রবিবার ৩, জুলাই ২০২২
EN

নির্বাচনের প্রথম ধাপ, দুশ্চিন্তায় আ’লীগ...

উপজেলা নির্বাচনে দলের খারাপ ফলাফল অনেকটাই ভাবিয়ে তুলেছে আওয়ামী লীগকে। তারা এখন এ নিয়ে শুরু করেছেন নানান হিসাব-নিকাশ। কিন্তু এ হিসাবে অনেকটাই মুছড়ে পড়ছেন দলের নীতি নির্ধারনী নেতারা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য তৃনমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ভাবমূর্তী রক্ষা না করাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপজেলা নির্বাচনে দলের খারাপ ফলাফল অনেকটাই ভাবিয়ে তুলেছে আওয়ামী লীগকে। তারা এখন এ নিয়ে শুরু করেছেন নানান হিসাব-নিকাশ। কিন্তু এ হিসাবে অনেকটাই মুছড়ে পড়ছেন দলের নীতি নির্ধারনী নেতারা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য তৃনমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ভাবমূর্তী রক্ষা না করাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাচনে প্রথম ধাপের ফলাফলের ব্যাপারে দলের শীর্ষ নেতা ইতোমধ্যেই বাঘা বাঘা বেশ কয়েকজনের কাছে কৈফিয়ত তলব করেছেন। তিনি রীতিমত নানান প্রশ্নও তুলেছেন নেতাকর্মীদের বিষয়ে। অনেক উপজেলায় দলসমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়সহ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াতের তুলনায় অনেক কমসংখ্যক উপজেলায় বিজয়ী হওয়ার বিষয়টিই ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে এই ফল বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণও। যদিও দলীয় নেতারা উপজেলা নির্বাচনে খারাপ ফল হলেও প্রথম দফার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হওয়ায় নিজেদের সন্তুষ্টির কথাই জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন জাতীয় রাজনীতি কিংবা সরকার পরিবর্তনের বেলায় তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। তাই এই নির্বাচনকে সরকারের জনপ্রিয়তার ওঠানামার পরিমাপক হিসেবে বিবেচনার কোন সুযোগই নেই। এছাড়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি ও তার মিত্রদের এই নির্বাচনে আসাটাকেও ‘বিরাট বিজয়’ হিসেবে দেখছেন নেতারা। বুধবার উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ শেষে আওয়ামী লীগের অনেকটা ফল বিপর্যয়ের পর প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়ায়ও এমন মনোভাবই ফুটে উঠেছে। এদিন রাতে গণভবনে দলের সংসদীয় বোর্ডের মূলতবি বৈঠকে শেখ হাসিনা নিজেই উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগের স্বস্তির জায়গা হচ্ছে বিএনপি এই সরকারের অধীনেই উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এটি আওয়ামী লীগের জয়। তবে উপজেলা নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ায় দলের এই ফলেও সন্তুষ্ট সরকার দলীয় নেতারা। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, উপজেলা নির্বাচনে দলীয় সমর্থন থাকলেও দলগতভাবে হয় না। তাই এ নির্বাচনে কে জিতলো বা হারলো, সেটি বড় বিষয় নয়। সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। তবে পরবর্তী ধাপের উপজেলা নির্বাচনগুলোতে ব্যাপকভাবে বিজয়ী হওয়ার আশা ব্যক্ত করে ১৪ দলের মুখপাত্র নাসিম আরও বলেন, নির্বাচন কেবল শুরু হয়েছে। আর প্রথম ধাপে যেসব উপজেলায় নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে বেশ কয়েকটিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান এমনিতেই খারাপ। এ কারণেই হয়তো বা আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা এই দফায় তুলনামূলক খারাপ ফল করেছেন। সবগুলো উপজেলা নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই আসলে বলা যাবে কে জিতেছে, কে হেরেছে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ টাইম নিউজবিডিকে জানান, মতে, উপজেলা নির্বাচন স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে কিংবা সরকার পরিবর্তনের বেলায় এর কোন প্রভাবই নেই। আবার এটি দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীকে না হওয়ায় এর মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তার ওঠানামার পরিমাপের সুযোগও নেই। সেই বিবেচনায় এই নির্বাচনের ফল নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে বর্তমান সরকারের সময় অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। প্রথম দফা উপজেলা নির্বাচনে এটাই প্রমাণ হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই সব নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করা সম্ভব। বৃহস্পতিবার দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে উপজেলা নির্বাচনের খারাপ ফলের বিষয়টিই মূল আলোচনায় পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও ধানমণ্ডির দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, এসব স্থানে সমবেত নেতাকর্মীরাও এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন। অবশ্য আগামী কয়েক দফায় অনুষ্ঠেয় উপজেলা নির্বাচনে ভাল ফল করার কর্মকৌশল নির্ধারণের তাগিদও ছিল অনেকের মধ্যেই। রাতে গণভবনে দলের কয়েকজন নেতাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে অল্পবিস্তুর আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, বুধবার অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ৯৭টিসহ উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা কাজ করছিল। বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের বর্জনের মুখে অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনকেই সরকারের জনপ্রিয়তা প্রমাণের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলেও সরকারের জনপ্রিয়তা বিষয়ে একটি ইতিবাচক ইমেজ প্রমাণের মাপকাঠি হিসেবে এই নির্বাচনকে বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরাই এই নির্বাচনে একক প্রার্থী নির্ধারণসহ বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজকর্ম চালিয়ে আসছিলেন। তবে বুধবারের প্রথম দফা নির্বাচনের ফল এক ধরনের ‘ধাক্কা’ই দিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। ভাল ফলের আশা থাকলেও এদিন অনুষ্ঠিত ৯৭ উপজেলার মধ্যে (একটির ফল স্থগিত) চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জিতেছেন মাত্র ৩৪টিতে। অন্যদিকে দলগতভাবে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জিতেছেন ৪৩টিতে এবং বিএনপির জোট শরিক জামায়াত প্রার্থীরা জিতেছেন আরও ১৩টিতে। এ হিসেবে প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনেই চেয়ারম্যান পদে বিএনপি জোটের চেয়ে ২২টি উপজেলায় পিছিয়ে রয়েছে ক্ষমতাসীন দল। ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদেও অনুরূপ খারাপ ফলাফল দেখা গেছে। আগামী কয়েক দফায় অনুষ্ঠেয় নির্বাচনগুলোতে এই পরাজয়ের ব্যবধান আরও বাড়ে কি-না- তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের অনেকেই বলছেন, দলের পক্ষে নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সব উপজেলায় সমঝোতার মাধ্যমে একক প্রার্থী নির্ধারণের মাধ্যমে সর্বাত্মক নির্বাচনী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দল থেকে বহিস্কার কিংবা বহিস্কারের হুমকি দিয়েও অনেক জায়গায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের বাগে আনা যায়নি। ক্ষমতাসীন দলের হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিজয়ী হয়ে আসার স্বপ্নে  ‘বিভোর’ অনেক স্থানীয় নেতাই শেষ পর্যন্ত দলসমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে অনঢ় ছিলেন। আবার দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের পাশাপাশি প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাও অনেকের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও নির্বাচনের মাঠে দলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বেশ কয়েকটি উপজেলায় জয়ের সম্ভাবনা সত্ত্বেও দলসমর্থিত প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত হেরেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, আবার বিএনপি-জামায়াতসহ ১৯ দলের বিপরীতে জোটবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে থাকার ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই অনেকটা পিছিয়ে ছিল। বিদ্রোহ ও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াত যেখানে প্রার্থী নির্ধারণের বেলায় পারস্পরিক সমঝোতার নীতি নিয়েছিল, সেখানে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে তারা কোন রকম জোটবদ্ধ তৎপরতা তো চালায়ইনি, উপরন্তু মিত্র ১৪ দলীয় জোট শরিকদের আলাদা নির্বাচনের কথাই সাফ জানিয়ে দিয়েছিল। ফলে কয়েকটি উপজেলায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোট শরিক দলগুলো সমর্থিত প্রার্থীরাও নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়ে যান। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ থেকে তাদের আরেক মিত্র জাতীয় পার্টি কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্য বাম দলগুলোর সঙ্গেও সমঝোতার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া স্থানীয়ভাবে দলীয় নেতা ও দল সমর্থিত প্রার্থীদের নেতিবাচক ‘ইমেজ’ ও তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের নানা অভিযোগও এই পরাজয়ের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে নেতাদের অভিমত। [b]ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর [/b]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *