শুক্রবার ৩, ডিসেম্বর ২০২১
EN

করোনার থাবা হুমকির মুখে সভ্যতা

করোনা ভাইরাস এমন একটি নাম, যা সম্পর্কে গত ৯০ দিন আগেও মানুষ তেমন কিছুই জানত না। জানত না হোম কোয়ারেন্টিন, লকডাউন, আইসোলেশন সম্পর্কেও। আজ এ নামগুলো শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষের মুখে মুখে।

করোনা ভাইরাস এমন একটি নাম, যা সম্পর্কে গত ৯০ দিন আগেও মানুষ তেমন কিছুই জানত না। জানত না হোম কোয়ারেন্টিন, লকডাউন, আইসোলেশন সম্পর্কেও। আজ এ নামগুলো শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষের মুখে মুখে। মাত্র তিনটি মাসের মাথায় এসে আজ বিশ্বকে একটা বড় রকমের ঝাঁকুনিই দিল ‘করোনা’ নামক ভাইরাসটি। তার ঝাঁকুনিতে টালমাটাল বিশ্বের মোড়ল থেকে শুরু করে একদম রাস্তার ভিখারি পর্যন্ত। সবাই আজ একই সমান্তরালে দাঁড়িয়ে! যুদ্ধবাজ সেই মহাশক্তিধর আমেরিকায় আজ টালমাটাল অবস্থা। তার কোনো মিসাইলই কাজ করছে না করোনার বিরুদ্ধে।

সর্বশক্তি দিয়েও যে মোকাবিলা করতে পারবে না সে কথা ট্রাম্প প্রশাসনের বোঝার আর বাকি নেই। ইতালির ভেনিস থেকে শুরু করে টেমস নদীর পাড়ের সেই শান্তির দেশ ব্রিটেনের মুখেও কোনো রা নেই। করোনা হানা দিয়েছে রাজপরিবারেও। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আজ করোনার কাছে ধরাশায়ী। তিনি এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। পুরো ইউরোপজুড়ে আজ মৃত্যুর মিছিল। বাদ নেই মধ্যপ্রাচ্যও। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ। সবখানেই তার ভয়ানক ছোবল। থামানো যাচ্ছে না কিছুতেই। মৃত্যু বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। হতবাক সবাই।

অদম্য চেষ্টা বেঁচে থাকার। জীবনের সব অর্জিত সম্পদ দিয়ে হলেও আজ সবাই জিততে চায় করোনা থেকে। এমন অচেনা-অজানা অদৃশ্য শক্তির মতিগতি সম্পর্কে এখন পর্যন্তও বিজ্ঞানীরা অন্ধকারেই রয়েছেন, সে আসলে কী চায়, কোথায় গিয়ে থামবে তার এমন ভয়াবহ থাবা। সে সম্পর্কে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

এখনও পর্যন্ত কোনো কার্যকরী ভ্যাকসিন তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের গবেষণার ফলাফল এখনও পর্যন্ত শূন্যের কোঠায়। কিন্তু কেন তার এমন আচরণ? কেন এত রাগ-ক্ষোভ মানব জাতির উপর। সে কথা কি মানুষ ভাবছে একটিবারও? মাত্র একটি ভাইরাসের মাধ্যমে কী শিক্ষা পাচ্ছে মানব জাতি? আল্লাহতায়ালা রাব্বুল আলামিনের দেয়া অসংখ্য গ্রহের মধ্যে শুধু পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারে মানুষ।

মনুষ্যকুলের বসবাসের জন্য সৃষ্টিকর্তা সবই দিয়েছেন নিজ হাতে। কিন্তু আমরা কি তার সদ্ব্যবহার করছি? আজ পৃথিবীতে একক রাজত্ব করার জন্য মানুষের মধ্যে চলছে এক অন্ধ প্রতিযোগিতা। কেউ মিসাইল তৈরি করছে তো কেউ যুদ্ধ বিমান। কেউ করছে পরমাণু অস্ত্র তো কেউবা এটম বোমা, কারও হাতে আছে ড্রোন। শুধুই শক্তির পরীক্ষা। সবুজ বিরান করে করা হচ্ছে উঁচু উঁচু অট্টালিকা। কলকারখানা গড়ে তৈরি করছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের শক্তির মহড়া। কিন্তু একজন যে মহাশক্তিধর বসে আছেন সবার উপরে সে কথা হয়তো তারা ভুলেই গেছে (নাউজুবিল্লাহ)। দূষিত হোক বাতাস, হিমালয়ের বরফ গলছে গলুক ভয়াবহভাবে। বাতাসে কার্বো-হাইড্রোজেনের মাত্রা অতিরিক্ত। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না মানুষ। তাতে কারও কিছুটি আসে যায় না। পৃথিবী বসবাসের উপযোগী থাকছে না। পরিবেশবাদীদের এমন আর্তনাত ওদের কর্ণে পৌঁছে না। 

বিজ্ঞানীদের হুঁশিয়ারিও থামাতে পারছে না ওদের জুলুমবাজি। ওদের শক্তির মহড়া যেন চলছে তো চলবে। কেউ কারও থেকে একটু শক্তি অর্জন করছে তো শেষ করে দাও ওকে। লক্ষ-কোটি মানুষ মারতে কোনো দ্বিধা নেই। দ্বিধা নেই একটি দেশকে যুদ্ধের দামামায় ক্ষত-বিক্ষত করতে। শুধুই একক শক্তির পরীক্ষা! ছোট্ট আইলানের মৃত্যু ওদের বিবেককে নাড়া দেয় না। দেয় না হাজার হাজার নারী-পুরুষ শিশুর মুখ। পৃথিবীতে একক রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে শুধুই খতম করতে হবে প্রতিপক্ষকে। এখানে দয়া-মায়া বলতে কিছু থাকতে নেই। আর বাড়াতে হবে সম্পদের পাহাড়, করতে হবে অস্ত্র মজুদ। এর কোনো বিকল্প নেই। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। এমন প্রতিযোগিতায় আজ সৃষ্টিকর্তা ত্যক্ত-বিরক্ত। ধরণী নিচ্ছে তার নীরব প্রতিশোধ। এমন প্রতিশোধের মুখে পড়েছি আমরা যারা শুধু দু’বেলা দু’মুঠো খেয়েপরে বেঁচে থাকতে চাই তারা।

আমাদের কোনো সম্পদের পাহাড় গড়ার স্বপ্ন নেই, আমরা বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন দেখি না, কোটি কোটি টাকারও স্বপ্ন নেই আমাদের। আমাদের স্বপ্ন একটিই। শুধু  আপনজনদের নিয়ে একটু শান্তিতে বসবাস করার। আমরা শুধুই খেটে খাওয়া মানুষ। আমরা চাই একটি শান্তির ধরিত্রী। যেখানে রোগ-শোক থাকবে, থাকবে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টিও। কিন্তু আজ আমরা এমন সত্য থেকে অনেক অনেক দূরে চলে গেছি। মৃত্যু যেন আমাদের চারিদিকে উঁকিঝুঁকি মারছে। কখন কাকে ধরবে তার কোনো সময়জ্ঞান নেই। এভাবে চলছে আমাদের জীবন। আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি একজন মুসলমান হিসেবে। তারপরও বেঁচে থাকার চেষ্টা।

মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের কার ভাগ্যে কী লিখে রেখেছেন তাও জানা নেই। এই অন্তিম মুহূর্তে তাদের জন্য ফরিয়াদ। তবুও সংশোধন হোক তারা, যারা মানুষের সাথে প্রতারণা করে ভালো থাকতে চায়। ঠগবাজি, মিথ্যার বেসাতি করে নিজেদের স্বার্থে আপনজনদেরও ধোঁকায় রাখতে দ্বিধাবোধ করে না। মিথ্যার উপর যারা জীবন পরিচালনা করতে চায় আল্লাহ এমনদের সঠিক পথে পরিচালনা করবেন, তাদের জ্ঞানের পরিধি খুলে দিবেন, তারা নিজেদের ভুল নিজেরা ধরতে শিখবেন।

তাই এমন অবস্থায় অস্থির হয়ে যাই অতি আপনজনদের কথা ভেবে। যারা ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পাড়ি জমিয়েছে ইউরোপ-আমেরিকাতে। তারা আজ লড়াই করছে করোনার সাথে। অপনজনদের ছেড়ে তারা আজ কেমন সময় কাটাচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি তিনি যেন ওদের মনোবল বাড়িয়ে দেন শতগুণ। বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-পরিজন আরও অনেকেই আছে বিভিন্ন দেশে। কে জিতবে আর কে হারবে এ লড়াইয়ে তাও জানা নেই আমাদের।

এ জীবনে তাদের সাথে আর দেখা হবে কিনা জানি না। মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে শুধুই ফরিয়াদ। তিনি যেন তাদেরকে হেফাজত করেন। তার করুণাভিক্ষা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তিনি যেন এমন বৈশ্বিক মহামারী থেকে বিশ্ববাসীকে হেফাজতে রাখেন। সবাই সুস্থ থেকে ফিরে আসুক আপনজনদের কাছে। আমিন।

লেখক : সাংবাদিক, যায়যায়দিন।

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এবিসিদ্দিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *