মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

বন্যায় বিপর্যস্ত টাঙ্গাইল, পানিতে তলিয়ে গেছে ৮০০ হেক্টর জমির ফসল

রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা টাঙ্গাইলে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন প্রায় ২ লাখ মানুষ।

রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা টাঙ্গাইলে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন প্রায় ২ লাখ মানুষ।

তবে এখন পর্যন্ত কোন ধরনের খাদ্য সহায়তা পৌঁছেনি বানভাসী মানুষের মাঝে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেয়া হলেও এখনও বিতরণ শুরু হয়নি।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ৯টি উপজেলাই বন্যাকবলিত।

পানির নিচে চলে যাচ্ছে আমন ও সবজি ক্ষেত। ভেসে যাচ্ছে পুকুরের মাছ। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এছাড়াও ঝিনাই নদীর পানি ৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৯২ সেন্টিমিটার এবং ধলেশ্বরী নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ও বংশাই নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও অন্যান্য নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

টাঙ্গাইলে পানিবন্দী ২ লাখ মানুষ

টাঙ্গাইলে ১২ উপজেলার মধ্যে ৯টি উপজেলাতেই বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল সদর, গোপালপুর, কালিহাতী, বাসাইল, মির্জাপুর, ঘাটাইল, নাগরপুর ও দেলদুয়ার।

এ সব এলাকার প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বানভাসী এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছে উঁচু বাঁধে। অনেকেই আবার মাচা তৈরি করে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। সমস্যা হচ্ছে পয়ঃনিষ্কাশনেও।

তবে এখন পর্যন্ত কোন ধরনের খাদ্য সহায়তা পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন বানভাসী মানুষ। এমনকি খোঁজ খবর নেয়নি কোন জনপ্রতিনিধিও।
জেলার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে।

অসময়ের বন্যায় বেশি ক্ষতি হয়েছে রোপা আমন ও সবজির। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বন্যায় ৭৫০ হেক্টর রোপা আমন ও ১০ হেক্টর জমির সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক আমন ও সবজি। টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবুল বাশার জানিয়েছেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ও বন্যা স্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুন বেড়ে যাবে।

৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন

বন্যার সঙ্গে টাঙ্গাইলে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। জেলার বাসাইল, টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, নাগরপুর, ভূঞাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে।

বর্ষার শুরু থেকে এ পর্যন্ত ভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার। নদীগর্ভে চলে গেছে শত শত একর ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বহু স্থাপনা।

ভাঙন অব্যাহত থাকায় হুমকিতে রয়েছে সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের পাছবেথইর এলাকার শহর রক্ষা বাঁধ।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে ৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন রয়েছে।

পানি নেমে গেলে ভাঙনের বিষয়টি সঠিকভাবে নিরূপণ করা যাবে। আর যেখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে সেখানে অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
ভেসে গেছে ৫ শতাধিক পুকুরের মাছ।

বন্যার পানির স্রোতে ও বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় ভেসে গেছে সহস্রাধিক পুকুরের মাছ। এতে মৎস্য চাষীদের ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।

ব্যাংক ও এনজিও থেকে লোন নিয়ে মাছ চাষ করেছিলেন অধিকাংশ মৎস্যচাষী। পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে এসব চাষিরা।
সুদ মওকুফ ও সরকারি সহযোগিতা না পেলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্রিজ ও রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

বন্যার পানির স্রোতে বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট ভেঙে গেছে। ধনবাড়ি উপজেলার পাইস্কা এলাকায় ব্রিজ ভেঙে নদীতে পড়ে যাওয়ায় ১০ গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এছাড়াও বাসাইল উপজেলার বিল পাড়া ও কাঞ্চনপুরে ব্রিজ ভেঙে গেছে। সড়ক উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। নৌকাই এখন তাদের একমাত্র ভরসা।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক কিলোমিটার পাকা, আধা পাকা ও কাঁচা রাস্তা।

শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি

জেলার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ভাঙন হুমকিতে রয়েছে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে না।

ফলে বন্ধই থেকে যাবে ক্লাস কার্যক্রম। আবার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার্তদের জন্য খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।

বন্যার বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনি বলেন, বন্যার্তদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ রয়েছে।

এ পর্যন্ত ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিতরণ ও ২০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

সিয়াম/এইচএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *