মঙ্গলবার ২৫, জানুয়ারী ২০২২
EN

নতুন পৃথিবীর খোঁজে গ্রহ শিকারীরা

গবেষকরা ছয় হাজার গ্রহ তারা আবিষ্কার করলেও হন্যে হয়ে খুঁজছে এমন একটি গ্রহের যার সাথে মিল রয়েছে আমাদের এই পৃথিবীর।

প্রতিনিয়তই একের পর এক গ্রহ আবিষ্কার করছেন মহাকাশ গষেকরা। গবেষকরা ছয় হাজার গ্রহ তারা আবিষ্কার করলেও হন্যে হয়ে খুঁজছে এমন একটি গ্রহের যার সাথে মিল রয়েছে আমাদের এই পৃথিবীর। যেখানে বসবাস করতে পারবে প্রাণী।

এমনই একজন গ্রহ শিকারি ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক জ্যোতি:পদার্থ বিজ্ঞানী সারা সিজার। যিনি গত ২০ বছর ধরে গ্রহ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন।

সারা বলেন, আমরা এমন একটি গ্রহ খুজে বের করতে চাই যা হবে আমাদের নতুন পৃথিবী, যেখানে আমরা থাকতে পারবো। সারা বিশ্বাস করেন, কিভাবে নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করতে হবে তিনি তা জানেন।

১৯৯০ সালের কথা, যখন প্রথম গ্রহ আবিষ্কার করা হয়। তথন বিজ্ঞানীরা অনেক প্রশ্নের উত্তরই জানতো না। কিন্তু বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির কারণে নতুন অনেক কিছু জানতে পারছে বিজ্ঞানীরা।

বর্তমানে গবেষকরা ছয় হাজারেরও বেশি গ্রহ পর্যবেক্ষণ করছে। যার বেশির ভাগই দানব আকৃতির গ্যাসের বলের মত। গ্রহের সংখ্যা প্রতি সাপ্তাহেই বাড়ছে। অনেক নুতুন গ্রহ সৌরজগতের বাইরে নিজেদেরকে উন্মুক্ত করছে। কিন্তু গবেষকরা এমন একটি গ্রহের খোঁজ করছেন যা হবে পাথরের এবং এতে থাকবে পানি। যা হবে প্রাণীর জন্য অনুকূল।

আমরা মনে করি, টেলিস্কোপ দিয়ে সহজেই গ্রহ দেখা যায়। কিন্তু গ্রহ দেখা নিতান্তই কোন সহজ কাজ নয়। কারণ প্রতিনিয়তই নক্ষত্রগুলো থেকে চোখ ধাঁধানো আলোক রশ্মি আসে, যা সূর্যের চাইতে ভিন্ন প্রকৃতির এবং বৈশিষ্ট্যের। এই আলোগুলো লাইটহাউজের মত যা গ্রহের চারদিকে হাজার হাজার মাইল ব্যাপৃত। সৌরজগতের বাইরে এমন অনেক গ্রহই রয়েছে যা সূর্যের মতই দেখায়। তাই এই হাজার হাজার মাইল চোখ ধাঁধানো আলোর জগতের মাঝ থেকে গ্রহ দেখা বা খুঁজে বের করা কোন সহজ স্বাভাবিক কাজ নয়।

সারা সিজার বলেন, ১৯৯৫ সালের কথা, তখন আমি হার্বার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি'র ছাত্রী। আমার গবেষণার বিষয় ছিল গ্রহ। ঠিক সে সময়ে প্রথম গ্রহের আবিষ্কার হয় অস্পষ্টভাবে (indirectly)। তখন অনেকেই বিশ্বাস করতে চায়নি গ্রহ আবিষ্কারের বিষয়টি। অনেকে আমাকে বলতো, 'তুমি এগুলো কি করছো, এগুলো গ্রহ নয়।'

প্রথম দিকে গ্রহ আবিষ্কারের জন্য যে ওবল (Wobble) বা কম্পন টেকনিক অবলম্বন করা হতো তা ছিল অস্পষ্ট। তাই এই টেকনিকের পরিবর্তন করে 'লাইট ট্রানজিট' টেকনিক অনুযায়ী কাজ করা হয় এবং ই টেকনিক অনুযায়ী কাজ গ্রহ খোঁজার কাজ অনেক সহজ হয়।                      

সারা সিজার বলেন, আমরা গ্রহ খোঁজার জন্য যে বিষয়টি সর্বপ্রথম দেখি তা হলে সে গ্রহের বায়ুমণ্ডলে পানির জলীয়বাষ্প আছে কি না। আমরা কিছু দানবীয় আকৃতির গ্রহে পানির জলীয়বাষ্প দেখেছি কিন্তু সেসব গ্রহগুলো বিরাট আকারের গ্যাসের বল, যেমন জুপিটার। এ পর্যন্ত কোন পাথরে তৈরী গ্রহে (Rocking Planet) পানির জলীয়বাষ্প খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সারা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীর জন্য দরকার পানি এবং প্রত্যেক প্রাণের জন্য দরকার তরল। রসায়ণ শাস্ত্রের মতে, তরল ছাড়া কোন প্রাণ তৈরী হতে পারে না।

এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ছয় হাজার গ্রহের মধ্যে দুই হাজার গ্রহকে সঠিক গ্রহ বলে নিশ্চিত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে মাত্র ত্রিশটি গ্রহকে বসবাসের উপযোগী বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

২০১৪ সালে প্রথম পৃথিবীর আকৃতির মত একটি গ্রহ আবিষ্কার করে নাসা। যার নাম কেপলার-১৮৬এফ। এই গ্রহ আবিষ্কারে ‘কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ’ ব্যবহার করা হয়। এই গ্রহটি পৃথিবী থেকে ৫০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং পৃথিবী থেকে ১০ গুণ বড়।

নাসা জানায়, কেপলার-১৮৬এফ আবিষ্কার পৃখিবীর মত গ্রহ খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট বড় সাফল্যের পদক্ষেপ। কেপলার-১৮৬এফ গ্রহটি রেড ডর্ফ (Red Dwarf)ধরণের পরিচিত নক্ষত্রের কক্ষপথে রয়েছে যার আকৃতি সূর্যের চেয়ে অর্ধেক।                          

কেপলার-১৮৬এফ আবিষ্কারের পর ২০১৫ সালে নাসা আবিষ্কার করে কেপলার-৪৫২বি। যা দেখতে পৃথিবীর মতই তবে ৬০ গুণ বড়। পৃথিবীর সাথে এই গ্রহের আরেকটি মিল রয়েছে আর তা হল ৩৮৫ দিনে এর নিজের কক্ষপথ একবার অতিক্রম করে, পৃখিবী করে ৩৬৫ দিনে একবার। কেপলার-৪৫২বি গ্রহটি যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে তা অবিকল সূর্যের মতই।

কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের যাত্রা শুরু ২০০৯ সাল থেকে। এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ গ্রহই কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে আবিষ্কার করা হয়েছে।এই টেলিস্কোপের প্রধান কাজ হল মহাকাশে এমন গ্রহের খোঁজ চালানো, যেগুলি তাদের নিজস্ব তারা থেকে এমন দূরত্বে রয়েছে, যতটা দূরত্ব পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় এই দূরত্বকে বলা হয় ‘গোল্ডিলক জোন’। মূলত, এই অঞ্চলে থাকা গ্রহগুলিতে প্রাণের উৎস মেলার সম্ভাবনা প্রবল বলে বিশ্বাস করেন বিজ্ঞানীরা।

বেশিরভাগ গ্রহের নামকরণও কেপলারের নামানুসারে করা হয়েছে। পৃথিবী থেকে মহাকাশের ৭৫ মিলিয়ন মাইলেরও বেশি জায়গায় এর কার্যক্রম চলছে।

গত ৬ বছর ধরে মহাকাশে নিরন্তর এক্সো-প্ল্যানেটের খোঁজ চালাচ্ছে কেপলার। প্রায় ১ লক্ষ তারাকে টার্গেট করে তাদের চারদিকে ঘোরা বিভিন্ন গ্রহকে পরীক্ষা করেছে কেপলার। এখনও পর্যন্ত গোল্ডিলক জোনে থাকা প্রায় এক হাজার গ্রহের সন্ধান দিয়েছে এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপ। কিন্তু, অধিকাংশই গ্যাসে ভরা আর তাদের আয়তন প্রায় জুপিটার বা বৃহস্পতির সমান। মাত্র আটটি গ্রহ পৃথিবীর আয়তনের দ্বিগুণ।

এরই ধারাবাহিকতাক্রমে মহাকাশে আরো একটি নতুন চোখ দরকার যা পৃথিবীর মানুষকে দেখাবে আরো নতুন কিছু, আবিষ্কার করবে মহাকাশের আরো অজানা তথ্য। তাই ২০১৭ সালে আসছে নাসার নতুন প্রোজেক্ট।

এই বিষয়ে সারা সিজার বলেন, বায়ুমন্ডলকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিজ্ঞানীদের দরকার মহাকাশে একটি নতুন চোখ (new eyes in the sky)। তাই ২০১৭ সালে নাসা একটি নতুন প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছে যার নাম ট্রানজিটিং এক্সোপ্লানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (TESS…Transiting Exoplanet Survey Satellite)। আর এতে আমি কাজ করতে যাচ্ছি।                       

সারা সিজার বলেন, এই প্রোজেক্টের কাজ হবে মহাকাশে বসবাস উপযোগী জোনের (habitable zone) কাছাকাছি যতগুলো পাথরীয় ছোট গ্রহ (small rocky planets) রয়েছে তা খুঁজে বের করা এবং তা নিয়ে গবেষণা চালানো।

এ গবেষণার জন্য একটি নতুন টেলিস্কোপও চালু করা হবে ২০১৮ সালে। যার নাম মহাকাশ বিজ্ঞানীদের পথিকৃৎ ও ১৯৬০ সালের নাসা প্রধান জেমস এডউইন ওয়েব এর নামানুসারে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ (James Webb telescope) রাখা হয়েছে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশের আরো অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে পারবে বিজ্ঞানীরা। এই টেলিস্কোপ নক্ষত্র থেকে ছুটে আসা চোখ ধাঁধানো আলোক রশ্মিকে ব্লক (block) করে গ্রহের ইমেজ বা ছবি সংগ্রহ করতে পারবে। ফলে এই টেলিস্কোপের ছবিগুলোর মাধ্যমে বিজ্ঞানী করতে পারবে নতুন দিগন্তের উন্মোচন।

এই প্রোজেক্টের মাধ্যমে সারা সিজার কিংবা অন্যান্য মহাকাশ গবেষকরা যে বিষয়ে গবেষণা করার সুযোগ পাবে তা এর আগে কোন বিজ্ঞানী পাইনি।তাই সারা বলেন, এই কাজটি হবে খুবই আশ্চর্যজনক আমার জন্য।

সারা বিশ্বাস করেন, তাদের এই কাজে অনেক গ্রহই থাকবে পাথরীয় (Rocky Planet), এবং যার মধ্যে পাওয়া যাবে পানি এবং আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী এগুলো সেখানেই আছে। সূত্র: সিএনএন

ইআর

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *