মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও সংকটের স্বরুপ

আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা গত কয়েক যুগ ধরে মৌলিক বিজ্ঞান পড়াশোনা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনায় মৌলিক গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির বিষয়টি অনেকাংশে অনুপস্থিত। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো পড়াশোনা এবং গবেষণা ক্ষেত্রে উন্নত এবং যথাযথ সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা গত কয়েক যুগ ধরে মৌলিক বিজ্ঞান পড়াশোনা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

মৌলিক বিজ্ঞানে মেধাবীরা না আসলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিযোগিতায় আমাদের কোন অংশগ্রহণই থাকবে না। ভবিষ্যতে এক ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। উন্নত গবেষণার জন্য প্রয়োজন সুন্দর পরিবেশ, ফান্ডিং এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

দুনিয়া কাঁপানো রুশ বিপ্লবের সময় লেনিন বলেছিলেন, বুদ্ধি-বিবেচনার সাথে বিপ্লবের কাজে অংশগ্রহণ করতে হলে অধ্যায়ন অপরিহার্য। রুশ বিপ্লবের আগে এবং বিপ্লবের সময়ে কৃষক-শ্রমিক, মেহনতী মানুষের মুক্তির জন্য নিরক্ষতা, অজ্ঞতা আর কুসংস্কার থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য বিপ্লবী লেনিন শুধু অধ্যায়ন এবং তার সাথে সমাজে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ক্ষান্ত হননি, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রাশিয়ায় গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনাকে তিনি উন্নত এবং আধুনিক করতে বহুমুখী পদক্ষেপ ও গ্রহণ করেছিলেন।

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল প্রায় অর্ধশত বছর রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থেকে বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম নেতার মর্যাদা পেয়েছিলেন। চার্চিল শুধু রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন পুরোদস্তর লেখক ও। ৪০টির বেশি বই রচনা করে ইংরেজি সাহিত্যে সমৃদ্ধ করেন। এমনকি তার ইতিহাস গ্রন্থ হিস্টরি অফ দ্য সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার এর জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ও পেয়েছিলেন।

মার্কিন মুল্লুকে আব্রাহাম লিংকন থেকে শুরু করে হালের বারাক ওবামা শুধু রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না, ছিলেন আপাদমস্তক একজন পাঠক এবং লেখক।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রচুর বই কিনতেন, নিজস্ব পাঠাগারে ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শনের বই আলাদা আলাদা সেলফে সুবিন্যস্ত করে রাখতেন। অধ্যায়ন এবং জ্ঞান বিতরণের সাথে এমন সংশ্লিষ্টতার পরেও বিদ্যাসাগর আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমার তো খুব ইচ্ছে ছিল যে, পড়াশোনা করি কিন্তু কই তা হলো!!!

আমাদের দেশে কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিবিদসহ শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত লোকজনের একটি বড় অংশ পড়াশোনা থেকে যোজন যোজন দূরে। বস্তুত রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের অন্ধ আনুগত্য করে থাকে। অথচ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের অবদান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুসরণীয়। তখন সব বৈষম্য এবং অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকতেন সমাজের সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ। বর্তমান সময়ের মতন রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের অন্ধ আনুগত্য প্রয়োজন হতো না।

মূর্খ পাকিস্তানি শাসকরাও বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদদের জ্ঞানের গভীরতা, ব্যক্তিত্ব এবং দেশপ্রেম বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার আগে আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ধরে নিয়ে গিয়ে কাপুরুষের মতন হত্যা করেছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং বিশেষ করে শিক্ষাগত দিক থেকে দুর্বল ও পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল।

একসময় আমাদের দেশে ছোট ছোট সাহিত্য সংগঠন ছিল এবং দেশে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ও হতো। কিন্তু এখন আগের মতন ঐসব হয় না। কিছু সাহিত্য সংগঠন থাকলেও কাজকর্মে তারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। আজকাল আমাদের জাতীয় গ্রন্থাগারে দীর্ঘলাইন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এই ভিড় পাঠকের নয়, চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষার্থীদের। বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। উন্নত বিশ্বে ওইসব কল্পনাও করা যায় না।

গর্বের সাথে বলতে হয় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদের মতন লোক ও এদেশে আছে। তিনি নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। নিঃসন্দেহে তা অতুলনীয়। বাস্তববোধ, চিন্তাধারা, কর্মনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি ক্ষুরধার করতে হলে অধ্যায়নের অভ্যাস গড়ে তুলতেই হবে এবং এর কোন বিকল্প নেই।

শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টরা যদি অধ্যয়ন বিমুখ হয়ে পড়েন তাহলে অন্যরা কি করবে?
অধ্যয়নের ব্যত্যয় ঘটছে বলেই অধঃপতন হতে চলেছে সাংস্কৃতিক রুচির এবং উত্থান হচ্ছে হানাহানি, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতি এবং মানবতাপরিপন্থী নানাবিধ বৈষম্যর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মানের উৎকর্ষ অর্জন করতে হলে প্রথমেই একজন দক্ষ স্বাধীনচেতা, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন যোগ্য শিক্ষাবিদকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়াই শ্রেয়। উপাচার্য দলীয় আনুগত্য না করে শিক্ষা, গবেষণা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একমাত্র মেধাই প্রাধান্য দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক দলীয় রাজনীতি এবং ব্যক্তি স্বার্থভিত্তিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বন্ধ করতে বিশেষ উদ্যোগ নেবেন।

গাড়ির ইঞ্জিন ভালো থাকলে একজন দক্ষ চালক যথাসময়ে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিন হচ্ছে উপাচার্য। ইঞ্জিনের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং কার্যক্ষমতা সঠিক হলে নৈপুণ্যের সাথে তার সক্ষমতা দিয়ে সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারেন। ৭৩ এর অধ্যাদেশে উপাচার্যদের ক্ষমতা অসীম। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল এবং সিন্ডিকেটের চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা যায় উপাচার্যের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এবং সততা দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে যোগ্য নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ছাত্র শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানসম্মত জ্ঞানচর্চা, সঠিক গবেষণা এবং রাজনীতির বাহিরে গিয়ে স্বাধীন মত প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে লেখাপড়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের সময় অলিখিত এবং অমানবিক কিছু চর্চা বিদ্যমান। অনেক সময় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পায়। এমনকি রাজনৈতিক কর্মীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য রিকোয়ারমেন্ট ও শিথিল করা হয়। আবার অনেক সময় আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। দেশের অধিকাংশ পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় নিজস্ব স্নাতকরাই একচেটিয়া শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করা ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়োগ দিতে তেমন একটা দেখা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ পদে শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ভাইভা দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইভা বোর্ডের এক প্রফেসর তাকে বললো, আমরা তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী নিয়োগ দেয় না। অথচ ওই ছেলের সব রিকোয়ারমেন্ট থাকা সত্ত্বেও তাকে বৈষম্যর শিকার হতে হলো। পেপার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সময় কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী প্রার্থী হতে পারবেন না।

অথচ উন্নত বিশ্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যায়। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং গবেষকদের বড় একটি অংশ পড়াশোনা করেছেন নিজ দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ভিন্ন দেশের ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। উন্নত বিশ্ব কখনো দেখেনা যোগ্য চাকরিপ্রার্থী ব্যক্তি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা, নাকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা। তাদের কাছে যোগ্যপ্রার্থীই হচ্ছে আসল প্রার্থী।

ইউরোপ- আমেরিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায় না। এমনকি অনেক দেশে প্রভাষক পদ ও নেই। সরাসরি সহকারি প্রফেসর নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউরোপ- আমেরিকাতে শুধুমাত্র সিজিপিএ এর উপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া কল্পনাও করা যায় না। তারা গবেষণাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় এবং সাথে পিএইচডি ডিগ্রি অবশ্যই থাকা অত্যবশ্যক।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধুমাত্র সিজিপিএ এর ওপর নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রয়োজন হয়না কোন পিএইচডি, গবেষণা পাবলিকেশন এবং পাঠদানের সক্ষমতা। এককথায় আমাদের বাংলাদেশে শুধুমাত্র মুখস্তবিদ্যা দিয়ে ভালো সিজিপিএ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায়। যেটা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে সেই পুরনো সিলেবাস দিয়ে। অথচ সিলেবাস আপডেট করা এখন সময়ের দাবি। কেননা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে দেশ দিন দিন পিছিয়ে পড়বে। একশ্রেণীর শিক্ষক সিলেবাস আপডেট করতে চাই না। কেন বা চাইবে! নতুন সিলেবাস হলে তো তাদের ভালো করে পড়াশোনা এবং কিছুটা গবেষনা করা ও লাগবে। কিন্তু তারা তো তা চায় না। সেই পুরনো ক্যাসেট বারবার চালাতে তারা খুব বেশি ব্যস্ত।

আমাদের দেশে পিএইচডি ছাড়া ও প্রফেসর হওয়া যায়। যেটাকে বয়স ভিত্তিক প্রমোশন বলে। বয়স ভিত্তিক প্রমোশন উন্নত দেশে নেই। পিএইচডি ছাড়া উন্নত বিশ্বে কোথাও অন্ততপক্ষে প্রফেসর হওয়া যায় না।

জগদীশচন্দ্র বসু নিজের মাইনের টাকায় অশিক্ষিত দেশীয় শ্রমিকদের বুঝিয়ে সাধারণ উপকরণে তৈরি যন্ত্রপাতির সাহায্যে পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা করেছিলেন। তখনকার বৈজ্ঞানিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিলেন। উনবিংশ শতকে জন্ম নেওয়া পঞ্চকবিরা ও বাঙালির সৃজনশীলতা বিকাশে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন।

এদেশে এমন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছে, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া দেখে দেখে পাঠদান করে থাকেন। অথচ যেকোনো শিক্ষকের ক্ষেত্রে ক্লাসে ভালো পাঠদানের জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে পূর্ব প্রস্তুতি এবং ওইদিনের লেকচারটি চমৎকারভাবে অরগানাইজ করে রাখা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শর্টকাট রাস্তা বলে কিছু নেই। একজন শিক্ষকের উচিত পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে ভালো পাঠদান করা, এবং গবেষণা চালিয়ে যাওয়া। পিএইচডি শেষ করে বসে থাকার জায়গা বিশ্ববিদ্যালয় নয়। গবেষণা করে নতুন ধ্যান - ধারণা এবং জ্ঞান বিতরণ করাই একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এর প্রধান কাজ।

আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। পোশাক শিল্প, যোগাযোগ এবং কৃষি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। এমনকি খেলাধুলায় ও আমরা অনেক উন্নতি করেছি। অথচ গবেষণা এবং উচ্চ শিক্ষায় আমরা এখনো উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে আছি। উচ্চ শিক্ষায় উন্নয়ন এবং গবেষণায় আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে গেলে অসম্ভব কিছুকে সম্ভব করা কোন ব্যাপারই না। জাতীয় স্বার্থে আমাদের উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণা আন্তর্জাতিকীকরণ অপরিহার্য।

জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় না করে প্রয়োজনে দেশের স্বার্থে কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় করাই শ্রেয়। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি নতুন জ্ঞান ও সৃষ্টি করা যাবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় ও আমাদের দেশে নেই। কোন ভাল কাজের প্রচেষ্টা কখনো বৃথা যায় না। ভালো কাজের মূল্যায়ন একদিন কোনো না কোনোভাবে অবশ্যই হবে।

দক্ষিণ এশীয় তালিকায় বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ১০০ তালিকার মধ্যে ও নেই। যদিও দেশের স্বনামধন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এর তকমা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চরিত্র খুবই ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক অন্যজনের থিসিস চুরি করে দেশে আলোড়ন ও সৃষ্টি করেছিল। যেটা কোনভাবেই কাম্য ছিলনা।

লন্ডন ভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের সর্বশেষ দুইটা জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এক হাজারের পরে। শিক্ষার পরিবেশ গবেষণার সংখ্যা ও সুনাম, সাইটেশন বা গবেষণার উদ্ধৃতি,এখাত থেকে আয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতাসহ ৫টি মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এর অবস্থান আমাদের অনেক আগে। এমনকি গণতন্ত্রহীন এবং ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানের অবস্থান ও আমাদের আগে। তাদের দুই দেশেরই বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান হাজারের মধ্যে অবস্থান করছে। এমনকি নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা ও হাজারের মধ্যে অবস্থান করছে।

তাহলে আমাদের এই অধঃপতন কেন?

ইউরোপ আমেরিকাতে একজন মেধাবী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র - ছাত্রীকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকে। আমাদের দেশের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী উন্নত বিশ্বে গিয়ে পিএইচডি, গবেষণা করার সুযোগ পাচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে ইউরোপ-আমেরিকার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছে। আর আমাদের দেশে শিক্ষক হওয়া তো দূরের কথা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স, এমফিল এবং পিএইচডি করা খুবই দুষ্কর।

এই দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একরকম নীতি অনুসরণ করা হয়। আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আরেক রকম নীতি অনুসরণ করা হয়। উন্নত বিশ্বের কোথাও এমন দ্বৈতনীতি নেই বললেই চলে।

বিশ্বায়নের যুগে যখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের যেকোন মেধাবী শিক্ষার্থীকে স্নাতকোত্তর কোর্স পড়ার সুযোগ পান। এমনকি যখন হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মতন প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো শিক্ষার্থীকে পিএইচডি বা উচ্চপর্যায়ের কোর্সগুলোতে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তখনই অজ্ঞাত কারণে আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় স্বাগত জানাতে কুন্ঠাবোধ করে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী কি অযোগ্য, মেধাহীন??? যদি অযোগ্য, মেধাহীন হয় তাহলে তারা উন্নত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে কিভাবে পিএইচডি বা উচ্চপর্যায়ের কোর্স গুলাতে ভর্তির সুযোগ পায়???

সামাজিক বৈষম্য আইন গর্হিত এবং অমানবিক একটা কাজ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮এর ৩ উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না। কিন্তু আমাদের দেশে যারা আইন মানার কথা এবং বৈষম্য না করার কথা, তারাই আইন ভঙ্গ করে সমাজে বৈষম্য করে।

৭৩ এর অধ্যাদেশে কোথা ও বলা নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হতে পারবেন না।
তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি আইনের ঊর্ধ্বে???
উচ্চশিক্ষায় একদেশে দ্বৈতনীতি কিভাবে থাকে???

অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি এবং ভালো মানের পাবলিকেশন না থাকলে কেহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য কল্পনা করতে পারেন না। ইউরোপ-আমেরিকা এমনকি এশিয়া মহাদেশের অধিকাংশ দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা পিএইচডি ডিগ্রি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পায় না। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি ডিগ্রি কে ধর্তব্যর মধ্যেই ধরা হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার ক্ষমতাবলে পিএইচডি ডিগ্রি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচিত পিএইচডি ডিগ্রিকে প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু তা না করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন শিক্ষক নিয়োগের সময় এসএসসি-এইচএসসি কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে!!!

যা মোটেও উচিত নয়।

সুইডেনে ও আন্তর্জাতিক মানের বহু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ওই দেশে আমাদের দেশের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন যোগদান করার পর অল্প সময়ের মধ্যে চাকরি স্থায়ী হয় না। ওই দেশে সহকারি প্রফেসর লেভেলে চাকরি স্থায়ী হয়, প্রভাষক পদে নয়।

যদি ফান্ডিং না থাকে সহকারি প্রফেসর লেভেলে ও পজিশন থাকেনা। সুইডেনে বলতে গেলে স্হায়ী চাকরি হচ্ছে প্রফেসর লেভেলে। ওই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার উপর নির্ভর করে চলে। সুইডেনে গবেষণার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরেই কাজ করার সুযোগ আছে। যেমন, টিসিং সহকারি, গবেষণা সহকারি, ইত্যাদি।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতন ট্যাক্সের টাকায় বিনামূল্যে পড়াশোনা করার সুযোগ নেই। ওই দেশে সরকারি - বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি দিয়ে পড়তে হয়। সে দেশের সরকার শিক্ষার্থীদের লোন দেয় পড়াশোনার জন্য। সে লোনের টাকা দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী টিউশন ফি প্রদান করে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে ছাত্র-ছাত্রীরা চাকরি করে লোন এর টাকা পরিশোধ করে থাকে।

আমাদের দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলে তাদের মতন করে চালানো যায়। অনেকটাই ফ্রিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় সময় ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকে। অকালে অনেক মেধাবী তরুণ কে রাজনৈতিক বলির শিকার হয়ে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে বিদায় নিতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার মতন যদি টিউশন ফি দিয়ে পড়াশোনা করতো ছাত্র-ছাত্রীদের উপর একটা ভয় যেমন কাজ করতো, তেমনি পারিবারিক চাপ ও থাকতো। তখন মারামারি, হানাহানি এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেত। সেশনজট নামে কোন শব্দ ও থাকতো না।

উন্নত বিশ্বে গেস্ট টিচার এর প্রচলন আছে। যেমন আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক চীনের বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে গেস্ট টিচার হিসেবে পাঠদান করে আসেন। ওই রকম প্রচলন আরো বহু দেশে আছে। গেস্ট টিচার এর সুবিধা হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদান-প্রদান করা যায়, এবং নতুন গবেষক তৈরি তেও সুবিধা পাওয়া যায়। আমাদের দেশেও উন্নত বিশ্বের প্রচলিত বিধি গুলো অনুসরণ করা যায়। এমনকি চাইলে দেশের সম্পদ দেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কাজে লাগানো যায়।

আমাদের দেশের অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী ও উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক, প্রফেসর এবং বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত আছেন। তাদেরকে চাইলে সুবিধামতো সময়ে দেশে নিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেস্ট টিচার হিসেবে ক্লাস করার সুযোগ দেওয়া যায়। যেটা উন্নত বিশ্ব করে আসছে। তখন আমাদের উচ্চশিক্ষার মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। ব্রেন ড্রেন ও কিছুটা লাঘব হবে।

উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক পর্যায়ে রিসার্চ এবং মাস্টার্স পর্যায়ে থিসিস বাধ্যতামূলক। আমাদের দেশেও সেরকম উচ্চশিক্ষায় রিসার্চ এবং থিসিস বাধ্যতামূলক করা উচিত। অনার্স এবং মাস্টার্স পর্যায়ে যদি গবেষণার মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা যায়, তাহলে পরবর্তীতে গবেষকদের জন্য গবেষণা করা অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে এবং সেটাকে কাজে লাগিয়ে দেশের সম্পদে পরিণত করা যাবে।

মানসম্মত গবেষণার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি দরকার। উন্নত বিশ্বে শিল্পপতিরা তাদের নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এবং গবেষণার উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশের শিল্পপতিদের ও উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া উচিত।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। এমন ও নজির আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিজ ডিপার্টমেন্টের ছাত্র-ছাত্রীকে পরীক্ষার খাতায় কম নাম্বার দেয়, যাতে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে না পারে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচিত অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা। কেননা সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি দশটা পাবলিকেশন করে, তার চেষ্টা থাকবে তার চেয়ে বেশি পাবলিকেশন করার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হওয়ার কথা শান্তশিষ্ট, নিরহংকার এবং নীতি-নৈতিকতাওয়ালা। যে যত বেশি জ্ঞানী হয়, সে তত বেশি পোলাইট হয়। একশ্রেণীর হুজুররা মনে করে তারাই জান্নাতী এবং তারাই সব ধর্মীয় নিয়ম-কানুন জান্তা। তদ্রূপ এক শ্রেণীর শিক্ষকও মনে করে তারা মহা পন্ডিত। অনেক সময় বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মাঝেও অহংকার বোধ কাজ করে। যেটা করা উচিত নয়। প্রচলিত একটা কথা আছে, পীর সাহেব ভালো হলে বেশিরভাগ মুরিদ ও ভালো হয়। তদ্রূপ শিক্ষক ভালো হবে বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রী ও ভালো হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল শোষণমুক্ত সমাজ এবং রাষ্ট্র গড়ার। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন লালিত করে এবং বুকে ধারণ করে মুজিববর্ষে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সমাজের এবং রাষ্ট্রের সকল স্তরের বৈষম্য দূর করে, উচ্চশিক্ষায় এবং গবেষণায় যুগোপযোগী পরিবর্তন নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি দিয়ে।

শামসুদ্দিন ইলাহী, এলএলবি, এল এল এম।

(বি: দ্র: মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

জেএম/এএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *