শুক্রবার ৩, ডিসেম্বর ২০২১
EN

করোনা : আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা

গোটা দুনিয়া আজ আতঙ্কের বেলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। ঘরে বাইরে সর্বত্র আতঙ্ক। দুর্বিসহ পরিবেশ, পারিপার্শ সবকিছু। নিরাপত্তা আর সতর্কতার চাদর ভেদ করে আতঙ্কের দানব চষে বেড়াচ্ছে সারা দুনিয়া।

গোটা দুনিয়া আজ আতঙ্কের বেলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। ঘরে বাইরে সর্বত্র আতঙ্ক। দুর্বিসহ পরিবেশ, পারিপার্শ সবকিছু। নিরাপত্তা আর সতর্কতার চাদর ভেদ করে আতঙ্কের দানব চষে বেড়াচ্ছে সারা দুনিয়া। চীনের উহান প্রদেশে জন্ম হলেও এর বিস্তৃতি এবং বসবাস এখন গোটা বিশ্বব্যাপী। জীবনের অন্য নাম এখন ভয়, হতাশা আর আতঙ্ক। না দেখা ঘাতকের অনাহুত আগমনের দুশ্চিন্তায় মানুষ দিগভ্রান্ত। অচেনা এ ঘাতকের নাম Covid-19.

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত তথ্যনুযায়ী Corona viruses are a large family of viruses which may cause illness in animals or humans. In humans, several corona viruses are known to cause respiratory infections ranging from the common cold to more severe diseases such as Middle East Respiratory Syndrome (MERS) and Severe Acute Respiratory Syndrome (SARS). The most recently discovered corona virus causes corona virus disease COVID-19.

একের পর এক দেশকে আক্রান্ত করে এ ভাইরাস শুধু সামনে অগ্রসর হচ্ছে। ইতঃমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ। এ লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ হাজার অতিক্রম করেছে। মৃত্যুর সংখ্যা এবং আনুপাতিক হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। স্থবির হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি দেশের সামগ্রিক জীবন প্রণালী। অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম পর্যন্ত থমকে গেছে বেশ কয়েকটি দেশে। চীনের পরে আক্রান্ত দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইতালি এবং ইরান। চীনের সাথে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ, একই অবস্থা ইতালী এবং ইরানের। জাতিসংঘ করোনাকে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। কাবার চত্বরে তাওয়াফ সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুই মসজিদে জুমুআর জামায়াতে উপস্থিতি সীমিত করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের মসজিদগুলোতে অস্থায়ীভাবে নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। কাতার, আরব আমিরাত, কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি দেশে মসজিদে জামায়াতে নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে আজানের ভাষা পরির্তন করা হয়েছে। নামাজের জন্য মসজিদে আসার আহ্বানের পরিবর্তে ঘরে বসে নামাজ আদায়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। কানাডার সরকার আপদকালীন সময়ের জন্য বিশেষ ভাতার ঘোষণা দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে এ যাবৎ পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশ বাদে প্রায় সব কয়টি দেশ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন দেশের নাম এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত (২৩ মার্চ) ৩৩ জনকে করোনা আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে; সরকারি হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা এখন পর্যন্ত তিনজন। কোয়ারেন্টেইনে রাখা হয়েছে সহস্রাধিক মানুষকে, বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখারা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শুরুতে আমাদের দেশের সরকার বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চায়নি। বরং কোনো কোনো মন্ত্রী এটিকে বিরোধী মহলের অপপ্রচার বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন। কোনো কোনো মন্ত্রীর কথা এবং বক্তব্য অযাচিত, অনাকাঙ্খিত দায়িত্বশীল সূলভ বলার কোনো সূযোগ নেই। একটি দেশের সরকারের ভুমিকা যেমন জনণের জন্য আতঙ্কের কারণ হবে না, একইভাবে সরকারের ভুমিকা জনগণের মাঝে কোনো প্রকার চিন্তাহীন,ভাবনাহীন, বল্গাহীন ভাবের উদ্রেক করবে না। সরকারের দায়িত্বশীল ভুমিকা জনগণকে দায়িত্ব সচেতন করবে, সতর্ক করবে, আস্থাশীল করবে। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রই আজ আমাদের চোখের সামনে ধরা দিচ্ছে। আমরা শুরুতে গুরুত্ব না দিলেও দিনে দিনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, বেশী লোক এক যায়গায় সমবেত না হওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে এগুলোর কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না। বিশেষ দিবস পালনের জন্য সরকারিভাবে যেমন বিশাল সমাবেশ করা হয়েছে। অপর দিকে কোয়ারেন্টেইনে থাকা লোকেরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিবস পালনে সরকারের আবেগ উচ্ছাসে কোনো ভাটা নেই। ইসলাম অনাহুত আতঙ্ক এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে নিষেধ করেছে। একইভাবে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ইসলামেরই নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আগে তোমার উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো’। মুহাম্মদ সা. নির্দেশ দিয়েছেন : ‘মহামারী আক্রান্ত এলাকার লোক যেন অন্য এলাকায় না যায় একইভাবে যেখানে মহামারী নেই সেই এলাকার লোক যেন মহামারী আক্রান্ত এলাকায় না যায়’। গোটা দেশ শাটডাউন আতঙ্কে চাল-ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। লাভবান হচ্ছে এক ধরনের অসাধু চক্র। বিভিষীকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যে জাতির নৈতিক মানের কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বড়োই আফসোস তাদের জন্য।

সর্বত্র একটি আলোচনা ঘুরেফিরে আসছে যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে গোটা বিশ^বাসীর জন্য গজব। কিন্তু অন্যায়, অনাচার, মিথ্যা, ছলচাতুরি, ভন্ডামী, স্বার্থপরতা, জোচ্চুরি, মুনাফাখোরী, পরস্বহরণ, দুর্নীতি, দুরাচার, অশ্লীলতা, অনৈতিকতা, যুলুম-নির্যাতন, অপরের ক্ষতি করা, নির্লজ্জতা, গীবত, চোগলখোরী, পরনিন্দা, পরচর্চা, হিংসা-বিদ্বেষ কোনো কিছুই নৈতিকভাবে দুর্বল এ জাতি পরিত্যাগ করতে পারছে না। আজব চরিত্রের মানুষকে আল্লাহ দুনিয়াতে এজন্য কি পাঠিয়েছেন যে, তারা শুধু অন্যায় অনাচার করেই যাবে আর আল্লাহ শুধু দেখতেই থাকবেন? পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, আল্লাহ এক এক সময় গোটা দুনিয়াকে অথবা কোনো জাতি কিংবা কোনো জনপদকে প্রথমে সতর্ক করেন এবং সামান্য বিপদ দেয়ার পর বড়ো ধরনের ঝাকুনি দেন। মহামারী আক্রান্ত জনপদ আজ গোটা বিশ্ব।

সময়ের বিবর্তনে আমাদের নৈতিক মানের উন্নয়নের পরিবর্তে অবনতির পাল্লাই যেন আজ বেশী ভারী। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী ইতঃপূর্বে আল্লাহ বিভিন্ন জাতিকে প্রথমে অবকাশ দিয়েছেন, এমনকি সংশোধিত হওয়ার জন্য বার বার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু জাতিগুলো আল্লাহর বিধানের সাথে শুধু অন্যায় আচরণই করেছে। পরিণামফলে একেকটি জাতিসমূলে ধ্বংস হয়ে গেছে। গোটা পৃথিবীপৃষ্ঠ যেন আজ একটি অন্যায়ের ভাগার। বিশ্ব চরাচরের যিনি মালিক তার বিধানের সাথে বিদ্রোহকে এখানে আধুনিকতা নামে অভিহিত করা হয়। আল্লাহর দেওয়া বিধানকে বলা হয় অমানবিক এবং মধ্যযুগীয় আইন। অশ্লীলতার নাম শিল্প, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি। ধুর্তামি, চালাকি, শঠতার নাম দেওয়া হয় বুদ্ধিমত্তা। নির্মম নির্যাতন আর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার পর সোল্লাশে চিৎকার করে ঘোষণা দেওয়া হয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের। মানুষ মারার অস্ত্র তৈরীর পর পরাশক্তির জানান দেওয়া হয়। বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন ক্ষুধায় কাতরায় তখন উদ্বৃত্ত খাদ্য সমুদ্রে ফেলে দিয়ে কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখার কসরত করে অবারিত সম্পদ ও ভূমির মালিক রাস্ট্রগুলো। দরিদ্র মানুষগুলো যখন আরো দরিদ্র হচ্ছে তখন কিছু কিছু মানুষের সুইচ ব্যাংকের হিসাবের স্ফিতি দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ডাস্টবিনে যখন মানুষ-কুকুর খাবার ভাগাভাগি করে তখন বিলাসী জীবনের জানান দেয় একদল মানুষ। বসবাসযোগ্য একটি পৃথিবী সবার কাম্য, যেখানে থাকবে শান্তি, সুখ, সুবিচার, নৈতিক এবং মানবিক পরিবেশ। মানবতার জন্য কল্যাণময় একটি সুন্দর পৃথিবী একমাত্র- কেবলমাত্র স্রষ্টার দেখানো পথে চলার মাধ্যমেই তার প্রকৃত রূপ ফিরে পারে।

অন্যায়-আনাচার যুলুম, বাড়াবাড়ি এবং খোদাদ্রোহীতার ফলশ্রুতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব হিসেবেই করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি ব্যাপ্তি এবং আক্রমণ এটা নির্দিধায় বলা যায়। ইসলামী স্কলার এবং সুপণ্ডিতগণ এ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর সাহায্যের মূখাপেক্ষী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, পাপ পঙ্কিলতামুক্ত জীবন গঠন এবং আল্লাহতে সমর্পিত হওয়ার জন্য। মানুষ তার স্বীয় শক্তি, মেধা, যোগ্যতা এবং বস্তুগত উৎকর্ষতার বিনিময়ে আল্লাহর দেওয়া আজাব হতে মুক্তির পথ খূঁজছে। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিজস্ব একটি নিয়ম আছে; যে নিয়ম এবং বিধানে শুধুমাত্র বস্তুগত শক্তির দ্বারা সব কিছু মোকাবেলা করা যায় না। আল্লাহ যখন কোনো জাতির জন্য আজাবের ফায়সালা করেন তখন সে আজাবকে মানুষ কখনোই স্বীয় শক্তি দ্বারা প্রতিহত করতে সক্ষম হতে পারে না।

হ্যা আল্লাহর স্বীয় সুন্নাত হচ্ছে এই যে, আগুনে হাত দিলে হাত পুড়বে। বরফে হাত লাগালে ঠান্ডা অনুভুত হবে। ময়লাযুক্ত খাবার খেলে পেটের পীড়া দেখা দিবে। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে রক্তে কোলেস্টোরোলের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে হৃদরোগ দেখা দিবে। কিন্তু এর বাইরে আল্লাহ যখন বিকল্প কানো কিছু করার ইচ্ছা করেন, তখন এ নিয়মের বাইরে অনেক কিছু ঘটে। আগুন দাহ্য হবার পরেও ইবরাহীম আ.-এর জন্য আগুন শান্তিদায়ক শীতলতায় পরিণত হয়েছে। শানদার ছুড়ি ইসমাঈলের গলা কাটেনি। এটা আল্লাহর বিকল্প নির্দেশ। কিন্তু পৃথিবী পরিচালনায় আল্লাহর স্বাভাবিক সিস্টেম সবসময় চলমান।

করোনার আক্রমণ আল্লাহর একটি হুকুম মাত্র। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা যে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে, তা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এ নিয়মগুলো মেনে চলা আল্লাহর বিধান এবং রাসূলের সুন্নাহ বিরোধী তো নয়ই বরং ইসলামের অনুমোদিত পন্থার অধীন। যেমন রাসুল সা. এর সুন্নাহ হচ্ছে : পেটের তিনের এক অংশ খালি রেখে খাবার খাওয়া- এতে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। তিনি নিষেধ করেছেন, শরীরের অর্ধেক ছায়াদার গাছের নীচে এবং বাকী অর্ধেক রোদে না রাখতে- এতে শরীরের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। তবে শুধুমাত্র বাহ্যিক কার্যক্রমগুলোই সব কিছুর মানদণ্ড নয়। আল্লাহর অবাধ্যতা করলে আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি যেমন পরকালীন জীবনের অমোঘ বিধান। একইভাবে দুনিয়ার জীবনেও মাঝে মাঝে আল্লাহ শাস্তি দিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেন। অতীতে যে সকল জাতিগোষ্ঠীকে আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করেছেন তার কিয়দংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি : পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নিকৃষ্ট জাতি ছিলো লুত সম্প্রদায়। তারা আল্লাহর বিধান তো মানতোই না বরং সম লিঙ্গের বিয়েসহ নানান অপকর্মে এমনভাবে জড়িত ছিলো যে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের গোটা জাতিগোষ্ঠীর চিহ্ন পর্যন্ত মুছে দিলেন। পবিত্র কুরআনের সুরা আনকাবুতে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘‘যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লুতের কাছে আগমন করল, তখন তাদের কারণে তিনি বিষন্ন হয়ে পড়লেন এবং তার মন তাদের (রক্ষার) ব্যাপারে সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বলল, ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে এবং আপনার পরিবার বর্গকে রক্ষা করবই। আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের ওপর আকাশ থেকে আজাব নাজিল করব তাদের পাপাচারের কারণে। আমি (আল্লাহ) তাতে বুদ্ধিমান স¤প্রদায়ের জন্যে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি।’’ (আল কুরআন ২৯ : ৩৩-৩৫)

প্রচণ্ড ধুলি এবং পাথর ঝড় তাদের গোটা সম্প্রদায় এবং জনপদকে এমনভাবে নাস্তানাবুদ করলো যে, তাদের কোনো চিহ্ন আর রইলো না। যা বর্তমানে মৃত সাগরের কাছে অবস্থিত রয়েছে। ভৌগলিকরা দেখতে পেয়েছেন, অঞ্চলটি প্রচুর পরিমাণে গন্ধকে ভর্তি। ফলে সমগ্র অঞ্চলটিতে প্রাণী বা উদ্ভিদ কোনো ধরনের জীবনের অস্তিত্ব নেই। পুরো এলাকা সর্বাঙ্গীন ধ্বংসের একটি নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে এটি সকল যুগের মানুষের জন্য আল্লাহর অবাধ্যতার ফলস্বরূপ শাস্তির একটি নিদর্শন বিস্তির্ণ এ জনপদ।

সামূদ জাতি সম্পর্কে আল্লাহ সূরা হিজরে বলেন, ‘‘আপনার প্রাণের কসম (হে নবী,) নিশ্চয় তারা আপন নেশায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অতঃপর সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে একটি বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করলো। অতঃপর আমি তাদের জনপদগুলিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর বষর্ণ করলাম পোড়ামাটির পাথর। নিশ্চয় এতে পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। আর নিশ্চয় তা রাজপথের পাশেই বিদ্যমান। নিশ্চয় এতে ঈমানদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’’ (আল কুরআন ১৫ : ৭২-৭৭)

আইকা বাসীরা ছিলো বিশ্বের অন্যতম নিপুন কৌশুলী সম্প্রদায়। স্থাপত্য বিদ্যায় তারা ছিলো খুবই পারদর্শী। কিন্তু আল্লাহর সীমা লঙ্ঘনের ফলে আল্লাহ এ জাতিকে ধ্বংস করে দেন। তাদের সম্পর্কে সূরা আরাফে বলা হয়েছে : ‘‘অতঃপর ভূমিকম্প তাদের (অসতর্ক অবস্থায়) পাকড়াও করল। তারপর তারা তাদের গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। সেসব লোক যারা শুয়াইব আলাইহিস সালাম-কে মিথ্যাবাদী বলেছিলো, মনে হয় যেন তারা সেখানে বসবাসই করেনি। যারা শুয়াইবকে মিথ্যাবাদী বলেছিলো তারাই ছিলো ক্ষতিগ্রস্থ।’’ (আল কুরআন ০৭ : ৯১-৯২)

ধ্বংসপ্রাপ্ত সে শহরটি প্রায় তেতাল্লিশ শত বছরের প্রাচীন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় এ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ ছাপে। এতে প্রাচীন শহর ‘মলবা’ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। যা ১৯৭৩ সনে সিরিয়ায় খননকার্যের মাধ্যম আবিস্কৃত হয়। ম্যাগাজিনটি আরও লিখেছে, শহরটিতে একটি লাইব্রেরি ছিলো। তাতে পাশ্ববর্তী শহরগুলির একটি তালিকা ছিলো, যাদের সঙ্গে ‘এলবার’ অধিবাসীরা বাণিজ্য করত। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সেই শহরগুলির তালিকায় ‘ইরাম’ নামক একটি শহরের নামও লিপিবদ্ধ ছিলো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি শহর সম্পর্কে তার সাথীদেরকে বলে গিয়েছেন। এভাবে আল্লাহ কোনো জাতিকে পঙ্গপাল দিয়ে শাস্তি দিয়েছেন, কোনো জাতিকে ব্যাঙ দিয়ে শাস্তি দিয়েছেন, কাউকে সামান্য মশা অথবা ক্ষুদ্র পাখি দ্বারা শাস্তির মাধ্যমে নিশ্চি‎হ্ন করে দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা অতীতের জাতিগোষ্ঠীকে যেভাবে সমূলে ধ্বংস করেছেন, মুহাম্মাদ সা.-এর উম্মাতদেরকে এভাবে সমূলে ধ্বংস করবেন না। যা শেষ নবীর দোয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত। মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। হে আল্লাহ অতীতের জাতিগোষ্ঠীকে যেভাবে ধ্বংস করেছো, তুমি আমার উম্মাতকে সেভাবে ধ্বংস করো না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় রাসূলের এ দোয়া কবুল করেছিলেন। তাঁর দোয়ার বদৌলতে হয়তো আল্লাহ আমাদের সমূলে বিনাষ করবেন না। কিন্তু করোনা-ইবোলা এবং প্লেগের মতো রোগ দিয়ে শায়েস্তা করবেন না, এমন কথা হাদীসে নেই। আল্লাহর বাহিনী হিসেবে গোটা দুনিয়ার সব কিছু কাজ করছে। যখন যেটাকে আল্লাহ হুকুম করবেন, সেটাই বিশাল বাহিনী হিসেবে ভুমিকা পালন করবে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল ফাতহে আল্লাহ বলেন, ‘ আসমান ও যমীনের সকল বাহিনী আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন। তিনি মহাজ্ঞানী ও কৌশলী। হে নবী আমি আপনাকে সু-সংবাদদাতা, সাক্ষ্যদাতা এবং ভীতি প্রদর্শণকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি’ ( আল কুরআন ৪৮ : ৭-৮)

উপযুক্ত আয়াত দুটিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজ রয়েছে। এক. আসমান ও যমীনের মাঝে যা আছে, তা সব আল্লাহর বাহিনী এবং তার কতর্তৃত্বাধীন। এ বাহিনীগুলোকে যখন যেভাবে ইচ্ছা আল্লাহ ব্যবহার করেন। দুই. মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য সু-সংবাদদাতা অপরদিকে ভয় প্রদর্শনকারী। সু-সংবাদ হচ্ছে আল্লাহর বিধান মানলে দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখিরাতের কল্যাণ। ভয় প্রদর্শনকারী বলতে বোঝায় দুনিয়ার জীবনের অশান্তি ও আজাব ও গজব একইভাবে আখিরাতে অনন্তকালের শাস্তি। যারা আল্লাহর নির্দেশ ও বিধান মোতাবেক জীবন যাপন করবে তাদের জন্য কল্যাণ, যারা অমান্য করবে তাদের জন্য অকল্যাণ। আল্লাহর বাহিনীসমূহের একটি হচ্ছে ‘করোনা’ যা মানুষ খালি চোখে দেখতে পায় না। কিন্তু না দেখা এ বস্তুটি গোটা দুনিয়ার মানুষকে ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। আল্লাহ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তার বাহিনীকে দুনিয়াতে হুকুম দিয়েছেন। আর তাঁর বাহিনী সাথে সাথে কাজে নেমে পড়েছে। আল্লাহ কিভাবে তার বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন তার বর্ণনা কুরআনের পাতায় বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন : ‘‘তোমার ‘রবের’ সেনাদল বা সেনাবাহিনী ( কত প্রকৃতির বা কত রূপের কিংবা কত ধরনের ) তা শুধু তিনিই জানেন’’ (সূরা মুদ্দাসসির-৩১)

পৃথিবীর প্রতিটি অণু পরমাণুর ওপর আল্লাহর একক নিয়ন্ত্রণ। আল্লাহর সৃষ্টিরাজির ওপর মানুষ কেবল ততক্ষণ কর্তৃত্ব করতে পারে যতক্ষণ আল্লাহ অনুমোদন দিবেন। তিনি তার সৃষ্ট বস্তুনিচয়কে মানুষের কল্যাণের যেমন নির্দেশ দেয়ার একক ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন একইভাবে তিনি এ সকল সৃষ্টিরাজীকে মানুষের বিরুদ্ধে তাদের ধ্বংস এবং ক্ষতির জন্যও নির্দেশ দিতে পারেন। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা : নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর উপর (অর্থাৎ আরশ, পঙ্গপাল কিংবা ভাইরাস) সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান, সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন । (সূরা বাকারা : ১৪৮)

আমাদের দেশের কিছু কিছু লোক খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে এই আশঙ্কায় বেশী বেশী খাদ্যদ্রব্য কিনে মজুদ করছে। সকল নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজারে এক ধরনের কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ ভুলে গেছে, যে আল্লাহ রিজিকের মালিক, তিনি ইচ্ছা করলেই কেবল এ সংকট থেকে উদ্ধার করতে পারেন। তিনি না চাইলে শত প্রচেষ্টা এবং মওজুদ করার পরও খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে : ‘‘তারপর আমি ফেরাউনের অনুসারীদেরকে কয়েক বছর পর্যন্ত দুর্ভিক্ষে রেখেছিলাম এবং অজন্ম ও ফসলহানি দ্বারা বিপন্ন করেছিলাম। (সংকটাপন্ন এবং বিপদগ্রস্থ অবস্থায় রেখেছিলাম ) উদ্দেশ্য ছিলো, তারা হয়তো আমার পথ-নির্দেশ গ্রহণ করবে এবং আমার প্রতি বিশ্বাস আনয়ন করবে। ( সূরা আরাফ : ১৩০) আল্লাহর এ ঘোষণার মূল বক্তব্য হচ্ছে, বিপদ, মুসিবত, দুর্ভিক্ষ সকল কিছু থেকে একমাত্র আল্লাহর কাছেই পানাহ চাইতে হবে। তার কাছেই আত্মসমর্পন করতে হবে। তার বিধানের আলোকে গোটা জীবন সাজাতে হবে। আল্লাহ না চাইলে কোনো বিপদ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। সকল মত, চিন্তা, বিভ্রান্তি পরিত্যাগ করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনের মাধ্যমে আমরা মুক্তির পথ খুঁজতে পারি। তার বিধানের সাথে বিরূপ আচরণ করে যত প্রটেকশন গ্রহণ করা হোক না কেন, তার ফল কল্যাণদায়ক হবে না। আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনের পর নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আল্লাহ তার করুণারাশি বর্ষন করবেন।

পৃথিবী আজ নির্মম নির্যাতনের বেলাভূমি। নির্যাতিত অসহায় মানুষের আর্তনাদে আল্লাহর আরশ কাপলেও জালেমদের হৃদয়ে তার দাগ কাটে না। গৃহহীন মানুষগুলোর ফরিয়াদে আকাশ-বাতাস ভারী হচ্ছে, কিন্তু জুলুমতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা বন্ধ হচ্ছে না। মানুষ আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে যখন পৃথিবীকে নিজেদের ক্ষমতা চর্চার মঞ্চ বানায় তখন আল্লাহ জালিমদের শায়েস্তা করার জন্য এ ধরনের গজব পাঠান। সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ বলেন, ‘‘এখন এ জালেমরা যা কিছু করছে আল্লাহকে তোমরা তা থেকে গাফেল মনে করো না। আল্লাহ তো জালেমদের সময় দিচ্ছেন’’ (আল কুরআন-১৪ : ৪২) কিন্তু আল্লাহর বিধান হচ্ছে, আল্লাহ জালেমদের চিরস্থায়ী সময় দেন না। নির্যাতিত জনতার আর্তনাদে পৃথিবীর অপরাপর মানুষগুলো এগিয়ে না এলে আল্লাহ যখন গযবের ফায়সালা করেন, তখন দোষী-নির্দোষ সবাই এ গজবে আক্রান্ত হয়।

যারা দুনিয়াকে অপরাধের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছে, তাদের ভাবনায় এটাই সব সময় স্থান পায় যে কেউ তাদের নাগাল পাবে না। তাদের সম্পর্কে সূরা নাহলে আল্লাহ বলেন, ‘‘যারা কুচক্র বা কু’কর্ম করে বা বিভিন্ন ধরণের অপরাধ, অবিচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা কি চিন্তামুক্ত হয়ে গিয়েছে যে আল্লাহ তাদেরকে সমূলে বিনাশ করে দিবেন না কিংবা তাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিবেন না? কিংবা তাদের উপর এমন সব দিক থেকে বিপদ বা শাস্তি এনে হাজির করানো হবে না, যে দিকগুলোর বিষয়ে এর আগে কোনো ধারণাই তাদের নেই ’’ (আল কুরআন-১৬ : ৪৫)

পৃথিবীর মাটি আজ মানুষের জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। জীবন যেন এখানে এক দুঃসহ যাতনার নাম। মানুষ বাঁচার জন্য লড়াই করছে প্রানান্তকরভাবে। মানুষের খালি চোখে না দেখা ভাইরাস দিয়ে আল্লাহ বিশ^বাসীকে একটি ঝাকুনি দিয়েছেন। বস্তুগত এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ ইসলামী বিধানের বিপরীত নয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘‘আমি তোমাদের রোগ দিয়েছি এবং তার শেফাও দিয়েছি’’। চিকিৎসা পদ্ধতি অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, তবে বিশ্বাস এবং আস্থা রাখতে হবে কেবলমাত্র আল্লাহর ওপর। আল্লাহর এই শাস্তি হতে বাঁচার জন্য অতীত পাপ কর্মের জন্য তারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে, তারই কাছে সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহ বিশ্বাবাসীকে এই গজব থেকে হেফাযত করুন। পৃথিবীর মাটি হোক সবার জন্য উম্মুক্ত। আকাশের উদারতা, সমুদ্রের বিশালতা সবার জন্য উম্মুক্ত অবারিত হোক; মহান রবের কাছে এ প্রত্যাশা।

(মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান)
Hafizurrahmanbd1978@gmail.com

২২.০৩.২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *