সোমবার ১৭, জানুয়ারী ২০২২
EN

কোন পথে ২০ দলীয় জোট

সরকার বিরোধী আন্দোলন জোরদার করে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের লক্ষে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু জোটের আন্দোলন আর নির্বাচন বর্জন সত্ত্বেও ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ

সরকার বিরোধী আন্দোলন জোরদার করে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের লক্ষে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু জোটের আন্দোলন আর নির্বাচন বর্জন সত্ত্বেও ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর ২০ দলীয় জোটের কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। এই বিরোধী জোটের সফলতা নিয়েও হতাশা বিরাজ করছে অনেকের মনে।

কেবল নামেই কি ২০ দলীয় জোট বিশালাকারের-এমন প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে অনেকের মনে। রাজপথের আন্দোলনে কেবলমাত্র বিএনপি-জামায়াত সক্রিয় থাকলেও অন্য কোনো দলের সরব উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় নি। তবে আন্দোলনের মাঠে পিছিয়ে থাকলেও সভা-সমাবেশে জোট নেতাদের বক্তব্য বিবৃতিতে সচল দেখা গেছে বরাবরই।

এ অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আন্দোলনের মাঠে না থেকে কেবল বক্তব্য আর বিবৃতির মাধ্যমে ২০ দলীয় জোটের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন আদৌ সম্ভব কি না?

তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন একটি ক্ষেত্রে ২০ দলীয় জোট সফল হয়েছে। আর তা হলো ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে নানা চেষ্টা আর প্রলোভন সত্বেও জোটভূক্ত কোনো দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহন করানো যায়নি। আর সেকারণেই দেশের জনগণ ২০ দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নির্বাচন বর্জন করেছেন বলে অনেক জোট নেতা একাধিক সভা-সমাবেশে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন।

কিন্তু ২০ দলীয় জোটে ফাটল কিংবা ভাঙ্গণ ধরাতে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করেন জোটের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই। আর এ কারণেই মাঝে-মধ্যে ২০ দলের ফাটল নিয়ে গণমাধ্যমের খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

অন্যদিকে জোটের মূলদল বিএনপির গত কয়েক মাসের কার্যক্রমে জোটের শরীকদের মাঝে কিছুটা দূরত্ব তৈরী হওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সরকারের শর্ত মেনে বিএনপির একলা চল নীতি কিংবা বিদেশী শক্তির পরামর্শে বিএনপি এই কৌশল অবলম্বন করছে বলেও রাজনৈতিক বোদ্ধা মহলের ধারণা।

ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করলেই কেবল বিএনপির সঙ্গে সরকার আলোচনায় বসতে রাজী। সেটিকেও সরকারের কূটকৌশলের অংশ হিসেবেই মনে করছেন বিএনপি ও জোটের নেতৃবৃন্দ।

সব মিলিয়ে আগামী দিনে ২০ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ কি হবে এব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না জোটের কোনো শরিক দলই। আর এসব কারণেই জোটের বিভিন্ন দলের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

এ অবস্থায় সরকারের বর্তমান মেয়াদে বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন করে মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায়ের দাবী কতটা সফল হবে? সেই ভাবনাও সামনে চলে আসছে। আবার বিএনপিও জোটের শরিক দল নিয়ে ক্ষমতাসীন হবে এই ব্যাপারে জোটের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না জোটের কিছু কিছু দল।

জোট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি আন্দোলন করে সরকার হটাতে ও আগাম নির্বাচনের দাবী আদায় না করতে পারলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের রাজনৈতিক ভবিষ্যত কী হবে? সে চিন্তাও রয়েছে জোটভূক্ত দলগুলোর মধ্যে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ দল হিসেবে সংগঠন গুছিয়ে আন্দোলনে নামার যে ঘোষণা বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে তার প্রতিও আস্থা রাখতে পারছে না জোটের শরীক দলগুলো।

এদিকে মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে রাজধানীতে আন্দোলন জমাতে না পারার কারণে ২০ দলের আন্দোলন সফল হয়নি। আর এ কারণেই ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি পূণর্গঠনের ঘোষনাও আটকে আছে। যদিও নির্বাচনের পরপরেই বিএনপির হাইকমান্ড দলের বিভিন্ন কমিটিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে সেই দল গোছানোর কাজ থমকে আছে।

অন্যদিকে নতুন আন্দোলনের রূপরেখো নিয়ে এখনও পর্যন্ত জোটভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনাও করতে পারছে না বিএনপি। যদিও জোট নেত্রী হিসেবে যে কোনো কর্মসূচি নেওয়ার একক দায়িত্ব দেয়া আছে বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবর রহমান টাইম নিউজবিডিকে বলেন, ২০দলীয় জোট একটি বৃহৎ পরিসর। আমরা সবাই দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য একসঙ্গে আন্দোলন করছি। এখানে কাজ করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে কিছুটা সমন্বয়ের অভাব থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তারপরেও আমরা আগামী দিনে বৃহৎ আন্দোলনের জন্য যেমন দল গোছানোর কাজ করছি তেমনি জোটভূক্ত দলগুলোর সঙ্গে আরও সমন্বয়হীনতা কমানোর জন্য আমরা তৎপর রয়েছি। কেননা এই অবৈধ সরকারকে হটাতে হলে বৃহৎ পর্যায়ে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট আহমদ আযম খান টাইম নিউজবিডিকে বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে ২০ দলীয় জোট গঠন করা হয়েছিল সে লক্ষ্যে এখনও জোটের ঐক্য অটুট আছে।

তিনি আরও বলেন, জামায়াত এখনও আমাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আছে। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের নিজস্ব কিছু কার্যক্রম থাকবে, কিছু কৌশলও থাকতে পারে তাতে করে জোটের কর্মসূচিতে প্রভাব পরবে না বলেই আমি মনে করি।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে.জে.(অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহীম টাইম নিউজবিডিকে বলেন, ২০ দলীয় জোট স্থিতিশীল আছে এবং জোটের ঐক্য অটুট আছে। রমজানের পর যখন জোটের আন্দোলন পূণর্জন্ম লাভ করবে তখন জোটের সবাই সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিবে ।

তিনি আরও বলেন, আগামীতে জোটের আকার আরও বাড়তে পারে। যেসব রাজনৈতিক দল দেশ ও জনগণের অধিকার রক্ষার রাজনীতি করে তারাই ২০ দলীয় জোটে যোগ দিবে।

জোটের অপর শীর্ষ নেতা লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ২০ দলীয় জোট তো ক্ষমতায় আসে নি তাহলে হতাশার বিষয় আসবে কেন? এখানে জোটের দল হিসেবে যার যে রকম যোগ্যতা রয়েছে তারা ততটুকু মূল্যায়ন পাবে। কিন্তু মূল্যায়নের সময় তো এখনও আসেনি।

তিনি আরও বলেন, জোটের পক্ষ থেকে যে কোনো কর্মসুচি দেওয়ার ক্ষমতা জোট নেত্রী খালেদা জিয়াকে দেওয়া আছে। তিনি কর্মসুচি ঘোষণা করলেই জোটের সবাই সেই আন্দোলনে শরীক হবেন।

এদিকে, ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী ও কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা টাইম নিউজবিডিকে জানান, ২০ দলীয় জোটে ভাঙ্গন ধরাতে সরকার নানা ধরনের কুটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু এতে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের মাধ্যমে জনগনের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে ২০ দলীয় জোট আন্দোলন করছে। সে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটের ঐক্য বহাল থাকবে। সরকার যতই এ ঐক্য বিনষ্টের চেষ্টা করুক না কেন তাতে সফল হবে না বলেও মন্তব্য জামায়াত নেতাদের।

কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতার বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত নেতৃবৃন্দ জানান এ ধরনের সমঝোতার প্রশ্নই আসে না। জনগণের প্রানের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত ২০ দলে জামায়াতের সক্রিয় ভূমিকা পূর্বের মতোই থাকবে।

উল্লেখ্য, বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয় ২০১১ সালে ১৮ এপ্রিল কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। এরপর চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি কাজী জাফর আহমদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এই জোটে যোগ দেয়ায় ১৮ দলীয় জোট ১৯ দলীয় জোটে পরিণত হয়। পরবর্তীতে গত ২৮ জুন সাম্যবাদী দল যোগদান করায় তা ২০ দলীয় জোটে সম্প্রসারিত হয়।

বর্তমানে জোটে রয়েছে- বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিশ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশ লিবারেল পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), লেবার পার্টি, মুসলিম লীগ, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, পিপলস লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) ও সাম্যবাদী দল।

ঢাকা, এমএইচ, ৮ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) কেবি

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *