সোমবার ৬, ডিসেম্বর ২০২১
EN

কেউ দেখতে যায়নি পরিবারটিকে

হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন ইয়াসির আলভী রব। তাঁর পাশে বসে মা রুমানা সুলতানা চোখ মুছছেন

হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন ইয়াসির আলভী রব। তাঁর পাশে বসে মা রুমানা সুলতানা চোখ মুছছেন। বাসের ধাক্কায় ছেলের কোমর ভেঙে গেছে।

বিছানায় শুয়ে আলভী মুখ ও হাত নাড়াতে পারছেন শুধু। পুরো শরীর নাড়ানোর ক্ষমতা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন।

মাত্র চার দিন আগে বাসের ধাক্কায় স্বামীকে হারানোর পর ছেলেও বাসের ‘শিকার’ হওয়ায় শোকের সঙ্গে বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন রুমানা।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় মা-ছেলের এই করুণ অবস্থা। হাসপাতালটির ছয়তলায় চিকিৎসাধীন আলভী।

রুমানা সুলতানা অনেকক্ষণের নীরবতা কাটিয়ে বললেন, ‘এখন কিভাবে ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করব?’

গত বৃহস্পতিবার ভিক্টর পরিবহনের ধাক্কায় নিহত হন আলভীর বাবা সংগীত পরিচালক পারভেজ রব। তাঁর কুলখানির বাজার করতে গিয়ে শনিবার রাতে সেই একই ভিক্টর পরিবহনের আরেকটি বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়েছেন ছেলে আলভী আর নিহত হয়েছেন ছেলের বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটন। বাসের ধাক্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আলভীর কোমর ভেঙে গেছে। ডান হাতের একটি আঙুলও কেটে পড়ে গেছে।

ঘটনাটি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হলেও গতকাল বিকেল পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে, ভিক্টর পরিবহন বা পুলিশের পক্ষ থেকে কেউই শোক আর দুর্দশার সাগরে পড়া পরিবারটির খোঁজ নিতে যায়নি।

আলভীর মা রুমানা বলেন, ‘এমন অভাগাই হলাম আমরা। কেউ খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনটাও বোধ করছে না।’

এদিকে আলভী ও মেহেদীকে চাপা দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তুরাগ এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যালের সামনে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী ও তাদের সহপাঠীরা। তারা বেড়িবাঁধ এলাকার রাস্তা তিন ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে।

ঘটনার বিষয়ে আলভী রব জানান, তাঁর বাবার কুলখানির বাজার করার জন্য তিনি ও বন্ধু মেহেদী শনিবার সন্ধ্যার পর তুরাগের কামারপাড়ার বাসা থেকে আব্দুল্লাহপুর বাজারের উদ্দেশে বের হন। দুজনে রিকশায় চড়ে যেতে থাকেন। উত্তরা স্লুইস গেট এলাকায় গিয়ে প্রচণ্ড যানজট দেখে তাঁরা রিকশা ছেড়ে দেন। এর কিছুক্ষণ পরই যানজট কমতে শুরু করে। তাঁরা একটি খালি বাস দেখে ওঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু হেলপার দরজা বন্ধ করে দেয়। তিনি তখন বাসের জানালা দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার কারণ জানার চেষ্টা করেন, কিন্তু বাসচালক তাঁকে দেখে দ্রুত বাস চালানো শুরু করে। এতে তিনি ঝুলতে থাকেন। আর মেহেদী বাসটি থামানোর জন্য চেষ্টা চালান, কিন্তু বাসচালক ভ্রুক্ষেপ না করে সামনে থাকা একটি মিনিবাসের সঙ্গে চাপা দেয় ঝুলে থাকা আলভীকে। এ সময় তিনি হাত কেটে রাস্তায় পড়ে যান।

আলভী বলেন, পরে গিয়ে তিনি দেখতে পান এই বাসও তাঁর বাবাকে চাপা দেওয়া ভিক্টর পরিবহনের। পরে তাঁকে পথচারীরা রাস্তার পাশে নিয়ে যায় এবং জানায় তাঁর বন্ধু গুরুতর আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। এরপর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরে তিনি নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পান।

রুমানা সুলতানা জানান, দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামী পারভেজ রবের আয়ে সংসার চলত। বড় ছেলে ইয়াসিন ইশরাক মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করে। তাঁকেও খরচ পাঠাতে হয়। আলভী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আর মেয়ে রামিসা ইবনাথ সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

তিনি জানান, স্বামীর মৃত্যুর শোক আর সংসার চালানোর দুশ্চিন্তার মধ্যে ছেলেরও এই দশা হলো। তাঁর কোমর ভেঙে গেছে, হাতের আঙুল কেটে গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দু-তিন মাস লাগবে তাঁর সুস্থ হতে। এক দিনেই হাসপাতালে ২০ হাজার টাকার মতো বিল উঠেছে। ছেলের চিকিৎসার টাকা তিনি কোথা থেকে পাবেন তা নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

রুমানা বলেন, ‘আমাকে আর্থিক সহযোগিতা করার মতো কেউ নেই। এখন আমি কী করব? ছেলের চিকিৎসা চালানো, সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ কিভাবে চালাব ভেবে দিশাহারা হয়ে পড়ছি। কিভাবে ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করব, ভেবে পাচ্ছি না।’

প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার বাসের ধাক্কায় স্বামী পারভেজ রব নিহত হওয়ার পর তাঁর আত্মীয়-স্বজন ভিক্টর পরিবহনের মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারা চেয়েছিল ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিষয়টি মিটমাট করবে। ভিক্টর পরিবহনের পক্ষ থেকে শনিবার নাসির নামের একজন আসারও কথা ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য, কিন্তু তিনি ‘আসছি আসছি’ করে শেষ পর্যন্ত আসেননি।

রুমানা বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর তুরাগ থানায় মামলা করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত চালককে আটক করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি আমার পরিবারের ওপর দিয়ে এত বড় ঘটনা ঘটে গেলেও এখন পর্যন্ত কেউ খোঁজখবরই নিতে আসেনি। সরকারের লোক, পুলিশ কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি। আর ভিক্টর পরিবহনেরও কেউ যোগাযোগ করেনি।’

জানতে চাইলে তুরাগ থানার ওসি নূরুল মুত্তাকীন বলেন, ‘পারভেজ রবের স্ত্রী মামলা করেছেন। আমরা চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারিনি।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভিক্টর পরিবহনের যে বাসটি জব্দ করা হয়েছে সেটি নেওয়ার জন্য কেউ এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।’

মেহেদী নিহত ও আলভী আহত হওয়ার ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার সাব-ইন্সপেক্টর মো. সাদেক বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটানো ভিক্টর পরিবহনের চালক রফিককে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। চালক জানিয়েছে, দুজন বাসে উঠতে চেয়েছিল, এ সময় যাত্রী নেবে না বলে সে চলে যাচ্ছিল।  বুঝতে পারেনি কিভাবে কী ঘটে গেছে।’  সূত্র: কালের কণ্ঠ।

এসএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *