সোমবার ১৭, জানুয়ারী ২০২২
EN

একতরফা নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ ভোটের হার: সরকার ও পর্যবেক্ষকদের ভিন্নমত

ঢাকা: বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটসহ নিবন্ধিত ২৮ দল বর্জিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত প্রদত্ত ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হিসাবের সাথে ভিন্নমত পোষণ করছেন দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকরাও।

[b]ঢাকা:[/b] বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটসহ নিবন্ধিত ২৮ দল বর্জিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত প্রদত্ত ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হিসাবের সাথে ভিন্নমত পোষণ করছেন দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকরাও। তাছাড়া ২০০৮ সালে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার ছিল শতকরা ৮৭ দশমিক ১৩ ভাগ। আর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং নাম সর্বস্ব ১০ দলের অংশ গ্রহণেই কিছু কেন্দ্রে প্রদত্ত ভোটের হার দেখানো হয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। [img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389262673.jpg[/img]                       [img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389262699.jpg[/img] খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোটের দিন বেলা ১টা পর্যন্ত ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের খুঁজে না পাওয়া গেলেও, নির্বাচনের দু’দিন পরে সাড়ে ৪০ শতাংশ ভোট প্রদানের তথ্য প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেশের ৮টি আসনে প্রথম ৫ ঘণ্টায় ভোট পড়ে মাত্র ৬-১০টি। আর দিন শেষে ভোট প্রদানের হার দেখানো হয়েছে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ। একইসাথে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট প্রদানের হার দেখানো হয়েছে ৩৪টি কেন্দ্রে। ভোট গ্রহণের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে তারা জানান,উপরের নির্দেশে আমাদেরকে ভোটের হার বাড়াতে হয়েছে। এলাকাভেদে এই হার ৬০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত করতে বলা হয়। কিন্তু তাতেও গড় ভোট সাড়ে ৪০ শতাংশের বেশি করা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে বলা হয়েছে, ১৩৯টি আসনে মোট প্রদত্ত ভোটের হার শতকরা ৩৯.৮৩ শতাংশ। এই আসনগুলোতে স্থগিত ২০৫টি কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা হিসাবে ধরলে ৪০.৫৬ শতাংশ দাঁড়ায়। অথচ গত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে যেখানে ৪১টি দল অংশ নেয়ার পরও ভোটের হার ছিল ২৬.৫৪ শতাংশ। আগের নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন চলাকালে সিইসি সাংবাদিকদের ব্রিফিং এর প্রাক্কলিত ভোটের হার উল্লেখ করতেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই তথ্য প্রকাশ করতে সাহস পাননি। অনেক হিসাব-নিকাসের শেষে নির্বাচনের দু'দিন পর মঙ্গলবার অনানুষ্ঠানিকভাবে এসব তথ্য প্রকাশ করে ইসি। ভোটের দিন সরেজমিনে ঘুরে ও ২০০৮ সালের কেন্দ্রভিত্তিক ভোট বিশ্লেষনে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হতে হচ্ছে। সে সময় ঢাকা-৬ আসনের একরামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ছিল ৮৭.৬১ শতাংশ। ওই নির্বাচনে ১ হাজার ১৭৬ জনের মধ্যে ভোট প্রদান করেছিলেন ১ হাজার ২৫ জন ভোটার। আর এবার একই কেন্দ্রের ৪টি বুথে ভোটার ছিল ১ হাজার ২৩৬ জন। তবে দুপুর ৩টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ২১০টি। এরপরে ভোটাররা না আসলেও উপরের নির্দেশে ভোটের হার বাড়ানো হয় বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তারা। এ আসনে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীকে জয়ী করতে ভোটের সংখ্যা ৫০৬টিতে উন্নীত করা হয়। তিনি বলেন, বেলা ৩টার পর বুথ-১ এ একজন মহিলা ভোটার ভোট দেয়ার জন্য আসেন। তার ভোটার নম্বর ছিল ২৯৬। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওই মহিলা ভোটারকে বলেন তার ভোট অন্য কেন্দ্রে। এখানে তিনি ভোট দিতে পারবেন না। বাস্তবে তিনি ওই কেন্দ্রের ওই বুথেরই ভোটার। তাকে ভোট দিতে না দেয়ার কারণ হলো বুথে তখন জাল ভোট প্রদানের কাজ চলছিল। তাই তাকে প্রবেশ করতে না দিয়ে ভুল তথ্য দিয়ে সরিয়ে দেয়া হয়। একই কেন্দ্রের ৪ নং বুথে একজন পুরুষ ভোটার আসেন। কিন্তু তখন জাল ভোটের মহোৎসব চলায় তাকেও একই ভাবে বলা হয় অন্যকেন্দ্রে ভোট দেয়ার জন্য। একজন পোলিং এজেন্ট জানান,তাকে বের করে দিয়ে সাড়ে ৩টায় কলাপসিবাল গেইট আটকে দেয়া হয়। [img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389262745.jpg[/img] ঢাকার বাইরেও চিত্র একই চিত্র। মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের পিংরাইলের একটি কেন্দ্রে ভোটার ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২ হাজার ১৮৩টি। ওই সময় ভোট প্রদানের হার ছিল ৮৮.৭৪শতাংশ। মোট ১হাজার ৯৩৮টি ভোট পড়েছিল ৯ম সংসদ নির্বাচনে। আর এবার একদলীয় নির্বাচনেও ভোট প্রদানের হার দেখানো হয়েছে ৮০ শতাংশের বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত একঘন্টায় ৬১টি ভোট পড়ে। এরপর আর ভোটার পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৬৪টি। এরপরে চলে ভোটের হার বাড়ানোর প্রতিযোগীতা। এখানে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা দেখানো হয় ২ হাজার ৯১টি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। তখন ওই আসনে প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৮৭.৫৪ শতাংশ। ওই নির্বাচনে তিনি মোট ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আর এবার বিরোধীদলহীন নির্বাচনে এই আসনে প্রদত্ত ভোটের হার হলো ৮৯.৯৫ শতাংশ। ২ লাখ ১১ হাজার ৯৫১জন ভোটারের মধ্যে শেখ হাসিনা মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৮৫টি ভোট পান। গোপালগঞ্জ-২ আসনে এবার প্রদত্ত ভোটের হার হলো ৯০.৩৬ শতাংশ। ২ লাখ ৬৯ হাজার ৩৭০ ভোটের মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। নবম সংসদ নির্বাচনে এই আসনে প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৮২.৬৯ শতাংশ। শেখ সেলিম পেয়েছিলেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪২টি ভোট। গোপালগঞ্জ-১ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৮৪.২৪ শতাংশ। আর এবার সেই হার হলো ৮৯.৭৪ শতাংশ। এখানে মুহাম্মদ ফারুক খান ২ লাখ ৪০ হাজার ৩০৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আগের নবম সংসদ নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। [img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389262788.jpg[/img] নির্বাচন কমিশনের কয়েক জন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে তারা বলেন,এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা যে হার ঘোষণা করেছে অর্থাৎ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকার চেষ্টা করবে ইসি। বাস্তবিকভাবে হয়তো এ সংখ্যাটা আরো বেশি বা কম হতে পারে। প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা ইসির জন্য কঠিন হবে। এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০ শতাংশেরও কম ভোট পড়েছে বলে দাবি করেছে ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স (ফেমা) ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন। নির্বাচনের পর গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ফেমা ও মানবাধিকার কমিশন এ তথ্য জানিয়েছে। ফেমার প্রধান মুনিরা খান জানিয়েছেন, ‘আমি নিজে রাজধানীর বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে খুব কম ভোটারের উপস্থিতি দেখেছি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের পর্যবেক্ষকরা যেসব খবর দিয়েছেন তাতেও ১০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে বলে জানা গেছে।’ তিনি আরও বলেন, 'রাজধানীর অনেক কেন্দ্রে উপস্থিত পোলিং এজেন্টও জানাতে পারেননি তিনি কোন প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট। মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক অ্যাডভোকেট এ কে আজাদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার ছিল খুবই স্বল্পসংখ্যক। বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল শতকরা শূন্য ভাগ থেকে ১০ ভাগ পর্যন্ত। কিছু কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী ও তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ওইসব আসনে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ ভাগের বেশি ভোট পড়েনি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পড়েছে বা কত শতাংশ পড়লে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে তা বিচার করার দায়িত্ব কমিশনের নয়। এটা বিচার করবে দেশের জনগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *