মঙ্গলবার ২৫, জানুয়ারী ২০২২
EN

নেতিবাচক শিরোনামেই ছাত্রলীগের ৬৭তম বছর পার

'জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের মডেল' এই স্লোগানকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সারাদেশে পালিত হচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সফল নেতৃত্বদানের পাশাপাশি সংগঠনটি জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্কের। প্রতি দেড় মাস অন্তর নিজ দলের কর্মীকে হত্যাসহ নানান নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ৬৭তম বছর পার করলো সংগঠনটি।

'জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের মডেল' এই স্লোগানকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সারাদেশে পালিত হচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সফল নেতৃত্বদানের পাশাপাশি সংগঠনটি জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্কের। প্রতি দেড় মাস অন্তর নিজ দলের কর্মীকে হত্যাসহ নানান নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ৬৭তম বছর পার করলো সংগঠনটি।

বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ভাড়ায় খাটা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, ভর্তি-বাণিজ্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসসহ বছর জুড়ে নানা অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।

সর্বশেষ বকশীবাজার এলাকায় ছাত্রদলের ওপর হামলা চালিয়েছে তারা। এছাড়াও সম্প্রতি শাহজালাল ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি-স্টাইল বন্দুকযুদ্ধে নিজেদের দু’জন কর্মীকে হত্যা করে অপর কর্মীরা। সারা বছর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার পর নভেম্বর মাসে নিজেদের ঝুলিতে সুনাম কুড়াতে ‘ক্লিন ক্যাম্পাস সেভ ক্যাম্পাস’ নামে দেশব্যাপী একটি কর্মসূচি হাতে নেয় তারা। এ কর্মসূচির নামেও চলেছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে এ কর্মসূচি।

২০১৪ সালে ছাত্রলীগ নিজেদের মধ্যে ৫ শতাধিক সংঘর্ষ ঘটিয়েছে। এসব ঘটনার নেপথ্যের কারণ ছিল আধিপত্য বিস্তার ও পদপদবির লড়াই। গত ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের অবস্থা এমনটি ছিল না। অনেক নেতাকর্মী কমিটিতেই আসতে চাইতেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭১ সদস্যের হল কমিটি করার টার্গেট ছিল। তবে বেশির ভাগ হলে কমিটি দেয়া হয়নি। যেগুলোতে হয়েছে তাও পূর্ণাঙ্গ নয়। নির্বাচনের আগে দলীয় মিছিলে গড়ে ১৫-২০ জনের মতো উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে যেকোন মিছিলেই দেখা যায় গণজোয়ার। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সর্বশেষ নিহত হয়েছেন তাপস পাল। গত ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দলের কর্মীদের গুলিতে নিহত হন তিনি।

এর আগে ২০ নভেম্বর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দু'পক্ষের সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সুমন দাস নিহত হন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। ওই দিন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে গত এক বছরে এ নিয়ে চারবার এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলো।

চলতি বছরের প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে গত ৩১ মার্চ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি)। আশরাফুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী সায়াদ ইবনে মমতাজ নিহত হন এদিন। ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে তাকে খুন করা হয়।

৪ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী আকন্দ নিজ কক্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি সংগঠনের পরবর্তী সম্মেলনে ওই হল শাখার সভাপতি পদপ্রার্থী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, পদ নিয়ে সৃষ্ট অন্তর্দ্বন্দ্বেই প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে।

১৪ জুলাই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাঈমুল ইসলাম রিয়াদকে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

গত ৩১ আগস্ট ঢাকায় সমাবেশ শেষ করে ফেরার পথে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা তৌকির ইসলামকে। বিগত ছয় বছরে ছাত্রলীগের এ ধরনের ঘটনায় মোট ৪০ জন নিহত হয়েছেন।

এছাড়া সম্প্রতি ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতের শঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদন দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের লাগাম কোন অবস্থাতেই টেনে ধরতে পারেনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ। এর কারণ হিসেবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চিহ্নিত করেছে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের কাউন্সিল না হওয়া।

বর্তমান কমিটি ২০১১ সালের ১১ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করে। গত বছরের ১১ জুলাই এই কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কমিটি দেয়ার কোন উদ্যোগ নেই। ফলে যে যার মতো করে অপকর্ম করে যাচ্ছে। কেন্দ্রসহ বেশির ভাগ মহানগর, জেলা নেতারা সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত না থেকে আখের গোছানো কাজেই বেশি সময় দিচ্ছেন। এ কারণে কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আধিপত্য বজায় রাখতে বিপরীত দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার পাশাপাশি নিজ দলের কর্মীদেরও খুন করছে ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের অর্থ উপার্জনের ব্যবসায় বিগত বছরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ভর্তি জালিয়াতি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন চাকরির পাস করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নেয় এক শ্রেণীর নেতাকর্মী। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর প্রতিটি সরকারি ও বড় বেসরকারি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা এ বাণিজ্যে জড়িত। অনার্সে অনলাইনে ভর্তি করা চালু হওয়ার পর ছাত্রলীগের নতুন করে প্রশ্নফাঁস আর ডিজিটাল জালিয়াতির জোগান দিয়েছে সংগঠনটি।

চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিটাল ভর্তি জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিল সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী। একই অভিযোগে ঢাবি ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এছাড়া প্রশ্নফাঁসের বেশির ভাগ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার প্রমাণ পায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে ১২০০ পিস ইয়াবাসহ ধরে পড়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী। ঢাবি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করে আটক কর্মীরা। তবে অদৃশ্য কারণে এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রলীগ।

এ বছর অন্তত ১৩টি অপহরণের ঘটনায় জড়িত ছিল ছাত্রলীগ। ১৩ ফেব্রুয়ারি সূর্যসেন হলে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের তরিকুল ইসলামকে অপহরণ করে আটকে রাখে আরিফুর রহমান। ২৮ ফেব্রুয়ারি হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলম প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টারের এক দোকানদারকে ধরে নিয়ে আসে। ৬ মে ফার্সি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এ বি মাইনুল ইসলামকে চানখাঁরপুল থেকে অপহরণ করে ঢাকা কলেজের বিলুপ্ত কমিটির প্রচার সম্পাদক সোহেল রানা।

৯ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চ থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ১৮ নভেম্বর জগন্নাথ হলে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা উৎপল সাহার ছোট ভাই বহিরাগত উদয় সাহা এক গাড়ির চালককে হলে এনে আটকে রাখে। পরে মারধর করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এসব ঘটনায় ২-৩টা মামলা হলেও পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারে নি। আবার ঘটনার সময় যাদের আটক করা হয়েছিল তাদেরও ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

এমআর/ এআর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *