শুক্রবার ১, জুলাই ২০২২
EN

দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ১৫ বছর আজ

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় ৫৫০টি স্থানে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এতে দু’জন নিহত ও ১০৪ জন আহত হন।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় ৫৫০টি স্থানে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এতে দু’জন নিহত ও ১০৪ জন আহত হন।

আজ এই হামলার ১৫ বছরপূর্তি। হামলার ঘটনায় ১৫৯টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৫৯ মামলার বিচার কাজ অদ্যাবধি শেষ হয়নি। বাকি মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার এক মামলায় জেএমবির পাঁচ সদস্যকে ১২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। সিরিজ বোমা হামলার ঘটনার পর জড়িত এক হাজারেরও বেশি জঙ্গি ধরা পড়ে। এদের মধ্যে অর্ধশতাধিক জঙ্গি জামিন নিয়ে এখন পলাতক আছে।

আদালত ও পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, হামলার ঘটনায় দায়ের করা ১৫৯টি মামলায় ১৩০ জনকে আসামি করা হয়। পরে চার্জশিটে (অভিযোগপত্র) এক হাজার ৭২ জনকে আসামি করা হয়। বিভিন্ন অভিযানে গ্রেফতার হয় জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইসহ ৯৬১ জন। সাজাপ্রাপ্ত ৩২২ জনের মধ্যে ২৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বাকি ২১ জন এখনও পলাতক। এসব মামলায় খালাস দেয়া হয়েছে ৩৫৩ জনকে। বাকি আসামিরা পলাতক। ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয় ১৭টি মামলার। আর চার্জশিট দেয়া হয় ১৪২টি মামলায়।

মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সর্বোচ্চ ২৩টি মামলা হয় ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জে। সর্বনিম্ন ৩টি করে মামলা হয় খুলনা মহানগর ও রেলওয়ে রেঞ্জে। মহানগরীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় ডিএমপিতে। ডিএমপিতে ১৮টি মামলা হলেও ৯টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়। বাকি ৯টিতে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত হামলায় জড়িত সাত আসামির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল ও ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এরপর ওই বছরের ১৭ অক্টোবর অপর আসামি আসাদুল ইমলাম আরিফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর ১৫৯টি মামলা হয়। সবগুলো মামলায় পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে ১৪৩টি মামলায় চার্জশিট ও ১৬টি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ সময়মতো তদন্ত শেষ করে যথাযথভাবে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

মামলাগুলো এখন বিচারাধীন। তিনি বলেন, জঙ্গি তৎপরতা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়। এর মধ্যে ১১টি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট (এফআরটি-চূড়ান্ত প্রতিবেদন) দিয়েছে পুলিশ। বাকি সাত মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় রায় হয়েছে। আর পাঁচটি মামলা ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. আবদুল্লাহ আবু বলেন, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ঢাকায় দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে কয়েকটির ফাইনাল রিপোর্ট এবং কয়েকটির চার্জশিট দেয়া হয়েছে। দুটি মামলায় রায়ও হয়েছে। কয়েকটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, করোনার জন্য দীর্ঘদিন আদালতের নিয়মিত সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। যে কারণেও মামলাগুলোয় সময় ব্যয় হয়েছে। তিনি জানান, কিছু মামলায় সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না। আর সাক্ষী না আসায় এর সুবিধা ভোগ করছেন আসামিরা। এভাবে যদি সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে শিগগিরই মামলাগুলোর সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায় শেষ হয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে যাব।

ঢাকায় সর্বশেষ গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর এক মামলায় জেএমবির পাঁচ সদস্যকে ১২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর দুই নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- আবদুল্লাহ আল সুহাইল, মো. আবদুর রহমান মাসুদ, মো. নূরুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ওরফে জুবায়ের, হাবিবুর রহমান হাবিব ও মো. মুসা ওরফে মুস্তাফিজুর রহমান ওরফে সামাদ ওরফে মিন্টু। শেষের দু’জন আসামি এখনও পলাতক আছে।

এদিন রাজধানীর ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হল এলাকায়, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকা ও খিলক্ষেত ওভারব্রিজ এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে জঙ্গিরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায়। খিলক্ষেত ওভারব্রিজের কাছে বোমা হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার এএসআই মো. কাওসার আলম বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ২ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় চার্জশিট দাখিল করা হয়।

এরপর আরও দু’বার সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়। সর্বশেষ সম্পূরক চার্জশিটে আবদুল্লাহ আল সুহাইলকে আসামি করা হয়। জেএমবি নেতা আতাউর রহমান সানিও এ মামলার আসামি ছিল। অন্য মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাকে এ মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২০০৫ সালে দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলাকে তারা ‘সাউন্ড বাস্ট’ নামে আখ্যায়িত করেছে। যেসব স্থানে বোমা হামলা হয়েছে, প্রতিটি জায়গায় তারা ‘ইসলামী আইন বাস্তবায়ন’ শিরোনামে লিফলেট ফেলে যায়। এছাড়া জেএমবি প্রতিষ্ঠার পর থেকে একের পর এক রক্তক্ষয়ী হামলা চালায়।

২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের রক্সি সিনেমা হল ও সার্কাস মাঠে বোমা হামলা চালায় তারা। এরপর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অন্তত অর্ধশত হামলায় জড়িত ছিল জেএমবি। এসব হামলায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হন। জেএমবির হামলার মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা হামলা, নাটোরে বোমা হামলা। রাজধানীর গোপীবাগে সিক্স মার্ডার ও ফার্মগেটে মাওলানা ফারুকী হত্যায়ও জেএমবি জড়িত।

জঙ্গি দমনের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে গুলশান ও শোলাকিয়ায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলা চালিয়ে আতঙ্ক ছড়ায় জেএমবির নব্য ধারা (নব্য জেএমবি)। এই দুটি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মুখে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীসহ অন্তত ৭০ জঙ্গি নিহত হয়।

অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে। সংগঠনটি দুর্বল হয়ে পড়লেও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। কারাগারের বাইরে থাকা জঙ্গিরা এখনও গোপনে তৎপর হওয়ার চেষ্টা করছে।

এএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *