সোমবার ৬, ডিসেম্বর ২০২১
EN

 থেমে নেই বিএসএফ, ১০ বছরে গুলিতে ৩২২ বাংলাদেশি নিহত

আট বছর আগে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে বহুল আলোচিত ফেলানী হত্যাকান্ডে উল্লেখযোগ্য। ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির কাছে কাঁটাতারের বেড়ায় নিহত কিশোরীটির মরদেহ দীর্ঘ সময় কাঁটাতারে ঝুলে থাকে। এরপর দু'দিনব্যাপী দফায় দফায় পতাকা বৈঠকের পর বিএসএফ ফেলানীর লাশ বিজিবির কাছে ফেরত দিয়েছিল।

নাছির উদ্দিন শোয়েব : বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ এর গুলির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। শুধু বিএসএফ এর গুলিতেই নিহত হচ্ছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। সীমান্তে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী বা দুর্বৃত্ত ছাড়া অন্য কোনো বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির খবর পাওয়া যায় না।

বিএসএফরে গুলিতে বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ীরাই নিহত হচ্ছেন এমন নয়। গরু ব্যবসায়ী ছাড়াও তুচ্ছ ঘটনায়ও বাংলাদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন সময় বিএসএফ গুলি ছোড়ছে।

আট বছর আগে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে বহুল আলোচিত ফেলানী হত্যাকান্ড উল্লেখযোগ্য।

২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির কাছে কাঁটাতারের বেড়ায় নিহত কিশোরীটির মরদেহ দীর্ঘ সময় কাঁটাতারে ঝুলে থাকে। এরপর দু'দিনব্যাপী দফায় দফায় পতাকা বৈঠকের পর বিএসএফ ফেলানীর লাশ বিজিবির কাছে ফেরত দিয়েছিল।

এঘটনার পরও সীমান্তে থেমে ছিল না বিএসএফ এর গোলাগুলি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের গুলিতে গত দশ বছরে ৩২২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে চলতি বছরের (২০১৯) জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২৮ জন।

গত ১১ জুলাই একাদশ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন, ২০১৮ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা ২৯৪জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এম হারুনুর রশিদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে জানান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ২০০৯ সালে অন্তত ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ ও ২০১২ সালে ২৪ জন করে মোট ৪৮ জন, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন ও ২০১৮ সালে ৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্যমতে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফের হাতে ২৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীর চারাঘাটে এক ভারতীয় জেলেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টায় বিএসএফ-বিজিবির গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় দুই পক্ষের গোলাগুলিতে বিএসএফের এক জওয়ান নিহত হন।

বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি ভুল-বোঝাবুঝি কারণে হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই বাহিনীর প্রধানদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে, সীমান্তে শান্তি রক্ষায় দুই দেশই তৎপর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা জানান।

এক মায়ের আকুতি: শুধু আমাদের বাবলুর লাশ ফেরত চাই

একটি কেস স্টাডি করে দেখা যায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীর গুলিতে নিহত গরুর রাখাল বাবলু মিয়া (২৪) লাশ ও আটক সাইফুল ইসলামকে (১৪) ফেরত আনার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন এলাকার ৫ শতাধিক নারী পুরুষ।

গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের জোতনবীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

এলাকাবাসীর সাথে মানববন্ধনে অংশ নেন নিহত বাবলুর বিধবা স্ত্রী রজিফা বেগম, বাবা নুর মোহাম্মদ, মা আছিয়া খাতুন, বড় ভাই রাসেল মিয়া, ছোট ভাই লিটন ও খোকন, বোন পারভিন আক্তার, নার্গিস আক্তার, সিমু আক্তার, আন্না বেগম। মানববন্ধনে ৫১ বিজিবির সহযোগিতায় নিহত বাবলু ও বিএসএফের হাতে আটক থাকা সাইফুলকে ফেরতের দাবি জানান এলাকাবাসী।

স্থানীয়রা জানান, ১১ অক্টোবর বুধবার বিকালে স্কুল মাঠে সীমান্তে চোরাচালান, মানবপাচাররোধে গণসচেতনার জন্য ৫১ বিজিবির পক্ষে মতবিনিময় সভার ডাক দেওয়া হয়েছিল। এ জন্য আগের দিন বিজিবি এলাকায় মাইকিংসহ ঢোল সহরত (ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা) করেছিল। কিন্তু বাবলুর লাশ ও আটক সাইফুলকে ফেরতের দাবি নিয়ে এলাকাবাসীর মানববন্ধন কর্মসুচির কারণে ওই সভা বিজিবি স্থগিত করে। এ ব্যাপারে ৫১ বিজিবির পক্ষেকোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মানববন্ধনে বাবলুর বাবা মা আছিয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আমরা কিছুই চাই না, শুধু আমাদের বাবলুর লাশ ফেরত চাই। ঘটনার ৯ দিন অতিবাহিত হলেও আমরা আজও বাবলুর লাশ ফেরত পাইনি। আমরা দেশের মাটিতে বাবলুর লাশ দাফন করতে চাই।

এদিকে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নিহত বাবলুর স্ত্রী যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলেন আর চোখের পানি ফেলছিলেন। এক সময় চিৎকার করে বলতে থাকেন, আমার স্বামীর লাশ এনে দেন। শেষবারের জন্য তাকে একবার দেখতে চাই।

অপর দিকে বিএসএফের হাতে আটক সাইফুলের বাবা ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়শিঙ্গেশ্বর গ্রামের গোলজার রহমান বলেন, আমার ছেলেকে ফেরত চাই। আমি ও নিহত বাবলুর পরিবার ৫১ বিজিবির কাছে বার বার ধর্না দিয়েও কোনো আশার আলো দেখতে পাইনি।

এমনকি গত রবিবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নিহত বাবলু ও আটক সাইফুলকে ফেরত আনারদাবিতে৫১ বিজিবির কমান্ডিং অফিসার (সিও) স্যারের কাছে লিখিত আবেদন নীলফামারীর ডিমলা ইউএনওমাধ্যমে প্রদান করি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর সকালে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা ও লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম তিস্তা নদীর চর সীমানায় গরু চড়াতে ও ঘাস কাটতে গেলে সীমান্তের ৭৭২ প্রধান পিলালের কাছে ভারতীয় সীমান্তরী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মোহাম্মদ বাবলুর মিয়া(২৪) নিহত হন।

এ সময় বাবলুর সঙ্গে থাকা চৌদ্দ বছরের বালক সাইফুল ইসলাম আহত হয়। বাবলুর লাশসহ আহত বালককে বিএসএফ ভারতে নিয়ে যায়।

এলাকাবাসী জানান, বাবুলের বাড়ি সীমান্তবর্তী কালিগঞ্জ গ্রামের তিস্তা নদীর চরে। নদীর ওপারেই পাটগ্রামের দহগ্রাম সীমান্ত। ঘাস খাওয়ানোর জন্য তার সঙ্গে থাকা গরু দেখে বিএসএফ ভেবে নেয় গরু চোরাকারবারী। সেটি ভেবেই গুলি করতে পারে তাকে। এরপর তার লাশ নিয়ে যায় বিএসএফ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *