শুক্রবার ৩, ডিসেম্বর ২০২১
EN

উচ্চশিক্ষায় ছাত্ররাজনীতি যখন বল্গাহীন

বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে দলীয় রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। যে দল ক্ষমতায় যায় সে দলের ছাত্রনেতারা একচেটিয়া ভাবে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতি ছিল সকলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে দেশের জন্যে, জনগণের জন্যে, ভাষার জন্যে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণের জন্য। এমনকি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করতো। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন এবং ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্ররাজনীতির অসামান্য অবদান ছিল এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ছিল। 
 
৯০ এর পরবর্তীতে ছাত্ররাজনীতিতে পচন ধরেছে। ছাত্ররাজনীতি হওয়ার কথা ছিল ছাত্রদের কল্যাণের জন্যে এবং দেশের জন্যে। 
 
বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে দলীয় রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। যে দল ক্ষমতায় যায় সে দলের ছাত্রনেতারা একচেটিয়া ভাবে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ  করে থাকে। 
 
নতুন ছেলে-মেয়েরা ভর্তি হওয়ার পর অনেক সময় ছাত্র নেতারা তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখায় ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার জন্যে। এমনকি অনেক সময় তাদের দলীয় মিছিল, মিটিংয়ে যেতে বাধ্যও করা হয়। যে সময় তাদের হাতে বই কলম থাকার কথা, তার পরিবর্তে লাঠি হাতে নিয়ে এবং দেশীয় অস্ত্র হাতে নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যায়। 
এর নাম কি ছাত্ররাজনীতি???
 
বর্তমান ছাত্ররাজনীতি সুফল এর পরিবর্তে কুফলই বেশি বয়ে আনছে। যেটা ৯০ দশকের আগে লক্ষ্য করা যেতো না। অধিকাংশ ছাত্রনেতা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহার করে যেমন দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত, অন্যদিকে তাদের ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতেও ব্যস্ত। যে টাকাগুলো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের উন্নয়নের জন্যে এবং কল্যাণের জন্যে ব্যবহার করার কথা।  কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ছাত্রনেতাদের হাতে অনেকটাই অসহায় এবং বন্দী।
 
এক সময় ছাত্ররাজনীতি থেকে আদর্শ এবং ন্যায় নীতিবান রাজনীতিবিদ তৈরি হতো। কিন্তু এখন ছাত্ররাজনীতি তাদের নীতি হারিয়ে চাঁদাবাজি,টেন্ডারবাজি, মারামারি, খুনাখুনি এবং নারীর শ্লীলতাহানীর মতো জঘন্য অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত। প্রশাসন শুধু দর্শকদের মতো নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে। যারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রশাসনের খুঁটির জোর নেই। কারন প্রশাসনের চেয়ে ছাত্রনেতাদের খুঁটির জোর অনেক বেশি। ছাত্রনেতাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে রাজনীতিবিদরা। 
 
আজকের শিক্ষাঙ্গনে যে নৈরাজ্য এবং বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে দেশের বিরাজমান রাজনীতি থেকে তার সবগুলোর উদ্ভব। ছাত্ররাজনীতির গুণাগুণের বিষয়ে একটা ধারণা থাকা উচিত, কোন কাজগুলোকে ছাত্ররাজনীতির অন্তর্ভুক্ত করা যাবে, আর কোন কাজ গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। 
 
বর্তমানে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় যে ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে তাতে করে অধিকাংশ নীতিহীন, নৃশংস এবং যা তা  ছেলে-মেয়েরাই ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা পালন করে আসছে। 
অন্যবিধ মানবিক গুণাবলী অধিকারের ছাত্র-ছাত্রীরা নেতৃত্বের আসন গ্রহণ করতে পারছেন না। 
 
মায়ের দুধে যেমন শিশুদের অধিকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা তেমনই প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীদের ন্যায্য অধিকার। গুটিকয়েক তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে গোটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ করে দেয়, তখন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছাত্র-ছাত্রীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। ছাত্র-ছাত্রীরা যথা সময়ে তাদের কোর্সগুলো সম্পন্ন করে বের হতে পারে না। যখন পাশ করে বের হয় তখন চাকরির বয়স প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে আসে। বিশেষ করে মেয়েদের বিয়ের সঠিক বয়সটাও  ফুরিয়ে যায়। মা-বাবার দুর্দশার অন্ত থাকে না। 
 
যেকোনো ক্ষমতাসীন দল সব সময় চেষ্টা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতির ক্রীড়াক্ষেত্র হিসেবে পরিণত করতে। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রীড়াক্ষেত্র নয়। কালো টাকা যেমন সাদা টাকাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়, তেমনি সমাজের অধিকাংশ খারাপ মানুষগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন শিরোভাগ দখল করে থাকে। 
 
উন্নত বিশ্বে ছাত্ররাজনীতি করা হয় ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্যে এবং কল্যাণের জন্যে। যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশন ফি, আবাসন ব্যবস্থা ইত্যাদি। আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতি বলতে দলীয় পদবী নিয়ে নেতা হয়ে লেজুড়বৃত্তি বা লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে হাত খরচের টাকা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে নেতাদের পেট চালানো। 
 
আমাদের দেশে বড় বড় রাজনীতিবিদদের সন্তান-সন্ততি উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে চলে যায়। যথা সময়ে তাদের কোর্সগুলো সম্পন্ন করে বের হয়ে যায়। আর আমাদের দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুনাখুনি,মারামারি এবং সেশনজট হলেও তাদের মাথা ঘামানোর তেমন ইচ্ছে নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কিভাবে নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি চর্চা করা যায়, সেদিকে নজর দিতেও তাদের তেমন একটা দেখা যায় না। আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা অপরাজনীতির শিকার।
 
এদেশের অধিকাংশ ছাত্রনেতা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে খালি হাতে। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়ার সময় এন্তার সম্পদের মালিক হয়ে বের হয়। অথচ তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজসেবক এবং মানবিক মানুষ হিসেবে বের হওয়ার কথা। 
 
উচ্চশিক্ষায় ছাত্রসংসদ গুলো একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে থাকে কথিত কিছু ছাত্রনেতা। তাদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরেও ক্ষমতার লোভে কোন একটা বিষয়ে ভর্তি নিয়ে রাখে। অথচ সেখানে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা তরুণদের। কিন্তু সেখানে মেয়াদ উত্তীর্ণ ছাত্ররা ছাত্রনেতা হয়ে বসে থাকে। যেটা উন্নত বিশ্বে কোথাও নেই।
 
গ্রামে একটা প্রচলিত কথা আছে, গ্রামের বউ সবার বাউস। এদেশের ছাত্র নেতারা বাউসের মতন সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহার করে তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে থাকে। বহির্বিশ্বের ছাত্র রাজনীতির সাথে আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির বিস্তর তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। 
 
ইউরোপ-আমেরিকায় ছাত্ররাজনীতিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দলীয় রাজনীতি থাকে না। ছাত্ররাজনীতি শুধুমাত্র কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে নেই মারামারি-হাতাহাতি টেন্ডারবাজি এবং সেশনজট। 
 
অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজের মত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কোনো সম্পৃক্ততা থাকেনা। 
 
যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়াতেও ছাত্রদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করে থাকে অনেকগুলো সংগঠন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তারা সরব  হয়। তবে সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন প্রভাব থাকে না। ছাত্রনেতারা দেশের স্বার্থে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থে কাজ করে থাকে।
 
আমাদের দেশে ঠিক উল্টোটা লক্ষ্য করা যায়। যথা সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। অথচ দেশে গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে!!! স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও বঙ্গবন্ধুর আমলে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। তখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল একেবারে ভঙ্গুর। এমনকি স্বৈরশাসক এরশাদের সময়েও দুইবার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তিতে ডাকসু নির্বাচন হয় ২৮ বছর পরে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদের নির্বাচনে কোনো খবরই নেই, নির্বাচনের জন্যে দৃশ্যমান কোনো আন্দোলনও নেই। 
 
ছাত্র-ছাত্রীরা যদি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো হাজার চেষ্টা করলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের আধিপত্য এবং সন্ত্রাস চালু রাখতে পারবে না। যথা সময়ে তাদের কোর্সগুলো সম্পন্ন  করে, চাকরিতে প্রবেশ করে বাবা-মায়ের  স্বপ্ন পূরণ করতে অনেকটাই সক্ষম হবে। উচ্চশিক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের উচিত সন্ত্রাসবিরোধী সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

শামসুদ্দিন ইলাহী, এলএলবি, এল এল এম।

samshuddin.elahi@gmail.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)
 
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *