সবচেয়ে বড় সম্প্রদায় দক্ষিণ মধ্য হুনান প্রদেশে রয়েছে।

চীনের বাইরে মধ্য এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্র যেমন কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উইঘুর রয়েছেন। এছাড়া আফগানিস্তান, পাকিস্তান, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, রাশিয়া, সৌদি আরব, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কে অল্পসংখ্যক উইঘুর আছেন।

চীনে প্রায় দেড় কোটি উইঘুর মুসলমানের বাস। জিনজিয়াং প্রদেশের ৪৫ শতাংশই উইঘুর মুসলিম। এই প্রদেশটি তিব্বতের মতো স্বশাসিত একটি অঞ্চল। বিদেশি মিডিয়ার সেখানে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন থেকেই অভিযোগ করে আসছেন যে, জিনজিয়াং-এর বিভিন্ন বন্দীশিবিরে অন্তত ১০ লাখ মুসলিমকে আটক করে রেখেছে চীন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসংঘের কাছে এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে প্রতিনিয়ত।

‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা এতদসংক্রান্ত একটি নথি ফাঁস হয়েছে চীনের একজন ঊর্ধ্বতন রাজনীতিকের কাছ থেকে। এতে দেখা গেছে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কিভাবে ২০১৪ সালে অঞ্চলটি সফরকালে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অঞ্চলটির মুসলিমদের ব্যাপারে বেইজিং-এর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। একটি রেল স্টেশনে বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর অঞ্চলটি সফর করেন শি জিনপিং। ওই ঘটনার জন্য উইঘুরদের দায়ী করা হলেও তা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।

প্রেসিডেন্টের দেয়া সিরিজ ভাষণে একনায়কতন্ত্রের উপাদানগুলো ব্যবহার করে ‘সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে’ লড়াইয়ের নির্দেশ দেয়া হয়। একইসঙ্গে উইঘুর মুসলিমদের ব্যাপারে কোনভাবেই অনুকম্পা না দেখানোর পরামর্শ দেন তিনি। চীনা প্রেসিডেন্টের এমন নির্দেশের ব্যাপারে রয়টার্সের পক্ষ থেকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ফ্যাক্স করা হয়েছিল। এর কোন জবাবও মেলেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, চীনের লড়াই কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়; বরং জিনজিয়াং থেকে উইঘুর মুসলমানদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে বেইজিং। আর এটিই বাস্তবতা।

ফাঁসকৃত নথিতে দেখা যায়, অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসী হামলা এবং আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের ফলে চীনা নেতৃত্বে ভয় আরও বেড়েছে। বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া মুসলিম পরিবারের কোনও সন্তান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরলে কর্মকর্তারা তাদের জানাতেন, তার পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া হয়েছে। চীনা কর্মকর্তারা মুসলিম বন্দিশিবিরগুলোকে ‘ ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ২০১৬ সালের পর থেকে এই বন্দীশিবিরগুলোর পরিসর দ্রুত বেড়েছে। এখনও বন্দীশিবিরের বাইরে থাকা মুসলিমদের ব্যাপক সরকারি নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।

মূলত চীনা সরকার ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। সে যুদ্ধের অংশ হিসেবেই ইসলামকে চীনের সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং। ইতোমধ্যেই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটিতে ইসলামের ‘চাইনিজ ভার্সন’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা চীনের মুসলিম জনসংখ্যাকে ‘চিনিসাইজ’ বা চীনা ধারার সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে চাইছেন। এর আওতায় মসজিদগুলোকে গম্বুজের বদলে চীনা স্টাইলের প্যাগোডার আকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রাজধানী বেইজিংয়ে হালাল পণ্য বিক্রি করে এমন ১১টি রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাটের কর্মীরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, কর্মকর্তারা তাদের ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবিগুলো সরিয়ে নিতে বলেছে। এরমধ্যে ক্রিসেন্ট মুন বা অর্ধচন্দ্র এবং আরবিতে লেখা ‘হালাল’ শব্দটিও রয়েছে।

দুই কোটি মুসলিমের আবাসস্থল চীন প্রকাশ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে থাকে। দাফতরিকভাবে তারা এর নিশ্চয়তাও দেয়। কিন্তু সরকার চাইছে ধর্মবিশ্বাসীদের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার জন্য। এজন্য তারা ব্যাপক ধরপাকড় ও সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্ন ধারার নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশটিতে বিভিন্ন ‘মতবাদে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী’র ওপর চাপ আরও বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

দেশটির একাংশে ইসলামের চর্চা নিষিদ্ধ। নামাজ-রোজার পাশাপাশি দাড়ি রাখা বা হিজাব পরার মতো কারণেও ধরপাকড়ের হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। বিভিন্ন মসজিদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে গম্বুজ ও চাঁদ-তারার প্রতিকৃতি। মাদরাসা ও আরবি শিক্ষার ক্লাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ধর্মীয় কর্মকান্ডে শিশুদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একেই তারা বলছে চীনা ধারার সমাজতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের সামঞ্জস্য তৈরি করা। যারা এটি মানতে চাইবে না, তাদের বিচারের আওতায় নিতে প্রণীত হয়েছে নতুন আইন।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ১০ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলিমকে আটক রেখে তাদের ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বলপূর্বক তাদের কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে নিজ ধর্মের সমালোচনা করতে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের শপথ করতে হচ্ছে বস্তুবাদে বিশ্বাসী ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্যের, যা ইসলামী আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক। সে ধারাবাহিকতায় সরকার ইসলামকে তাদের কথিত সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে উদ্যোগী হয়েছে। এর অংশ হিসেবেই মুসলিমদের ওপর ধরপাকড়ের পাশাপাশি চীন থেকে আরবি ভাষা ও ইসলামি প্রতীক মুছে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং। সম্প্রতি পবিত্র কুরআন সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

উইঘুর মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি উইঘুর সংক্রান্ত যেকোন খবর প্রকাশকেও আমলী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের এক দিনে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের গুলশেরা হোজার পরিবারের ২৫ জনের কাছে একটি সমন আসে, যাতে তাদেরকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে প্রাদেশিক রাজধানী উরুমকির থানায় হাজির হতে বলা হয়। হোজার পরিবারে সমন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তার ৭০ বছর বয়সী মা-বাবাও ছিলেন। যখন তারা থানায় হাজির হলেন তখন তাদের বলা হলো- মার্কিন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত রেডিও ফ্রি এশিয়ার (আরএফএ) গুলশেরা হোজার সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে তাদের গ্রেফতার করা হলো।

আরএফএর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, চীন সরকার উইঘুর জনগোষ্ঠীর লোকজনকে গণহারে গ্রেফতার করে আটক রেখেছে। জিনজিয়াংয়ের দুই কোটি ২০ লাখ লোকের প্রায় অর্ধেকই উইঘুর। হোজার বৃদ্ধ বাবা অসুস্থতাজনিত কারণে হাসপাতালে থাকায় ওই থানায় উপস্থিত হতে পারেননি। এরপর ওই হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়, যাতে ৭০ বছরের বেশি বয়সী ওই বৃদ্ধ পালিয়ে যেতে না পারেন।

মূলত আরএফএর প্রতি চীন কর্তৃপক্ষের বার্তাটি ছিল একেবারে পরিষ্কার। এর আগেও আরএফএর কর্মীদের প্রতি এ ধরনের বার্তা পাঠানো হয়েছিল। এক বছর আগে যখন জিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের গ্রেফতার করা শুরু হচ্ছে তখন হোজার সহকর্মী কুরবান নিয়াজ তার ছোট বোনের কাছ থেকে চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাটের মাধ্যমে একটি ছবি পান। ওই ছবিতে দেখা যায়, তার বাসার সোফায় দুই চীনা পুলিশ বসে আছে। একজন আবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে পোজ দিচ্ছেন। জানা যায়, ওই দুই পুলিশই এ ছবি তুলে নিয়াজের কাছে পাঠাতে বলে। মূলত তারা এর মাধ্যমে বার্তা দিতে চায়, তোমরা আসলে পুলিশের নজরদারির বাইরে নও। উইঘুর মুসলিমদের চাপ দিতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রচেষ্টা এখন চীনের সীমান্তের বাইরেও অনেক বেশি প্রসারিত হয়েছে।

ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব উইঘুর নির্বাসিত অবস্থায় আছেন বা যারা পূর্বে চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে বন্দী ছিলেন তাদের বারবারই চাপ দেয়া হচ্ছে, তারা যেন জিনজিয়াংয়ের নতুন গুলাগ নিয়ে কোনোভাবেই মুখ না খোলেন। কখনো তাদের সরাসরি হুমকি দেয়া হচ্ছে, আবার কখনো বা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে। যারা মুখ খুলেছেন, তাদের পড়তে হচ্ছে নানা ধরনের সমস্যার মুখে। গত ১৩ অক্টোবর চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। যাতে দেখা যায়, এক উইঘুর ব্যক্তি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করছেন। পম্পেওর বক্তব্যে বলা হয়েছিল, জুমরাত দাউত নামের এক নারীকে আটক করে প্রহার করা হয়েছে এবং তাকে জোরপূর্বক বন্ধ্যা করে দেয়া হয়েছে। জুমরাতের ভাই দাবি করে ওই ব্যক্তি লিখিত বক্তব্যে বলছিলেন, আমি এ ভিডিও ক্লিপটি বানিয়েছি বিশ্বকে সত্য বিষয়টি জানানোর জন্য। মূলত উইঘুরদের চাপ দিয়েই এ ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়ে থাকে।

ওই আরএফএর উইঘুর ভাষার শাখায় যারা কাজ করছেন, তাদের অনেক বেশি হুমকির মুখে থাকতে হচ্ছে। কেননা, এ রেডিওটি জিনজিয়াংয়ের মারাত্মক অবনতিশীল মানবাধিকারের কথা তুলে ধরছে অব্যাহতভাবে। চীনা কর্তৃপক্ষ এ রেডিও স্টেশনকে ‘শত্রু রেডিও স্টেশন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। সংস্থাটির উইঘুর কর্মীরা জানিয়েছেন, তারা এখানে কাজ করার কারণে জিনজিয়াংয়ে তাদের আত্মীয়স্বজনদের ওপর মারাত্মক ধরনের নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তাদের অপরাধ একটাই, তাদের আত্মীয় বা বন্ধু এ রেডিওতে কাজ করছেন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আরএফএতে কর্মরত ছয় উইঘুর কর্মীর কমপক্ষে ৪০ জন স্বজন হয়তো তাদের বন্দিশিবিরে বা তাদের কারাগারে রয়েছে অথবা গুমের শিকার হয়েছে।

আরএফএ রেডিও স্টেশনটিতে প্রতিদিনই নির্যাতিত উইঘুরদের সাথে ফোনে কথা বলে সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর পরিবেশন করা হয়। কখনো কখনো দিনে এই ফোনের পরিমাণ বেড়ে ১০০তে গিয়ে পৌঁছে। উইঘুরদের নিয়ে এ বিশেষ অনুষ্ঠান প্রতিদিন দুই ঘণ্টা শর্টওয়েভ রেডিও ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। চীন সরকার এটি প্রচারের সময় আরএফএর ফ্রিকোয়েন্সি জ্যাম করে ফেলে, যাতে কেউ এ অনুষ্ঠান শুনতে না পারে। কিন্তু জিনজিয়াংয়ে থেকে চলে যাওয়া উইঘুরদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যখন তারা চীনে ছিলেন তখন তাদের প্রতি পাঁচজনের একজন সপ্তাহে অন্তত একবার আরএফএর সংবাদ পড়ত বা রেডিও শুনত।

কিন্তু চীন সরকারের ব্যবহৃত প্রযুক্তির ভয়ে অনেকেই আরএফএর সাথে কোনো যোগাযোগ রাখতেও শঙ্কা অনুভব করেন। অনেক সাংবাদিকই জিনজিয়াংয়ের বিষয়ে কিছু বলতে চান। কিন্তু তারা সরকারের ভয়ে ফোনেও কথা বলতে সাহস পান না। কারণ কর্তৃপক্ষ ভয়েস-রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত তাদের পরিচয় বের করে ফেলে এবং ফোনালাপ বন্ধ করে দেয়। তবে আরএফএর এ অনুষ্ঠান প্রচারের ফলে চীনের জিনজিয়াংয়ে নির্যাতিত মুসলমানদের দিকে বিশ্বের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছে। কারণ সেখানকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তা খবরে তুলে নিয়ে আসা সাংবাদিকদের জন্য প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।

চীনা সরকার আরএফএর এসব অনুষ্ঠান বন্ধ করতে না পেরে পুরো সংস্থাটির ওপরই বেশ কিছু অভিযোগ করছে। তবে নিজেরা সরাসরি না করে অন্যদের মাধ্যমে তারা যেসব অভিযোগ উত্থাপন করছে সেগুলো হচ্ছে উইঘুরদের যেসব নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর অনেকটুকুই ভিত্তিহীন ও নাটকীয়। এছাড়া মার্কিন কর্তৃপক্ষ মূলত প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যই এ সংস্থায় বিনিয়োগ করছে।

২০১৮ সালে যখন চীন সরকার প্রথমবারের মতো উইঘুর বন্দিশিবিরের কথা স্বীকার করে, তখন আরএফএ সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে আটকে রাখা উইঘুর মুসলমানদের সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস ধরে কমিউনিস্ট পার্টির নীতিকথা শেখানো হতো। বিচ্ছিন্নতাবাদের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাবধান করা হতো। জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য কিছু বিদেশী গণমাধ্যম ও কূটনীতিকদের সেখানে পর্যবেক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তাদের সে সাজানো আয়োজনের পরও ওই সফরে অংশ নেয়া আলবেনিয়ার ওলসি জাজেশি বা জার্মান পন্ডিত আদ্রিয়ান জেঞ্জের মতো অনেকেই বলেন, ওই সব প্রশিক্ষণ শিবির মূলত মগজ ধোলাইয়ের কারখানা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিষয়টি নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে।

মূলত উইঘুর পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ফলে এই অঞ্চলের মুসলমানদের ভাগ্যবিড়ম্বনা ক্রমেই বাড়ছে। চীনা সরকার মুসলমাদের আত্মপরিচয় মুছে ফেলার জন্যই প্রায় দশ লক্ষাধিক মানুষকে বন্দী শিবিরে আটক রেখেছে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাচ্ছে। এমনকি তাদের আদর্শ ও আত্মপরিচয় মুছে ফেলার জন্য সমাজতান্ত্রিক মতবাদ গ্রহণের জন্য মগজ ধোলায় সহ নানা ভাবে চাপও প্রয়োগ করা হচ্ছে। মূলত এসব বন্দীশিবির পুরো বিশ্বথেকেই বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। তাই উইঘুরদের আত্মপরিচয় হারিয়ে যায় কি না সে আশঙ্কায় করছেন বিশে^র আত্মসচেতন মানুষ।

লেখক: সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
smmjoy@gmail.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *