সোমবার ১৫, অগাস্ট ২০২২
EN

ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙ্গালীর ইতিহাস: ৬৬ বছরের মাথায় সেই ইতিহাস কতটা অম্লান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গঠন করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন 'বাংলাদেশ ছাত্রলীগ'। তিনি ছাত্রলীগ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙ্গালীর ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস’। সেই বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগের ইতিহাস বর্তমানে এক লজ্জাজনক ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।

[b]ঢাকা: [/b]বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গঠন করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন 'বাংলাদেশ ছাত্রলীগ'। তিনি ছাত্রলীগ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙ্গালীর ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস’। সেই বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগের ইতিহাস বর্তমানে এক লজ্জাজনক ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। যে ছাত্রলীগ নিয়ে জাতির হৃদয়ে আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও গৌরবের প্রকাশ ঘটত সেই ছাত্রলীগ জাতির জন্য আতঙ্ক, ভয়, রাহাজানির প্রতিচ্ছবি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রলীগ কখনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে আবার কখনোবা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে একের পর এক কলঙ্কজনক ঘটনার জন্ম দিতে থাকে। শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি ছাত্রলীগের মূলনীতি হলেও বর্তমানে সংগঠনটির অনেক সদস্য নিজেদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা, মারামারি, চাদাঁবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবির-বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, কমিটি-বাণিজ্যের মতো নানা বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি। ছাত্রলীগের (বর্তমান কমিটির মেয়াদে) সাম্প্রতিক কর্মকান্ড খোদ সরকারের হাইকমান্ডকেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে মহাজোট সরকারের সব অর্জন ‘বিসর্জনের মিশনে’ নামা ছাত্রলীগ নামধারী এরা কারা? কেন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা বলেন, আগে কমিটিতে আসতো যোগ্যরাই। আর এখন ‘পকেট কমিটি’র ফলে বাড়ছে অস্থিরতা। ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখার দাবিও জানিয়েছেন তারা। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাজোট সরকার ক্ষমতালাভের পর ওই বছরেরই ১৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান নোমানীকে হত্যার মধ্যে দিয়ে ছাত্রলীগ হত্যার যে রাজনীতি শুরু করে তা যেন চরম আকার ধারণ করে সাম্প্রতিককালে বহুল আলোচিত হল বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে। অবশ্য বিশ্বজিতের হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মধ্যদিয়ে সরকার গণমানুষের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করে। তবে, বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার রায় কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে এখনো অনেকের মধ্যেই সন্দেহ রয়ে গেছে, যেভাবে একের পর এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমা লাভে সক্ষম হচ্ছেন সেই বাস্তবতায়। ঐতিহ্যবাহিত সংগঠন ছাত্রলীগ যখন গৌরব, ঐতিহ্য আর সংগ্রামের ৬৬ বছর পূর্তি পালন করছে তখন সাম্প্রতিক যেসব ঘটনায় জনমনে সংগঠনটি সম্পর্কে বিরুপ ধারনা সৃষ্টি হয়েছে তার কিছুটা টাইম নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো: [b]বিশ্বজিৎ হত্যা:[/b] ছাত্রলীগের এক কলঙ্কের নাম বিশ্বজিৎ হত্যা। প্রকাশ্যে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে হতবাক পুরো দেশের মানুষ। গত ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলীয় জোটের রাজপথ অবরোধ কর্মসূচিতে দর্জি কর্মী বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মীরা। ঐদিন রাতেই হত্যাকারী শাকিল ওরফে চাপাতি শাকিল, নাহিদ, লিমন, সোহেল, এমদাদ, রাজন প্রমুখ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এফ এম শরিফুল ইসলামের জন্মদিন ঘটা করে পালন করে। জানা যায় তারা সবাই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের খুব কাছের কর্মী। কিন্তু এ ঘটনার পরও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা না করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। [b]আলোচিত আরো কয়েকটি হত্যাকাণ্ড:[/b] ছাত্রলীগের নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ও প্রতিপক্ষ গ্রুপের সাথে সংঘর্ষে হারিয়েছে অনেক ছাত্রের জীবন। নিজেদের অভ্যান্তরীণ সংঘাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ওরফে রাজীবকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে নিহত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবূ বকর। গরীব বাবা-মায়ের এই মেধাবী সন্তান হত্যার বিচার আজও হয়নি। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা নিজ দলের কর্মী জুবায়ের আহমেদ নিহত হয়। নিজেদের অভ্যান্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগের আরেক কর্মী নসরুল্লাহ নাসিমকে ২ তলা থেকে ফেলে দেওয়া হলে তার হাসপাতালে মৃত্যু ঘটে। সর্বশেষ পদ্মাসেতুর চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের অভ্যান্তরীণ কোন্দলে প্রাণ দিতে হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহেল রাণাকে। রাজশাহী পলিটেকনিক ইনিষ্টিটিউটে ছাত্রলীগের হাতে মারা যায় রেজওয়ানুল ইসলাম চৌধুরী সানি। চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের সাথে শিবিরের সংঘর্ষে মারা যায় মুজাহিদুল ইসলাম ও মাসুদ বিন হাবিব। এছাড়াও ছাত্রলীগের হাতে আরো নিহত হয় আসাদুজ্জামান আসাদ, মহিউদ্দিন মাসুম, হারুন অর রশীদ কায়সার ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের আবিদুর রহমান আবিদ। যশোরে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে নিহত হয় জেলা সদরের ছাত্রলীগের আহ্বায়ক রিপন হোসেন দাদা। এর কয়েকদিন পর নড়াইলের আমিরুল ইসলাম অপু, দিনাজপুর হাজি দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহফুজ বিপ্লব ও মৃণাল, কুমিল্লা পলিটেকনিকের সোহেল আহমদ, গাজিপুরের সাজিদুর মোনায়েম রানা, ঢাকা পলিটেকনিকের রাইসুল ইসলাম রাহিদ, পাবনা টেক্সটাইল কলেজের মোস্তফা কামাল শান্ত, ঢাকার শ্যামপুরের কিশোর সানি নিহত হয়। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সংঘর্ষে নিহত হয় ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ মিয়া। কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ছাত্রলীগের বিবাদমান দু’পক্ষের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ছাত্রলীগের উপজেলা সাংস্কৃতিক সম্পাদক বাহাদুর রহমান মারা যায়। ছাত্রলীগের বেপরোয়া রাজনীতির কারণেই নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুন করা হয় উদয় সিংহ পলাশকে। মদন মোহন কলেজে ছাত্রদল-ছাত্রলীগের দু পক্ষের সংঘর্ষের জের ধরে খুন হয় মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী শিহাব। [b]শিক্ষকদের ওপর হামলা:[/b] শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। অথচ তাদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। এতে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগের সুনাম নষ্ট হয়েছে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের একদল কর্মী হামলা চালিয়েছে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে ক্যাম্পাস পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন শিক্ষক সমিতির শিক্ষকরা। এ সময় হঠাৎ করে ছাত্রলীগের জাপান, ইলিয়াস, টিটু, সজিব, শামীম ও দিলুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী সেখানে হামলা চালায়। এ সময় তারা বাইরে থেকে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে এবং অনুষদ ভবনের বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর চালায়। এদিকে, অনুষদ ভবনের বাইরে ছাত্রলীগের কর্মী জনির নেতৃত্বে আরেকটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে থাকা ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে শিক্ষকদের কক্ষের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আক্তারুল ইসলাম জিল্লু ঘটনাস্থলে এসে তাদের বুঝিয়ে শান্ত করেন। পরে ছাত্রলীগ কর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বের করে দিয়ে গেটে তালা লাগিয়ে দেন তিনি। ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলা থেকে রেহাই পায়নি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত। গত ২৯ ডিসেম্বর (২০১৩) বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮দলীয় জোটের ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াতপন্থী সাদাদলের শিক্ষকদের ওপর শসস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের অন্তত ১০ শিক্ষক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন শিক্ষিকারা। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এমনকি! দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশও ছাত্রলীগের মারপিঠ থেকে রেহাই পায়নি। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফছার আলীর কক্ষে প্রবেশ করে তাকে হাতুরী দিয়ে আঘাত করে তাকে মারাত্নক যখম করে ছাত্রলীগ। এতে তার কয়েকটি দাঁতও পড়ে যায়। [b]অভ্যন্তরীণ কোন্দল:[/b] কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি ইউনিটই বিশেষ করে দুটি গ্রুপে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সভাপতির গ্রুপ, অপরটি হচ্ছে সেক্রেটারির গ্রুপ। আধিপত্য বিস্তার করতেই ও নিজেদের দল ভারী করতে অনেক সময় সদস্য সংগ্রহ করেন নেতারা। জড়িয়ে পড়ছেন সশস্ত্র কোন্দলে। এদিকে ছাত্রলীগের অপকর্মে শুধু বিরোধী দলই নয়, খোদ সরকারী দলের পক্ষ থেকেও এখন বলা হচ্ছে সরকারের সকল অর্জনকে ধ্বংস করতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। ছাত্রলীগকে নিয়ে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সরকারকে ডুবাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ছাত্রলীগ একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে। এতে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ম্লান হচ্ছে। এ ব্যাপারে এখনই প্রধানমন্ত্রী কোনো উদ্যোগ না নিলে পরবর্তীতে ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এস এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, সংগঠন বিরোধী কাজ যারা করছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। এক্ষেত্রে আমাদের কোনো ছাড় নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে 'শস্যের মধ্যেই যদি ভুত থাকে, তাহলে কে ছাড়াবে এই ভুত'। [b]সাধারণ ছাত্র ও সাংবাদিকের ওপর হামলা:[/b] কোন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়েও ছাত্রলীগের হাত থেকে রেহাই পায়নি অনেকেই। জাহাঙ্গীরনগর, বুয়েট, কুয়েট, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাংস্কৃতিক জোটের কর্মীরা বিক্ষোভ করলে তাদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। শুধু হাই নয়, সাংবাদিকরাও রেহাই পায়নি হামলা থেকে। ঢাবি, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন কর্মরত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা। সাম্প্রতিক সময়ে আমার দেশ পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক ইয়ামিনকে কার্জন হলের সামনে মারপিট করে ছাত্রলীগের কর্মীরা। [b]পুলিশের ওপর হামলা: [/b] আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ওপরও একাধিকবার হামলা চালায় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানা চত্বরে পুলিশ কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আসাদকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে ছাত্রলীগ। মাদারীপুরে অনুষ্ঠানরত বাণিজ্য মেলায় স্টেডিয়ামে পুলিশ কনস্টেবল সোহেল, বাসার ও হাবিলদার ওলিউল্লাহকে পিটিয়ে আহত করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। ফুলবাড়ী থানার এসআই আমির হোসেন ছাত্রলীগ কর্মীদের রামদার কোপে মারাত্নকভাবে আহত হন। [b]ধর্ষণ:[/b] শুধূ হত্যা নয় ধর্ষণের ঘটনাও ঘটিয়েছে একাধিক ছাত্রলীগের কর্মীরা। ময়মনসিংহের গৌরিপুরে ছাত্রলীগ নেতা কতৃক ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। রংপুরের বদরগঞ্জে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এক গৃহবধূ গণ ধর্ষনের শিকার হয়েছে। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক কতৃক এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে ও ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুরে এক স্কুল ছাত্রী ছাত্রলীগ ক্যাডার আহসান কবীর মামুন কতৃক ধর্ষিতা হয়েছে। ধর্ষন কালিন ভিডিও সিডি করে বাজারজাত করা হয়েছে। পিরোজপুরে বিলুপ্ত হওয়া ছাত্রলীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক তানভির মুজিব অভি তার কথিত প্রেমিকের ন্যূড ছবি পিরোজপুরের সর্বত্র ছড়িয়ে পরেছে। সাতক্ষীরা জেলায় ছাত্রলীগের ৬৪ তম জন্ম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা পলাশের গণধর্ষণের শিকার হয়েছে খুলনার এক নৃত্যশিল্পী। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় পূজা মন্ডপ থেকে ফেরার পথে এক কিশোরীকে অপহরণ করে ছাত্রলীগের ১০ কর্মী পালা করে ধর্ষণ করেছে। ঝিনাইদহ শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে গণধর্ষণ করেছে ছাত্রলীগের চার ক্যাডার, সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর ডিগ্রী কলেজের ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে ছাত্রলীগ কর্মী আনোয়ার হোসেন খোকন। ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনষ্টিটিউটের এক ছাত্রীকে দিনে দুপুরে ধর্ষণ করেছে ছাত্রলীগের দুই কর্মী। সিলেট পলিটেকনিকে ছাত্রলীগ নেতা সৈকত শ্রেণীকক্ষে এক ছাত্রীকে জোর পূর্বক ধর্ষণ করে। [b]মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর:[/b] ছাত্রলীগের তান্ডব থেকে রেহাই পায়নি সংখ্যালঘু হিন্দুদের পবিত্র মন্দিরও। দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের অনেক মন্দির ভাঙচুরের সঙ্গেই ছাত্রলীগের জড়িত থাকার থাকার খবর ছাপা হয়েছে গণমাধ্যমে।   উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, গত অক্টোবরে ময়মনসিংহ শহরে মন্দির ও হিন্দু বাসাবাড়িতে হামলা ভাঙচুর চালায় ছাত্রলীগ। পরে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ রাত সাড়ে ৯টায় ময়মনসিংহ টির্চাস ট্রেনিং কলেজের সাবেক জিএস ও শহর ছাত্রলীগ নেতা কল্যাণ টিটুকে আটক করে। ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মঈনুল হক মাইকে টিটুকে আটক ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘোষণা দিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের অনুরোধ জানালে রাত সোয়া ১০টায় শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন।[b] চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদকাসক্তি:[/b] দেশের প্রায় সব বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শহরে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগ। চাঁদা না দেয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ও দোকান বন্ধ করে দেয়া হয়। রাজধানীর শিক্ষাভবন, গণপূর্ত ভবন, খাদ্য ভবন থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নেয় ছাত্রলীগ। নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি নিয়ে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষও হয়েছে। চাঁদা দিতে দেরি বা অপারগতা প্রকাশ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন জেলা শহরের বড় বাজেটের উন্নয়ন কাজ বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া বিভিন্ন মার্কেট ও উৎসব থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্যে ৭০-৮০টি কলেজের উন্নয়ন অনিশ্চিত হয়ে যায়। ৬৫৫ কোটি ১২ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাগিয়ে নেয় ছাত্রলীগ। এসব অপকর্মে ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে পাতি নেতারাও জড়িয়ে পড়েন। নাটোরে চাঁদাবাজির সময় জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকুজ্জামান আশরাফি ও ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী প্রিন্স চাঁদার টাকা নেয়ার সময় তাকে ও এক কর্মীকে হাতে নাতে আটক করে পুলিশ। সাতক্ষীরা তালা উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মুন্নাফ হোসেন শিম্পুকে ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চাঁদাবাজি-ছিনতাইসহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। ছাত্রলীগ থেকে রেহাই পায়নি হোটেল, বাস শ্রমিক, কর্মচারীরাও জবি ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম শ্রাবণ গ্রুপের কর্মীরা। ফাও খাবার পরিবেশন না করায় ক্যান্টিন ম্যানেজার আলতাফ হোসেনকে মারধর করে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রমেক) এ চাকুরীর কোটা নিয়ে ছাত্রলীগ ও কর্মচারীদের মধ্যে সংঘর্ষে হয়। [b]ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্য:[/b] গত ৫ বছরে বিভিন্ন মেডিক্যাল,বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তি এবং নিয়োগ বাণিজ্য হয় রমরমা। বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মেডিক্যালে ভর্তি এবং চাকরি দেয়ার নামে শত শত কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে ছাত্রলীগ। একেকজন প্রার্থীর কাছ থেকে এজন্য ১ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। অনার্স ভর্তিতে বড় বড় অনার্স কলেজে প্রশাসনকে জিম্মী করে ছাত্রলীগ কোটার নামে হাজার হাজার ছাত্র ভর্তি করা হয়। ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। রাজধানীতে ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, তিতুমীর কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, খুলনা কমার্স কলেজ, বিএল কলেজ, রাজশাহী সিটি কলেজ, মহিলা নিউ গভ.ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী কলেজ, বরিশালের বিএম কলেজ, সিটি কলেজ, চট্টগ্রামের সিটি কলেজ ও মুহসীন কলেজে ভর্তি বাণিজ্য ছিল আলোচিত। ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন ছাত্রলীগের পাতি নেতা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পর্যন্ত। ছাত্রলীগের এসব কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের অভিবাবকত্ব ত্যাগ করেছেন। কর্মকান্ডের সমালোচনায় সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি বর্তমান যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ অনেক আওয়ামী লীগ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রলীগও নিরাপদ নয়। এমতাবস্থায় শুধু অভিভাকত্ব ত্যাগ আর ক্ষোভের মধ্য দিয়েই ছাত্রলীগের এই অসামাজিক কার্যক্রম রহিত হওয়া সম্ভব নয়। এসব অপরাধ গুলোর সাথে যে বা যারা জড়িত তাদের যদি বিচারের মুখোমুখি দাড় করানো যায়, তাহলেই ছাত্রলীগের সকল অপকর্ম দমন করা সম্ভব। কিন্তু তাদেরকে যদি আড়ালেই রাখা হয় তাহলে এ ছাত্র রাজনীতি গোটা জাতির জন্য অভিশাপের। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বাংলার মা মাটি দেশের রক্ষাকবচ হয়ে, সোনার বাংলার সোনার ছেলে উপহার দিতে। সুতরাং আজকের ছাত্রলীগের ৬৬ বছর পেরিয়ে তার বার্ধক্য বয়সে উপনীত। বার্ধক্য বয়সে নতুন কোন গ্লানি, বিব্রতকর কর্মকান্ড না করে ছাত্রদের কল্যাণে কাজ করে প্রমাণ করতে হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্রলীগকে নিয়ে যে উক্তি ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙ্গালীর ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস’ তার যথার্থ যৌক্তিকতা ও তার উক্তির বাস্তবায়নে ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতা কর্মীর সদা তৎপর সেটাই ছাত্রলীগের কাছে প্রত্যাশা সবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *