মঙ্গলবার ২৫, জানুয়ারী ২০২২
EN

নিভৃতে চলে গেল সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী

উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো ৫ ডিসেম্বর। বরেণ্য এ নেতা ১৯৬৩ সালের এই দিনে লেবাননের বৈরুতে একটি হোটেল কক্ষে মারা যান

উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো ৫ ডিসেম্বর। বরেণ্য এ নেতা ১৯৬৩ সালের এই দিনে লেবাননের বৈরুতে একটি হোটেল কক্ষে মারা যান।

কিন্তু তেমন কোনো কর্মসূচি বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই চলে গেলে দিনটি। প্রতিবছরই এভাবেই নিবৃত্তে চলে যায় সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী।

শুধু তাই নয় দেশের গণমাধ্যমগুলো তেমন গুরুত্ব দিয়ে তার মৃত্যুদিবসের খবর প্রচার করেনি। যদিও দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ রাজনৈতিক নেতারা বাণী দিয়েছেন। আর বিচ্ছিন্নভাবে অল্প পরিসরে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় আমরা কী এই মহান নেতাকে উপযুক্ত মূল্যায়ণ করতে পেরেছি?

বৃটিশ ভারতের সবচেয়ে মানবতাবাদী, গণতান্ত্রিক নেতা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম দাড়িয়েছিলেন।

শেখ মুজিবকে বাংলার নেতা হিসাবে তিনিই প্রস্তুত করেছিলেন। শেখ মুজিবকে সাথে নিয়ে ৪৬-৪৭ এর অশান্ত দিনগুলোতে নিজের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে তিনি দাঙ্গা প্রতিরোধ করেন।

৪৭ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে ২৮ বছরের তরুণ শেখ মুজিবকে ঢাকায় পাঠান সোহরাওয়ার্দী।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সোহরাওয়ার্দীকে যথাযথ মর্যাদা দেয়া হয়নি। আর এর মূল কারণ দুটি।

প্রথমত তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের গুরু। তাই শেখ মুজিব বিরোধীরা তার বিষোদগার করতে গিয়ে সোহরাওয়ার্দীকেও খাটো করেন।

দ্বিতীয়ত তিনি পশ্চিম বাংলার লোক ছিলেন। এই জন্য ভারত বিদ্বেষীরা সোহরাওয়ার্দীর অবদানকেও স্বীকার করতে চান না।

অথচ সোহরাওয়ার্দীর কাছে বাংলার মানুষের অনেক ঋণ। জিন্নাহর ঘোষিত ডাইরেক্ট একশনের ফলে এবং ৪৭ এ দেশভাগের সময় উদ্ভুত দাঙ্গায় সোহরাওয়ার্দী নিজের জীবন বিপন্ন করে দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত লোকেদের সেবা করতে করতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন।

৪৭-এ সমগ্র পাকিস্তানে একমাত্র বাংলায় সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিমলীগ সরকার ক্ষমতায় ছিলো। অথচ জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীকে বাদ দিয়ে অনুগত লিয়াকত আলি খানকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে পাকিস্তানে মুসলীম লীগ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন।

আর সোহরাওয়ার্দী ক্ষমতার প্রতি ন্যুনতম আগ্রহ না দেখিয়ে মনযোগ দিয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এজন্যই তাকে " গণতন্ত্রের মানসপুত্র " নামে অভিহিত করা হয়। পাকিস্থানের অসুস্থ রাজনীতিতেও তাকে কখনো ক্ষমতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যায়নি। এখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব।

রাজনৈতি জীবনের শুরুতে তিনি যোগ দেন চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ পার্টিতে। এটি তখন মূলত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরের একটি গ্রুপ ছিল।

১৯২৩ এর বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরে তার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।

১৯২৪ সালে তিনি কলকাতা পৌরসভা র ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস।

১৯২৭ সালে সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করেন। ১৯২৮ সালে সর্বভারতীয় খিলাফত সম্মেলন এবং সর্বভারতীয় মুসলিম সম্মেলন অনুষ্ঠানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলমানদের মধ্যে তার ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের সাথে তিনি জড়িত হননি।

১৯৩৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ইন্ডিপেন্ড্যান্ট মুসলিম পার্টি নামক দল গঠন করেন। ১৯৩৬ এর শেষের দিকে এই দলটি বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাথে একীভূত হয়। এই সুবাদে তিনি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগ তথা বিপিএমএল এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।

১৯৪৩ সালের শেষ দিক পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। ১৯৪৩ সালে শ্যমা-হক মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পরে গঠিত খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় তিনি একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় তিনি শ্রমমন্ত্রী, পৌর সরবরাহ মন্ত্রী ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৬ এর নির্বাচনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের বিপুল বিজয়ে তিনি এবং আবুল হাশিম মূল কৃতিত্বের দাবিদার ছিলেন।

১৯৪৬ সালে বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি ব্যাপক সমর্থন প্রদান করেন। পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১৯৪৬ সালে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন এবং সহযোগিতা প্রদান করেন।

১৯৪৭ এর আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরে মুসলিম লীগের রক্ষণশীল নেতারা খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।

এর আগে ১৯৪৭ সালের আগস্ট ৫ এ খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর পরোক্ষ সমর্থনে মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন।

এরপর থেকে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতারা কোনঠাসা হয়ে পড়েন। খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববাংলার মূখ্যমন্ত্রী হবার পর বেশ কয়েকবার সোহরাওয়ার্দীকে "ভারতীয় এজেন্ট" এবং "পাকিস্তানের শত্রু" হিসেবে অভিহিত করেন। সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানের আইনসভার সদস্য পদ থেকে অপসারিত করা হয়।

তার অনুসারীরা অনেকে ১৯৪৮ এর শুরুর দিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ এবং ১৯৪৯ এর জুনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লীগ গঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক

মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে পরে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ।

টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থাতেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান মুজিব।

অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

১৯৫৩ সালে তিনি একে ফজলুল হক এবং মাওলানা ভাসানীর সাথে একত্রে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন উপলক্ষে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাভূত করার জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে এই যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।

আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। এই যুক্তফ্রন্টের নেতা ছিলেন - ১) মওলানা ভাসানী, ২) একে ফজলুল হক ও ৩) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

এই যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। ওই ইশতেহারের মধ্যে প্রধান দাবি ছিল -

১) লাহোর প্রসত্দাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা,

২) বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা,

৩) ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা,

৪) ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার নির্মাণ করা ইত্যাদি।

১৯৫৪ সালের মার্চের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এরমধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।

১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ 'মুসলিম' শব্দটি বর্জন করে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এরপর মোহাম্মদ আলী বগুড়ার মন্ত্রিসভায় সোহরাওয়ার্দি আইনমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

তিনি ডিসেম্বর ২০, ১৯৫৪ হতে আগস্ট, ১৯৫৫ পর্যন্ত এ পদে ছিলেন। আগস্ট ১১, ১৯৫৫ হতে সেপ্টেম্বর ১, ১৯৫৬ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান আইনসভায় বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণয়নে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি সেপ্টেম্বর ১২, ১৯৫৬ থেকে অক্টোবর ১১, ১৯৫৭ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৬ সালে চৌধুরি মোহাম্মদ আলির পদত্যাগের পর তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

পররাষ্ট্র বিষয়ে পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রপন্থী মনোভাবের ব্যপারে তাকে অগ্রদূত হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৫৬ সালে সংখ্যা-সাম্যের ভিত্তিতে একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়। কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের ১৩ জন এমএনএ থাকা সত্ত্বেও রিপাবলিকান পার্টির সহযোগিতায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে তিনি পদক্ষেপ নেন। কিন্তু তার এই পদক্ষেপ ব্যাপক রাজনৈতিক বিরোধীতার জন্ম দেয়।

পূর্ব পাকিস্তানের মতো পশ্চিম পাকিস্তানেও এক ইউনিট ধারণা প্রচলনের তার চেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের কারণে নস্যাৎ হয়ে যায়। এরপর ১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মীর্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন। আগস্ট, ১৯৫৯ হতে ইলেক্টিভ বডি ডিসকুয়ালিফিকেশান অর্ডার অনুসারে তাকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অপরাধ দেখিয়ে তাকে জানুয়ারি ৩০, ১৯৬২ তে গ্রেফতার করা হয় এবং করাচি সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ করা হয়। আগস্ট ১৯, ১৯৬২ সালে তিনি মুক্তি পান। অক্টোবর, ১৯৬২ তে তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট গঠন করেন।

স্বাস্থ্যগত কারণে ১৯৬৩ সালে দেশের বাইরে যান এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থানকালে ডিসেম্বর, ১৯৬৩ তে তিনি মারা যান। তার মৃত্যু অনেকের কাছে রহস্যমণ্ডিত।

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের নামকরণ করেন।

এসএইচ, জেএ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *