মঙ্গলবার ২৫, জানুয়ারী ২০২২
EN

উৎসর্গের মাধ্যমেই সৃষ্টি ঈদুল আযহা

বছর ঘুরে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহা মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম।

বছর ঘুরে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহা মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম।

সারা বিশ্বে মুসলমানরা হিজরী বর্ষের দ্বাদশ মাস জিলহজ্বের ১০ তারিখে ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ উদযাপন করে।

আরবের অনেক দেশে একে বড় ঈদ বা ঈদুল কুবরাও বলা হয়ে থাকে। অন্যান্য দেশেও এর নিজস্ব ভিন্ন নামও রয়েছে তবে এর অর্থ ও তাৎপর্য অভিন্ন।

আনাস (রা.) বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূল (সা.) মক্কা থেকে হিযরত করে মদীনায় যাওয়ার পর দেখলেন যে সেখানকার লোকেরা জাহেলিয়াতের আমলের দু'টি উৎসব দু'দিন পালন করে।

মদীনার মুসলমানরা (আনসার) তাতে অংশ নেয়। তিনি তাদেরকে বললেন যে আল্লাহ তাদেরকে জাহেলী যুগের এসব উৎসবের পরিবর্তে দু'টি উত্তম জিনিস দান করেছেন, তাহলো নহরের (জবেহ) দিন ও ফিতরের (রোজা ভঙ্গের) দিন, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।

পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ১৯৬ নম্বর আয়াতে ঈদ উদযাপনের মূল ভিত্তি দেখতে পাওয়া যায় পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদাতে ‘ঈদ' শব্দটি দেখতে পাওয়া যায়, যার অর্থ হলো ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আনন্দ-উৎসব।

ঈদ অর্থ বার বার ফিরে আসাও বুঝায়। তাই ইবনুল আরাবী বলেছেন, ঈদ নামকরণ করা হয়েছে এ কারণে যে তা প্রতি বছর নতুন সুখ ও আনন্দ নিয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে।

ঈদ ও আযহা দুটিই আরবী শব্দ। ঈদ এর অর্থ উৎসব বা আনন্দ। আযহার অর্থ কুরবানী বা উৎসর্গ করা।

হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহ তা’লার আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে প্রাণপ্রিয় জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে তার (হযরত ইসমাঈলের) পূর্ণ সম্মতিতে কুরবানী করতে উদ্যত হন।

মক্কার নিকটস্থ 'মীনা'নামক স্থানে ৩৮০০ (সৌর) বছর পূর্বে এ মহান কুরবানীর উদ্যোগ নেয়া হয়। তার ঐকান্তিক নিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে তার পুত্রের স্থলে একটি পশু কুরবানী করতে আদেশ দেন।

আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য ও নজিরবিহীন নিষ্ঠার এ মহান ঘটনা অনুক্রমে আজও মীনায় এবং মুসলিম জগতের সর্বত্র আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে পশু কুরবানীর রীতি প্রচলিত রয়েছে।

এ দিনে মীনায় হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর অনুপম কুরবানীর অনুসরণে কেবল হাজীদের জন্য নয়, বরং মুসলিম জগতের সর্বত্র সকল সক্ষম মুসলমানদের জন্য এ কুরবানী করা ওয়াজিব (মতান্তরে সুন্নাতে মুআক্কাদা)।

ইবরাহীম (আ.) এর ঘটনাটি পবিত্র কোরআনে এ ভাবে বর্ণিত আছে: “সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম।

অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহিম তাকে বলল- বৎস! আমি স্বপ্ন দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ।

সে বলল; পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন।

যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহিম তাকে যবেহ করার জন্য শায়িত করল, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম- হে, ইব্রাহিম তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে।

আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু” (৩৭: ১০১-১০৭)।

স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে তা বাস্তবায়নে হযরত ইব্রাহিম আলাইহে ওয়াসাল্লাম নিজের প্রিয় পুত্র হযরত ঈসমাইল (আ:) উৎসর্গ করার মতো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্থাপন করলেন আল্লাহর নির্দেশনা।

এতো বড়ো একটি পরীক্ষাকে শুধু পশু কোরবানীর মাধ্যমে সীমিত রাখলে লৌকিকতা নির্ভর ইসলাম চর্চা করা হয়। এর বেশি কিছু নয়। তাই কোরবানীর তাৎপর্য অনুধাবন করা উচিত।

ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, উৎসর্গ বা কোরবানির প্রথা নতুন কোন বিধান নয়। বহুযুগ পূর্বেও কোরবানি প্রথা প্রচলিত ছিল। আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যে উৎসর্গ করা হয়, তা কোরবান নামে পরিচিত।

হযরত ইব্রাহিম, হযরত ইয়াকুব, হযরত মুসা প্রমুখ নবীদের প্রবর্তিত ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানি পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল।

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নিজেই উল্লেখ করেছেন এবং আমি প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য ধর্মানুষ্ঠান নির্ধারণ করে দিয়েছি যে, তিনি পালিত পশু হতে যা দান করেছেন তা’ হতে যেন তারা আল্লাহর পথে দান করে।

পবিত্র কোরানে আল্লাহ উল্লেখ করেন “এদের মাংস বা এদের রক্ত কখনই আল্লাহর নিকট উপণীত হয় না বরং তোমাদের তাকওয়া বা খোদাভীরুতা তার নিকট উপণীত হয়। এরূপই তিনি তাদেরকে তোমাদের জন্য আয়ত্তাধীন করেছেন” (২২:৩৭)।

কোরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্যেই হচ্ছে ত্যাগ ও উৎসর্গের পরীক্ষা। কোরবানীর জীব বা পশু তাঁর নিকট পৌঁছেও না।

পৌঁছে শুধু উৎসর্গকারীর উদ্দেশ্য, ত্যাগ, ধৈর্য্য, ও আত্মোৎসর্গ। আমাদের মনে খোদা-প্রেমের গভীরতার মাত্রা তার কাছে রেকর্ড হয়ে থাকে।

হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.) মানব জাতিকে শিখিয়ে গেছেন কিভাবে ধর্মের জন্য আত্মত্যাগ করতে হয় এবং শিখিয়ে গেছেন কিভাবে ভেতর ও বাইরের শয়তানগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়, কিংবা কখন ছুঁড়তে হয় তাদের দিকে পাথর।

ঈমানের সেইসব কঠিন পরীক্ষায় যারা যত বেশি নম্বর অর্জন করতে পারেন তারাই হন তত বড় খোদা-প্রেমিক ও ততই সফল মানুষ এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে ততই সফল। ঈদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক আনন্দ তারা ঠিক ততটাই উপভোগ করতে পারেন যতটা তারা এ জাতীয় পরীক্ষায় সফল হন।

বাবা-মা, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী ও দরিদ্রসহ সব শ্রেণীর মানুষের অধিকার রক্ষা, আল্লাহর অধিকার রক্ষা এবং নিজের অধিকার রক্ষাসহ সব দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালনের চেষ্টার মাধ্যমে আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন সব বিষয়কে সংশোধন করা সম্ভব। অবশ্য এ জন্য দরকার যথাযথ জ্ঞান অর্জন।

সব ধরনের পাপ ও কলুষতা থেকে মুক্ত থেকে আমরা প্রত্যেক দিনকেই যেন পরিণত করতে পারি প্রকৃত ঈদে, পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে এই হোক আমাদের সবার শপথ ও মহান আল্লাহর কাছে একান্ত প্রার্থনা। সবাইকে রইল ঈদের ফুলেল ও সংগ্রামী শুভেচ্ছা।

এআর/এসএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *