বৃহস্পতিবার ৩০, জুন ২০২২
EN

ফারমার্স ব্যাংকে অর্থের যোগান: দ্বিমূখী অবস্থানে সরকার ও অর্থনীতিবিদরা

অনিয়মে জর্জরিত বেসরাকরি ফরমার্স ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়া থেকে উদ্ধার করতে আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি আর্থিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও তিন সরকারি ব্যাংক অর্থের যোগান দিবে।

অনিয়মে জর্জরিত বেসরাকরি ফরমার্স ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়া থেকে উদ্ধার করতে আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।  সরকারি আর্থিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও তিন সরকারি ব্যাংক অর্থের যোগান দিবে।  এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে দেশের অর্থনীতিবিদরা।  তাদের মতে, নাজুক একটি ব্যাংকের শেয়ার কেনা চরম ঝুকিপুর্ণ। অস্বচ্ছল একটি ব্যাংকের শেয়ার কিনলে লাভ তো দূরের কথা মুলধন ফিরে আসবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এই ব্যাংকের পিছনে জনগণের অর্থ ব্যায় করা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়।  বরং আইনের মাধ্যমে এটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে সরকারের ছাফাই অনুযায়ি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোনো ব্যাংক খারাপ অবস্থায় থাকা মানি এই না যে ব্যাংকটি কোনোদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।  বরং আর্থিক সহায়তা পেলে এবং পরিচালনা পর্ষদরা যদি আন্তরিকতার সাথে কাজ করে তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াবে ব্যাংকটি। এই বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আজ ব্যাংকটিকে ১১ শো কোটি টাকা দেয়ার ব্যাপার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে বৈঠক করবে অর্থের যোগানদাতারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে পরেছে। ব্যাংকটি আমানতকারিদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। নতুনকরে কেউ আমানত না রাখায় এবং আস্থাহীণতার কারণে আমানতকারিরা অর্থ তুলে নেওয়ায় এই অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। দেউলিয়া হওয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকটির হাল ধরছে সরকার। যেকোনো মূল্যে বাঁচিয়ে রাখতে চায় নীতিনির্ধারকরা। ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে এই বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। দুই দফা বৈঠকও হয়েছে। তবে ঠিক কি শর্তে অর্থের যোগান দেয়া হবে সেটি এখনো অস্পষ্ট। আজ বৈঠকে চুড়ান্ত হতে পারে অর্থ প্রাপ্তি ও শর্ত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ফারমার্স ব্যাংককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে মোট ১১ শো কোটি টাকার যোগান দিবে সরকার। এর মধ্যে সরকারি আর্থিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে (আইসিবিসি) ১ হাজার কোটি টাকার যোগান দিবে। বাক ১ শো কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় তিন ব্যাংক সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক দিবে। আইসিবিসি কি শর্তে অর্থের যোগান দিবে সে বিষয়ে সরকার বা আইসিবিসির পক্ষ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

তবে সোনালি, জনতা ও অগ্রনী ব্যাংক মালিকানা পাওয়ার শর্তে অর্থের যোগান দিতে আগ্রহী। তবে ফারমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মালিকানা না দিয়ে ভিন্ন শর্তে অর্থ নিতে চায়। আইসিসিবি মালিকানা পাবে কি না এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও তিন ব্যাংক মালিকানা পাওয়ার ব্যাপারে অনেকটা এগিয়ে। আজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের নেতৃত্বে বোর্ড মিটিংয়ে এই বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্যরিত ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচাতে সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করে অর্থনীতিবিদরা জানান, এমনিতেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। তারা আবার এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করায় সঙ্কট আরো বাড়তে পারে। বরং ব্যাংকটিকে ভিন্নভাবে সহায়তা করতে পারতো সরকার। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের থেকে ঋণ আদায় না করে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয় বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা এতাটাই নাজুক যে কোন্ বেসরকারি ব্যাংক এখানে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না। সেখানে সরকারি ব্যাংকগুলো শেয়ার কিনলে লাভ তো দূরের কথা মুলধন ফেরত আসবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। জনগণের সঞ্চিত অর্থ এমন একটা ব্যাংকের পিছনে খরচ করার আগে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করতে হবে।  এখানে বিনিয়োগ করলে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা সেটা নিয়ে আগে ভাবতে হবে।  যদি সরকারের চাপের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ করতেই হয় তাহলে সবার আগে ঠিক করতে হবে, এটা কিভাবে পরিচালিত হবে। কারা কারা বোর্ডে থাকবে এবং সদস্যদের কর্তৃত্ব কতটা থাকবে। একইসাথে লাভের বিষয়টাও খেয়াল করতে হবে কারণ টাকা আসছে সাধারণ জনগণের পকেট থেকে। তবে যে পন্থায়ই হোক না কোনো, এই ব্যাংকে নতুন করে কারো বিনিয়োগে চরম ঝুকি রয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম জানান, বেসরকারি যে ব্যাংকগুলো রয়েছে তাদের নিজেদের অবস্থাই খুব একটা ভালো না। সেই ব্যাংকগুলোই আবার এমন একটি ব্যাংকের শেয়ার কিনতে চাচ্ছে যেটার অবস্থা আরোও খারাপ। ফারমার্স ব্যাংকে বিনিয়োগে কোনো ডেভিডেন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে জনগণের টাকা এখানে বিনিয়োগ করা মোটেই সমর্থনযাগ্য না। এই ব্যাংক এখন এতটাই খারাপ অবস্থায় রয়েছে যে, এর শেয়ার কেউ আর কিনবে না। তাই সরকারি বা বেসরকারি কোনো ব্যাংক এই ব্যাংকের শেয়ার কিনলে সেটা লোকশান হবে বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, ব্যাংকটিকে ভিন্ন প্রক্রিয়ায়ও সহায়তা করা যেতো। এমনিতেই সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো না। তার উপর আবার এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করলে সেটা কতটা  সফল হবে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের উচিত ছিলো প্রথমে ব্যাংকটির ঋণ খেলাপিদেও থেকে টাকা আদায় করে তারল্য সঙ্কট দূর করা। এর মাধ্যমে সমাধান না হলে অন্য বেসরকারি কোনো ব্যাংকের সাথে যোগ করে দিতে পারতো। অথবা যারা নতুন ব্যাংক করতে চায় তাদেরকে এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে বলা। এই দুটি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে তখন সরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগ করা যেতো।

আবু আহমেদ জানান, যেহেতু সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি তিনটি ব্যাংক বিনিয়োগ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই তারা একটিমাত্র শর্তে এখানে বিনিয়োগ করতে পারে। সেটি হলো, মালিকানা পাওয়া। তাহলেই এখানে বিনিয়োগ লাভজনক হবে। কবাণ মালিকানা থাকায় বোর্ডে সদস্য ও কর্তৃত্ব দুটোই থাকবে। তবে ফারমার্স ব্যাংক যদি মালিকানা না দিতে চায় তাহলে শুধুমাত্র ঋণ হিসেবে এখানে অর্থ দিলে তা ফেরত আসা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সুতরাং মালিকানার বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না।

সোনালী ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, তারাও মালিকানা পাওয়ার ভিত্তিতেই এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে চায়। অন্যদেরও একই ইচ্ছা। তবে মালিকানা না পেলেও তারা বিনিয়োগ করবে কিনা সেটি নির্ভর করছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইচ্ছার উপর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ফারমার্স ব্যাংককে সহয়তার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে রয়েছে। এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও চেয়েছিলো সরকারি ব্যাংকগুলোকে না জড়াতে। কিন্তু সরকার যেহেতু সিদ্ধান্ত নিযেছে তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিকল্প ব্যবস্থা করতে যায়নি। প্রভাবশালি মহলের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনেকটা চাপও রয়েছে বলে জানান তিনি।

কেবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *