শুক্রবার ৩, ডিসেম্বর ২০২১
EN

বাবার মৃত্যুর একবছর

সময়ের ব্যবধানে কত কিছু বদলে যায়। ১৯৯৮ সালে এইচএসসি পাস করার আগ পর্যন্ত বাড়িতেই ছিলাম। সেই সময় পর্যন্ত আমাদের সাত ভাই-বোন, তিন ভাবী, দুই ভাবীর তিন সন্তান ও কাজের লোকসহ বিশাল যৌথ পরিবার। তখনও পাথরঘাটার মতো জায়গায় কারো ফ্রিজ ছিল না। বাবা প্রতিদিন বড় ঝুড়িতে করে বাজার করতেন। মা সকালে উঠেই পাটা-পুতা নিয়ে হলুদ, মরিচ, আদা, রসুন, পিয়াজ ও মশলা বাটা শুরু করতেন। এখনকার মতো গুড়া মশলা তখন ছিল না।

সময়ের ব্যবধানে কত কিছু বদলে যায়। ১৯৯৮ সালে এইচএসসি পাস করার আগ পর্যন্ত বাড়িতেই ছিলাম। সেই সময় পর্যন্ত আমাদের সাত ভাই-বোন, তিন ভাবী, দুই ভাবীর তিন সন্তান ও কাজের লোকসহ বিশাল যৌথ পরিবার। তখনও পাথরঘাটার মতো জায়গায় কারো ফ্রিজ ছিল না। বাবা প্রতিদিন বড় ঝুড়িতে করে বাজার করতেন। মা সকালে উঠেই পাটা-পুতা নিয়ে হলুদ, মরিচ, আদা, রসুন, পিয়াজ ও মশলা বাটা শুরু করতেন। এখনকার মতো গুড়া মশলা তখন ছিল না।

সাধারণত কাজের লোককে নিয়ে যে কোনো এক বড় ভাই বাজার করতেন। বিশেষ করে ছোট্ট ভাই আশরাফ কিংবা রাঙ্গাভাই এসমে বেশির ভাগ সময় বাজার করতেন। বড় ভাই হাই তার দোকানে কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আর মেজ ভাই কাইউম সেনাবাহিনীতে চাকুরির কারনে বাইরে থাকতেন। সেজভাই ঢাবিতে পড়াশুনা করতেন। আর আমার মাত্র দেড় বছরের বড় বোন নুপুর ও আমি সবচেয়ে স্বাধীনভাবে ইচ্ছেমতো সময় কাটাতাম।

সাত ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার ছোট হওয়ায় কখনোই বাজার করা কিংবা অন্য কোনো দায়িত্ব আমার ওপর পড়তো না।

রান্না করার সময় মাকে দেখতাম মাছ, কিংবা মাংসের টুকরা প্রত্যেকের নাম ধরে ধরে হিসাব করতো এবং দুই-তিন টুকরো অতিরিক্ত রাখতো তাৎক্ষণিক মেহমানের জন্য। এখনকার মতো তখন মোবাইল ছিল না যে মেহমান আসার আগে ফোন দিয়ে আসবে। মেহমানকে মানুষ বরকত হিসেবে ভাবতো। যদিও এই সময়ে কেউ কারো বাসায় ফোন না দিয়ে গেলে সেটাতে অনেকে বিরক্ত হন।

বাবার কাঠের স’মিল ছিল। তিনি সারাদিন সেখানেই থাকতেন। বেশিরভাগ রাতে সেখানেই ঘুমাতেন। সকালে হোটেলে নাস্তা করতেন। দুপুর ও রাতে বাসায় খেতে আসতেন। খাবার শেষে কিছু সময়ে গল্প করতেন। আমরা সবাই তার সামনে কিংবা পাশে জড়ো হয়ে বসে গল্প শুনতাম।

শুধু বাসাতেই নয় বাবার কাছে মজার মজার গল্প শোনার জন্য বাবার স’মিলের ওখানেও মানুষ আসতো। গল্প শুনতো আর নানান মশলা দিয়ে বাবার বানানো পান খেতো।

আমাদের পুরো মহল্লায় শুধুমাত্র আমাদের বাসায় একটা সাদাকালো টেলিভিশন ছিল। সেটা দেখার জন্য আশপাশের সব মানুষ জড়ো হতো। বিশেষ করে মাসের শেষ কিংবা প্রথম শুক্রবার বাংলা সিনেমা দেখার জন্য এত মানুষ আসতো যে ঘরে লোকে টইটম্বুর হয়ে যেতো।

বাবা এসে মাঝে মধ্যে টিভি দেখতো। এসে একেবারে সামনে টিভি সোজা বসতো। আমরা সবাই তার পেছন থেকে দুই পাশে সরে গিয়ে টিভি দেখতাম আর হাসতাম। কতই না মজার ছিল দিনগুলো।

মেজ ভাই বা সেজ ভাই যখন চিঠি পাঠাতো মাকে, সেই চিঠি পেয়ে মা যে কি পাগলামিটাই না করতো। কখনো আমাকে দিয়ে, আবার কখনো বোনকে দিয়ে আবার কখনো বা ছোট ফুপুকে দিয়ে সেই চিঠি পড়াতো বার বার। একই চিঠি যে কতবার পড়ে শুনতো মা তার হিসেব নেই।

বাবা খাবার জন্য বাসায় আসলে মায়ের ব্যস্ততার কোনো সীমা থাকতো না। খাবার টেবিলে পানি পড়ে আছে কি না, বাবার চেয়ার ও টেবিলের যেখানে বসবেন সেটা শুকনো আছে কিনা তা নিয়ে মা বেশ সতর্ক থাকতেন যাতে বাবার সামান্য কষ্ট না হয়।

প্রায় ৫ বছর অসুখে ভোগার পর ২০১৯ সালের ১৭ অক্টোবর বাবা মারা যান। অসুস্থ থাকা কালে যখনই বাড়ি যেতাম সারাক্ষণ গল্প করতেন। আমি তার হাত-পা টিপে দিতার আর তিনি গল্প করতেন। মাঝে মাঝে আমার হাতটা টেনে নিয়ে তাতে চুমা খেতেন। এখনো যেন বাবার সেই আদর লেগে আছে আমার হাতে।

আমার কখনো কল্পনায় মনে হতো না এমন একটা দিন আসবে যখন বাবা থাকবেন না। অথচ তাই হলো। দেখতে দেখতে একটা বছর কেটেও গেলো। শত ব্যস্ততার মাঝে তার কথা অনেক সময় মনেও থাকে না। কি নির্মম বাস্তবতা!

সন্দেহ নেই আমরাও সবাই এভাবে একদিন চলে যাবো। হয়তো কাছের লোকেরা কিছু দিন মনে রাখবে। তার পর সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

এখন মনে হয় দুনিয়ার জীবনটাই এমন। আমাদের সবার উচিত দুনিয়াকে নিয়ে বেশি স্বপ্ন না দেখা। মৃত্যুর পরের জীবনে যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয় জান্নাতে যেতে পারি সে লক্ষ্যেই আমাদের সবার কাজ করা উচিত।

চোখের সামনে এখনো দেখতে পাচ্ছি – বাবা সাইকেল চালিয়ে বাসায় আসলেন, আমি আবার সেই সাইকেল চালাচ্ছি। সেটা দেখে বাবা হেসে বলছেন- ওকে কে শেখালো সাইকেল চালানো? কত শত স্মৃতি আজ মনে পড়ছে। দোয়া করি আল্লাহ আমার বাবাকেসহ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়া শত-কোটি বাবাকে ক্ষমা করে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুক।

ফেসবুক স্ট্যাটাস: মো: কামরুজ্জামান বাবলু, তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদুলো’র বাংলাদেশ সংবাদদাতা, টাইমনিউজবিডি’র সাবেক প্ল্যানিং এডিটর ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি’র (ডিআরইউ) সদস্য।

মুস্তাঈন

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *