শুক্রবার ৩, ডিসেম্বর ২০২১
EN

কাছ থেকে দেখা মাহাথির ও আনোয়ার ইব্রাহিম

কর্মসূত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে আমার মেশার সুযোগ হয়েছিল। মানুষ সম্পর্কে আমার জানার সূচনা হয় মূলত যখন চাকরিসূত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাই। দেশে থাকতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সম্পর্কে আমার যে মনোভাব ছিল সেখানে গিয়ে একেবারে কাছ থেকে দেখে ও তাদের সাথে মিশে সেই ধারণা বদলে গিয়েছিল।

কর্মসূত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে আমার মেশার সুযোগ হয়েছিল। মানুষ সম্পর্কে আমার জানার সূচনা হয় মূলত যখন চাকরিসূত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাই। দেশে থাকতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সম্পর্কে আমার যে মনোভাব ছিল সেখানে গিয়ে একেবারে কাছ থেকে দেখে ও তাদের সাথে মিশে সেই ধারণা বদলে গিয়েছিল। ইতঃপূর্বে সে বিষয়ে আমি বলেছি। তারপর পিএইচডি করতে গিয়ে একই সাথে বহু দেশ ও মহাদেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের সাথে মিশতে হয়েছে। তাদের বুঝতে চেষ্টা করেছি। তবে কর্মজীবনে এরপরের অংশটিই ছিল মানুষকে বোঝা ও তাদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আমার জীবনের সুবর্ণ সময়। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত, রাজনীতিক, নোবেল পুরস্কারজয়ী ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সব ধরনের মানুষের সাথে আমার মেশার সুযোগ রয়েছে। দেশে-বিদেশে অনেক ব্যক্তিত্বের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, ঘনিষ্ঠতা ছিল অনেকের সাথে। এ ক্ষেত্রে আমার জীবনের সেরা সময়টি ছিল ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক।

বিশ্বনেতাদের সাথে আমার বেশির ভাগ সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতা হয়েছে এই সময়ে। আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছি, এসব মহান লোকগুলোর নব্বই শতাংশই খুব ভালো শ্রোতা। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সাথে আমার কথাবার্তা হতো। তখন তার ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথেও আমার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। তাদের দু’জনকেই খুব ভালো শ্রোতা হিসেবে আমি পেয়েছি। এটা আমার অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণ। বড় মানুষের বিনীত হওয়াটা ছোট হওয়া নয়, সেটি মহত্ত্ব। মাহাথির ও আনোয়ার দু’জনেই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। শুধু নিজের দেশ নিয়ে নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বকে নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করেন। তাদের সাথে আমার কিছু ভাবনা বিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল। আমি আনোয়ার ইব্রাহিমকে প্রথম পেয়েছিলাম কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালে। তখনও তিনি ছাত্র, ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামি)-এর কারণে প্রায়ই তার সৌদি আরব যাওয়া হতো। তার সাথে আলোচনা করে তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তার মধ্যে একটি ভিশনারি চেতনা রয়েছে।

আনোয়ার ইব্রাহিম তখন আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, আলোচিত তেমন কেউ নন। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল তার সম্ভাবনা একদিন ঠিকই প্রকাশ পাবে। মালয়েশিয়া গেলে যখন তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয় তখনো তিনি তেমন বড় কোনো নেতা নন। এরপর তিনি যখন শিক্ষামন্ত্রী হলেন তখন আমি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার (আইআইইউএম) সাথে জড়িত। সেই সুবাদে তার সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তখন আমার মতে একটি বড় ঘটনা ঘটেছিল। সেটি হলো, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের মডেলে একটি সুদভিত্তিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আলোচনা চলছিল। কিন্তু এভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে গরিবের ওপর সুদ চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টি তিনি মানতে পারছিলেন না। বলতে কী আমার সাথে আলোচনার মাধ্যমেই তারা গ্রামীণ ব্যাংকের ডায়নামিক্সটি বুঝতে পারেন। আমি তাদের কাছে ছোট ছোট গ্রুপ গঠন, ঋণদান প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংকের বিস্তারিত কার্যক্রম সম্পর্কে ব্যাখ্যা করি।

১৯৮৩ সালে সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডন্যান্স করেন তখনো আমি কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে। গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে চারদিকে অনেক আলোচনা হচ্ছিল। আসলে যারা রাজনীতিক তাদের তো সব কিছু নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় থাকে না। একজন হয়তো সফলতা দেখিয়েছেন, তখন রাষ্ট্রপ্রধান এসে বলে দিলেন এটা বাস্তবায়ন করতে হবে। মালয়েশিয়া মরিয়া হয়েই এই মডেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। জানি না এটা আমার ইতিবাচক বা নেতিবাচক অবদান ছিল কি না, তবে বিশেষ করে আমি সুদ আরোপ ও নারীর ক্ষমতায়নের পদ্ধতিগত কিছু বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা- এসব এনজিও আমাদের সমাজে নারীদের অগ্রগতির ব্যাপারে অনেক কাজ করেছে। নারীদের ব্যাপারে সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণে তাদের সফলতাকে আমি অস্বীকার করছি না।

কিন্তু আর যা করেছে সেটি হলো ইসলামী মূল্যবোধকে নষ্ট করে দেয়া। তাদের এই কাজটি বিশেষ করে সুদের বিস্তার ও পরিবার ভাঙার কারণ হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন করতে গিয়ে পরিবার ভাঙা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অভিবাসন সৃষ্টি হয়েছে। ঘরে ঘরে সুদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ব্রুনাই থেকে প্রকাশিত আমার এক গবেষণাপত্রে আমি হিসাব কষে দেখেছি, বিভিন্ন কায়দায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করা হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে আমার সাথে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রচুর আলোচনা হয় এবং তিনি একমত হন যে গ্রামীণ ব্যাংকের এই মডেল সত্যিকারের ইসলামিক সমাজে বাস্তবায়নের উপযুক্ত নয়। এটা আমার জন্য ছিল একটি বড় পাওনা।

এরপর আইআইইউএমের সাথে আমি যখন জড়িত ছিলাম তখন শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার কারণে আনোয়ার ইব্রাহিম ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট। তখন আমি তাকে ক্যাশ ওয়াক্ফ সম্পর্কে ধারণ দিই। তিনি সেই ধারণা গ্রহণ করেন এবং মালয়েশিয়াতে এই ধারণা বাস্তবায়নে সহায়তা করেন। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়াতেও এই ধারণা বাস্তবায়িত হয়। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রায় প্রতি বছরই আমি মালয়েশিয়া যেতাম। সেখানে ক্ষমতাসীন দলে রাজনৈতিক মতবিরোধ সৃষ্টির আগ পর্যন্ত আনোয়ারের সাথে সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ কোনো না কোনো উপলক্ষে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হতো।

আমি কোনো উপলক্ষে মালয়েশিয়ায় গেলে তার পক্ষ থেকে নৈশভোজ বা এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেতাম। আমি সরাসরি তার শিক্ষক না হলেও তিনি আমাকে শিক্ষকের মতো সম্মান করতেন। আমি তার শিক্ষকদের সমসাময়িক ছিলাম। তখনই আমি বুঝতে পেরেছি ‘দিস ম্যান ইন দ্য মেকিং এ গ্রেট লিডার অব মালয়েশিয়া’। শুধু মালয়েশিয়া নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্য। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য গড়ে উঠছিলেন। মাহাথিরের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে তাকে বেশ কয়েক বছর রাজনীতির বাইরে থাকতে হয়েছে। সেই ইতিহাস আমরা জানি। আবার দু’জনই পরস্পরকে ক্ষমা করে হাত ধরাধরি করে এখন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন এবং দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এখান থেকে শিক্ষাটি হলো আমাদের ক্ষমা করতে ও ভুলে যাওয়া শিখতে হবে। আমাদের জাতীয় বা উম্মাহর স্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে অনেক ওপরে। মাহাথির যদি আমিত্বকে ধারণ করে বসে থাকতেন তাহলে তার পক্ষে ৯১ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব হতো না। এই মাহাথিরের সময়েই আনোয়ারের ওপর যে অন্যায় হয়েছে তা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতে পারা তার মহত্ত্বের পরিচয়। আমার ইচ্ছে ছিল মালয়েশিয়া গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তাকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। অনেকসময় এমনও হয়েছে আমি যখন মালয়েশিয়া সফর করেছি তখন আমার যেন অসুবিধা না হয় সে ব্যাপারে আনোয়ার ইব্রাহিম ব্যক্তিগতভাবে যত্ন নিয়েছেন। এ জন্য আমাকে কখনো কখনো বিব্রতকর অবস্থাতেও পড়তে হয়েছে। কোনো কনফারেন্সে আমন্ত্রণ পেয়ে হয়তো মালয়েশিয়া যাচ্ছি, তখন দেখা গেল আমার প্লেনের টিকিট আপগ্রেড করে দেয়া হয়েছে।

এ ধরনের আমন্ত্রণে সাধারণত ইকোনমি ক্লাসের টিকিট দেয়া হয়। কিন্তু আমার টিকিট বিজনেস ক্লাসের করে দেয়া হয়েছে। এ রকম একটি ঘটনা মনে আছে : একটি শিক্ষা কনফারেন্সে যোগ দিতে প্রফেসর ড. সৈয়দ আলী আশরাফ ও আমি মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম। আমরা দু’জনে একই সময়ে কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেছি। তিনি ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। পরে বাংলাদেশের দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্চেলর হন। তিনি ছিলেন আমার সিনিয়র কলিগ। আমাকে বিজনেস ক্লাসের টিকিট দেয়া হয় কিন্তু ওনাকে দেয়া হয় ইকোনমি ক্লাসের। আমি নিজে ওনার পাশে এসে বসি। হঠাৎ শুনি মাইক্রোফোনে বলা হচ্ছে ড. মান্নান কোথায়? বললাম, আমি এখানে। আমাকে বিজনেস ক্লাসে যেতে বলা হলো। দু’বার এই ঘোষণা দেয়া হয়। এটা আমার জন্য ছিল বিব্রতকর। পরে শুনলাম যে আনোয়ার ইব্রাহিম আমার ইকোনমি ক্লাসের টিকিট বিজনেস ক্লাসের করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মাহাথিরের সাথে আমার পরিচয় হয় অনেকটা আকস্মিকভাবে। মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টেংকু আব্দুর রহমানের কথা আমরা জানি। তিনি ছিলেন ওআইসির প্রথম মহাসচিব। আমি যখন কর্মোপলক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলাম তখন লেখা একটি বইয়ে আমি বলেছিলাম যে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে ‘ওয়ার্ল্ড মুসলিম ব্যাংক’ ও মুসলমানদের কথা বলার জন্য একটি ফোরাম করতে হবে। আমি ঠিক ওআইসির নাম উচ্চারণ করিনি। তবে ঠিক এই ধরনের একটি ফোরামের ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। ওয়ার্ল্ড মুসলিম ব্যাংকের মধ্যে ইসলামিক মনিটরি ফান্ডের কথাও বলেছিলাম।

আরো বলেছিলাম যে, এসব সংস্থার সদর দফতর সৌদি আরবে তথা জেদ্দায় হওয়া উচিত। সম্ভবত এই বিষয়টি নিয়ে তখনো মুসলিম বিশ্বের কেউ চিন্তা করেনি। আর আমি ছিলাম একজন তরুণ সরকারি কর্মকর্তা। ওই সময়টিতে বেশির ভাগ মুসলিম দেশ স্বাধীন হয়। এরা বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে ছিল, বেশির ভাগ ইউরোপীয় শক্তি। ফলে মুসলিম দেশগুলোতে ইউরোপিয়ানদের বিকৃত মূল্যবোধ ঢুকে পড়েছিল। পাশাপাশি মুসলমানদেরও নিজস্ব একটি মূল্যবোধ ছিল। ফলে মুসলিম দেশগুলোতে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাদের একটি জায়গায় একত্র করা যেতে পারে- সেটি হলো টাকা। এটাই বটমলাইন। যে-ই রাষ্ট্র চালাক তাকে বাজেট করতে হবে, টাকার প্রয়োজন হবে। আমার মনে হয়েছিল এখানে হাত দিলে নতুন স্বাধীন হওয়া মুসলিম দেশগুলোকে একত্র করা যেতে পারে। তখন তেলের শক্তি উঁকি দিচ্ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আমার ধারণা সত্যি হয়েছিল।

টেংকু আবদুর রহমানের সাথে একই দল করতেন মাহাথির। এক সময় দু’জনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মাহাথির দল থেকে বহিষ্কৃত হন। প্রায় আট বছর তিনি দলের বাইরে ছিলেন। কিন্তু নিজগুণে তিনি আবারো দলে ফেরেন। ১৯৮১ সালে তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। আমার মালয়েশিয়া যাওয়া-আসা ছিল। মাহাথির আমাকে চিনতেন না। আমি তখন এক সম্মেলনে মালয়েশিয়া গেলে তার সাথে পরিচয় হয়। এরপর আমি তার সাথে দেখা করার অনুমতি চাই। প্রথম দেখে তাকে আমার ভিশন আছে এমন একজন মানুষ বলে মনে হলো। আমার মধ্যে সব সময় গুণী মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার একটি কৌতূহল কাজ করেছে। মাহাথিরের সাথে দেখা করতে চাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ ছিল মালয়েশিয়ার বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা। সেখানে মালয়রা ভূমিপত্র, এ ছাড়া চীনা, ভারতীয় তামিল ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বাস রয়েছে। ভূমিপুত্ররা আদিবাসী হলেও অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে প্রভাব চীনা ও তামিলদের। মালয়রা তেমন পরিশ্রমী নয়। তারা নিজ দেশেই যেন দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বাস করছে। আমি এই বার্তাটি তার কাছে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম।

আমি সাক্ষাৎ কামনা করার পরদিনই মাহাথির মোহাম্মদ সাক্ষাতের সময় দিলেন। আমি হোটেলে ছিলাম। উনি গাড়ি পাঠাতে চাইলেন। আমি বললাম না, হোটেলের গাড়ি নিয়েই আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতে পারব। অর্থনীতির ওপর আমার লেখা কিছু বই নিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। আমি ঠিক সময়ে গেলাম। তবে উনি ব্যস্ত থাকায় আমাকে ১৫ মিনিটের মতো অপেক্ষা করতে হয়। মহৎ ব্যক্তিদের কাছ থেকে আমরা কত শিক্ষা নিতে পারি সে দিন আবারো বুঝেছিলাম। আমাকে এই ১৫ মিনিট বসিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেন মাহাথির। আমি আইডিবির সাধারণ একজন কর্মকর্তা। এমনটা না করলেও কেউ কিছু মনে করতো না। তিনি চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। আর দেরি হওয়ার কারণও জানালেন। পাকিস্তানের প্রখ্যাত রাজনীতিক ও আইনজীবী এ কে ব্রোহি (করিম বখশ ব্রোহি) এসেছিলেন তার সাথে দেখা করার জন্য।

মাহাথির মেডিক্যাল ডিগ্রি অর্জন করলেও সব বিষয়ে, বিশেষ করে ইসলামের ওপর অসাধারণ পড়ালেখা ছিল। তিনি সব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা রাখতেন। প্রাথমিক আলাপচারিতার পর আমার কয়েকটি বই তাকে উপহার দিয়ে বললাম, আমি শুধু একটি কথা বলার জন্যই আপনার কাছে এসেছি। আপনার সামনে একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ স্থাপনের সুযোগ এসেছে। এ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বজায় রাখার জন্য আপনি কিছু করেন। আপনি নিজের সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করেন। তবে এমন কিছু করা ঠিক হবে না যা চীনা বা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে যায়। উনি আমার আমার কথাগুলো স্বীকার করলেন। আর অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের শিক্ষাটি তো ইসলামেরই শিক্ষা। তিনি সেটি করেছেন। সম্প্রতি ভারতের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করে মাহাথির বলেছেন, আমরা যদি ভারতীয়দের দেশে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য আইন করি তাহলে কেমন হবে?

ওই সাক্ষাতের পর আমাদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। যদিও তিনি অনেক বড়, আর আমি ক্ষুদ্র একজন মানুষ। আমি আমার লেখা ওনাকে পাঠাতাম। উনিও ওনার লেখা আমাকে পাঠাতেন। আমাদের সম্পর্কটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে আসে। তিনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা, ৯৪ বছর বয়স। মানুষ নশ্বর। কিন্তু যারা অমর হয়ে থাকতে চান তাদেরকে সমাজের জন্য মৌলিক অবদান রেখে যেতে হবে। মাহাথিররা এমনই ধরনের মানুষ।

লেখক : ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ

এএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *