সোমবার ১৭, জানুয়ারী ২০২২
EN

ডাক্তার নয়, ফিরেছে লাশ হয়ে

প্রতি মাসে হোস্টেল খরচসহ সব খরচও দিযেছি। কোনো অভাব রাখিনি। মিথিও চেয়েছিল নিজে বড় ডাক্তার হবে। কিন্তু হঠাৎ স্বপ্ন ভাঙ্গলো। জানলাম মেয়ে খুন হয়েছে। আমার মেয়ে ডাক্তার হয়ে নয় ফিরেছে লাশ হয়ে। এই দৃশ্য কোনো বাবা-মা সহ্য করতে পারে না।'

'মেয়ে বড় ডাক্তার হবে সে স্বপ্ন নিয়ে মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার জন্য ঢাকা পাঠিয়েছিলাম। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করবে আদরের মেয়ে। প্রতি মাসে হোস্টেল খরচসহ সব খরচও দিযেছি। কোনো অভাব রাখিনি। মিথিও চেয়েছিল নিজে ডাক্তার হবে। কিন্তু হঠাৎ স্বপ্ন ভাঙ্গলো। জানলাম মেয়ে খুন হয়েছে। আমার মেয়ে ডাক্তার হয়ে নয় ফিরেছে লাশ হয়ে। এই দৃশ্য কোনো বাবা-মা সহ্য করতে পারে না।' কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার রায়েরবাজারের সচিবের গলিতে একটি বাসায় প্রেমিকের হাতে নিহত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ছাত্রী সাউদিয়া আক্তার মিথির (২৩) পিতা আবদুস সালাম। তিনি বলেন, আমি চাই যে যুবক আমার সহজ-সরল মেয়েকে ভুলিয়ে সংসার পাতানোর প্রলোভন দেখিয়ে হত্যা করেছে তার যেন ফাঁসি হয়। এ ধরণের অপরাধের শাস্তি দেখে যেন অপরাধীরা অনুতপ্ত হয়। গত বুধবার রাজধানীর হাজারীবাগ রায়েরবাজারের ৩/৫ নম্বর সচিবের গলির বাসার ষষ্ঠতলার একটি কক্ষ থেকে সাউদিয়া আক্তার মিথির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মিথি জেডএইচ শিকদার উইমেন মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তো। এক পর্যায়ে মিথি আরিফুল ইসলাম নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ধুর্ত আরিফ ব্লাকমেইলের ফাঁদে ফেলে মিথিকে লিভটুগেদার করতে বাধ্য করে। মাস তিনেক ধরে ভাড়া করা সাবলেট বাসায় লিভটুগেদার করে আসছিল তারা। অন্তকলহের জেরে প্রতারক প্রেমিক আরিফ বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে মিথিকে। হাজারীবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী মাইনুল ইসলাম টাইম নিউজবিডিকে জানান, মিথির পিতা আব্দুস সালামের দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় মিথির হত্যাকারী হিসেবে আরিফ নামে ওই যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে আরিফ। মিথিকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে সে সম্পর্কে আদালতে বিস্তারিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আরিফ। পরে আরিফকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার মোবাইলফোনে কথা হয় নিহত মিথির পিতা আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে টাইমনিউজবিডিকে জানান, আমার তিন ছেলে ৫ মেয়ের মধ্যে মিথি দ্বিতীয়। আমার স্ত্রী আকলিমা খাতুন পাবনা সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র নার্স। আমি নিজেও ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারি হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত। মিথি সবার মধ্যে বেশি মেধাবী হওয়ায় স্বভাবতই চেয়েছিলাম ডাক্তার বানাবো। মিথিরও ইচ্ছা ছিল। তবে চেষ্টা করেও সরকারি মেডিকেল কলেজে চান্স পেতে ব্যর্থ হয় মিথি। কিন্তু দমে যায়নি। মিথি আমাকে বলেছিল ডাক্তার সে হবেই। সে কারণেই মূলত জেডএইচ শিকদার উইমেন মেডিকেল কলেজে( বেরসকারি) ভর্তি করে দেয়া। কিন্তু কে জানতো আমার মেয়ে ডাক্তার না হতেই এভাবে হত্যার শিকার হবে। হত্যাকারীর ফাঁসি হলে তিনি মানসিকভাবে একটু হলেও স্বস্তি পাবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। [b]যেভাবে আরিফের সাথে মিথির পরিচয়[/b] পুলিশ ও মিথির স্বজন সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল ফোনে ভুল নাম্বারে ডায়াল করতে গিয়ে আরিফের সাথে পরিচয়। শুরু হয় ফোনালাপ। পাবনা জেলার পাশাপাশি দু’টি উপজেলায় বাড়ি তাদের। জীবনের রঙ্গিণ স্বপ্নে বিভোর হয়ে মিথি আরিফের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তিতে শারীরিক সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে আর বিবাহের মিথ্যা প্রলোভনে মিথিকে ব্লাকমেইল করে আরিফ। এরপর স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে হাজারীবাগ রায়েরবাজারের ৩/৫ নম্বর সচিবের গলির বাসার ষষ্ঠতলার একটি কক্ষ সাবলেট হিসেবে ভাড়া নেয় তারা। [b]যে কারণে হত্যা করা হয় মিথিকে[/b] ভালো সম্পর্কই যাচ্ছিল তাদের। মিথি বাড়ি থেকে টাকা আনে দু‘জন মিলে তা দিয়ে চলে। আরিফ নিজের শিক্ষাগতযোগ্যতা আর বেকারত্বের কথা কৌশলে আড়াল করে রেখেছিল। সে যে মাদকাসক্ত সে কথাও বলেনি কখনও। কিন্তু আরিফের কৌশল বুঝতে পারেনি মিথি। আরিফ নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে বলে মিথির কাছে পরিচয় দেয়। মিথি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে, আরিফ একজন প্রতারক, বেকার ও মাদকাসক্ত। মিথি আরিফের সঙ্গে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করলে এক পর্যায়ে আরিফের আসল চরিত্র মিথির সামনে পরিষ্কার হতে থাকে। বেকার আরিফ এসএসসি পাস সাধারণ ছেলে তা-ও জেনে যায় মিথি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে শুরু হয় অন্তকলহ, তা থেকে মনোমালিন্য। একসময় তা কঠিন পর্যায়ে চলে যায়। এরই চূড়ান্ত বলি হতে হয় মিথিকে। [b]হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে আরিফের জবানবন্দি[/b] প্রেমিকা মিথিকে নিজ হাতে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আরিফ। গত বৃহস্পতিবার নিজের অপকর্মের কথা অকপটে স্বীকার করে আরিফ। আদালতে আরিফ জানায়, হত্যাকাণ্ডের দিনগত ওই রাতে মিথির বান্ধবী রোমানা ও তার কথিত স্বামী অনিসহ দীর্ঘ সময় আড্ডা দেয় তারা। মিথি এসব পছন্দ করতো না বলে ঝগড়া হয় আরিফের সাথে। পরে তারা নিজেদের কক্ষে চয়ে যায়। শুরু হয় তুমুল ঝগড়া। দু’জন একে-অপরের ওপর হামলা করে। এক পর্যায়ে আরিফ মিথির গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে বালিশচাপা দিয়ে রাখে কিছুক্ষণ। আরিফ সাথী নামে পাশের সাবলেটের এক বাসিন্দাকে জানায় যে মিথি আত্মহত্যা করেছে। আরিফের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পৌছলে পাশের কক্ষ থেকে উঠে আসে রোমানা ও অনি। পরে ফেঁসে যাবার ভয়ে পুলিশকে খবর দেয় তারা। পরে পুলিশ এসে মিথির লাশ উদ্ধার করে। সুরতহাল রিপোর্টের পর ময়না তদন্তের জন্য মিথির লাশ মিডফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়না তদন্ত শেষে বুধবার রাতেই মিথির লাশ পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ব্যাপারে হাজারীবাগ থানার তদন্ত কর্মকর্তা (এসআই) হালিম টাইম নিউজবিডিকে জানান, আরিফ আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। তাই হত্যা মামলার আর তদন্তের প্রয়োজন নেই। তবে আরিফ মিথিকে বিবাহ করেছে বলেও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। বিবাহের সত্যতা সঠিক কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বিবাহের কোনো লিখিত ডকুমেন্ট পাইনি। হত্যার দায় স্বীকার করায় আদালত আরিফকে ফাঁসি অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারে বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (এসআই) হালিম। [b]ঢাকা, জেইউ, ৪ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর //কেবি[/b]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *