মঙ্গলবার ২৫, জানুয়ারী ২০২২
EN

বিশ্ব শরনার্থী দিবস ও বাংলাদেশ

বিশ্বে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যাযজ্ঞের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরনার্থী সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেদিক দিয়ে শরনার্থী শিবিরের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়।

বিশ্বে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যাযজ্ঞের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরনার্থীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। সেদিক দিয়ে শরনার্থী শিবিরের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। যাদের নেই কোন নিজস্ব পরিচয়, নেই ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা।

ইরাক ও জর্দানে সিরিয়ী শরনার্থী, সুদানে দারফুর শরনার্থী, কেনিয়ার দাদাব শরনার্থী, ফিলিপাইনে ভিয়েতনামী শরনার্থী, ভারতে শ্রীলঙ্কান তামিল শরনার্থী, ইরানে আফগান শরনার্থী, ইসরাইলে ফিলিস্তিনী শরনার্থীসহ অসংখ্য ছড়ানো ছিটানো শরনার্থীদের বাস পুরো দুনিয়া জুড়ে।

খুব বেশিদিন হয়নি শরনার্থীদের জন্য আলাদা করে কোন দিবসের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ২০০০ সালে জাতিসংষের সাধারণ অধিবেশনে মাত্র ৫৫/৭৬ ভোটে অনুমোদিত হয় আন্তর্জাতিক শরনার্থী দিবস।

বাংলাদেশে শরনার্থীদের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সমাজকাঠামোতে শরনার্থী অভিজ্ঞতা স্থায়ী ছাপ রেখে যাচ্ছে।

দেশ বিভাগের সময় বিহারি এবং পরবর্তীতে এই বর্তমান কালখন্ডে মায়ানমার থেকে বিতারিত রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়ে অবস্থান করছেন।

আর এর মধ্যবর্তী সময় মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে বাংলাদেশিদেরই শরনার্থী হয়ে আশ্রয় নেয়ার অভিজ্ঞতা তো রয়েছেই।

আমাদের সেই অভিজ্ঞতা যদি আমরা না ভুলি তবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটা গোটা জাতিগোষ্ঠির শতশত মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে কোন অবস্থাতে একটি বিদেশি রাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে যায়।

নিজ রাষ্ট্রের সুরক্ষা থেকে, নাগরিক অধিকার বঞ্চিত একদল মানুষ জীবনের হুমকি নিয়ে চরম অবমাননাকর অবস্থাতেই শরনার্থী বা দেশহীন (stateless) পরিচয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়ে থাকেন।

রাষ্ট্রের মধ্যে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির চাইতেও অধিক সংকটাপন্ন পরিস্থির শিকার রাষ্ট্রীয় অধিকারহীন শরনার্থীরা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মানবাধিকারের প্রশ্নটা তাই এই মানুষদের কেন্দ্র করেই বিশেষ ভাবেই দানা বেঁধেছে।

বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারিদের বলা হয় "আটকে পড়া পাকিস্তানি"। আটকে পড়া শরনার্থী হিসেবে বাংলাদেশে রয়েছে ৭ লাখেরও বেশি বিহারি।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে হাইকোর্টের এক রিটের প্রেক্ষাপটে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করে।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় তারা পাকিস্তানি হিসেবে এই ভূখন্ডে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পর তারা হয়ে পড়েন আটকে পড়া পাকিস্তানি।

পাকিস্তান তাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রসঙ্গটি তোলা থাক এখানে। বিষয়টি অনেক জটিল ও কূটনৈতিক প্রশ্নে আন্তর্জাতিক। স্বদিচ্ছার প্রসঙ্গটিও বিবেচনায় রাখা দরকার। বিহারিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তারা মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের বিরোধীতা করেছিলেন।

এই অভিযোগের দায় কাধে নিয়েই তারা "ক্যাম্প" নামের শরনার্থী শিবিরের ভেতরই চার দশক ধরে অবস্থান করছেন।

এসব ক্যাম্পেই কোন রকম রাষ্ট্রীয় অধিকার, সুবিধা, সুরক্ষা ছাড়াই চার দশকের এই জীবন।

সংকটে জীবন থেমে থাকে না বলেই বাংলাদেশের ক্যাম্প জীবনেও বিহারিদের তরুন একটি প্রজন্মের দেখা পাই- যাদের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পর। তাদের অধিকাংশই নিজেদের পাকিস্তানিও মনে করেন না।

রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে এরকম তরুণদের উদ্যোগে গঠিত হয়েছে ‘উর্দুভাষী যুবক পুর্নবাসন সংগ্রাম’।

তাদের মতে, সারা দেশে ১০০ টিরও বেশি ক্যাম্প রয়েছে বিহারিদের। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকে বলা হয় সবচেয়ে বড় বিহারি ক্যাম্প। এখানে বাস করেন ৩৫ হাজারের মতো বিহারি।

প্রায় ৬০ বিঘা জমির উপর বিস্তৃত এই জেনেভা ক্যাম্পে নেই বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, গ্যাসের সংযোগ, বিদ্যুতের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। টয়লেট স্বল্পতার কারণে প্রতিদিন সকালে নারী-পুরুষের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ক্যাম্পের বেশিরভাগ সদস্য। তারা সেলুনে চুলকাটা, খাবারের দোকান, কসাইয়ের কাজ, জরির কাজ, ইলেকট্রনিকসের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বৈধ কিংবা অবৈধভাবে গড়ে উঠা ক্যাম্পগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করেন শরনার্থীরা।

অন্যদিকে, মায়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনের চাপ সহ্য করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা জীবন রক্ষার্থে টেকনাফের নাফ নদী পাড় হয়ে চলে আসছেন চট্টগ্রামে।

মায়ানমার একমাত্র বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভের লক্ষ্যে গণহারে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নিধন করে চলছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়।

আন্তর্জাতিক শরনার্থী দিবসটি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাই বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। বিহারিদের পাকিস্তান ফিরিয়ে নেবে কিনা সে প্রশ্নের মিমাংসা করার জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার।

অন্যদিকে বিহারিরা আর যেতে চান কিনা অথবা তাদের মধ্যে যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশ তাদের নিয়েই বা আমাদের সিদ্ধান্ত কি হবে সেসবের কথাও জোড়েসোরে তোলা দরকার।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, তরুন বিহারিরা ইতিমধ্যেই আমাদের সমাজ কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করেছেন। সেলুনের যে বিহারি ছেলেটি গত ২০ বছর ধরে আমার আপনার চুল বিন্যাস করছেন, তিনি কি আপনার শত্রু!

অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে মায়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করা দরকার।

মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা সমাজে বহমান থাকার পর বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিতে উদাসীনতা দেখাতে পারে না সঙ্গত কারণেই।

বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এখনও চলছে। এক বছর ধরে মিয়ানমারে কয়েক দফায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন শূন্যের কোঠায়।

এ মুহূর্তে দেশের অভ্যন্তরে রয়েছে প্রায় দুই লাখ শরণার্থী। আর স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করা থেকে শুরু করে এসব শরণার্থী নিয়ে নানা সংকটে পড়েছে সরকার।

সীমান্তের কাটাতারের বেড়াতেই আটকে আছে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জীবন। গেল বছরের ৩ জুন থেকে শুরু হওয়া ৩ দফা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মিয়ানমারে ফেরার সম্ভাবনা গিয়ে ঠেকেছে শুন্যের কোটায়।

অন্যদিকে দাঙ্গার পর থেকে নানাপথে অনেক রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশে ভেতরে। এদের ফেরাতে গিয়েও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

জাতিসংঘের শরনার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ না হয়েও গত ২২ বছর রোহিঙ্গা শরনার্থীদের এ দেশে অবস্থানের ফলে নানা সামাজিক সংকট তৈরি হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এদিকে, শরনার্থীদের নিজদেশে ফেরত পাঠাতে আশাবাদি বাংলাদেশ সরকার। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর পাশাপাশি শরনার্থীদের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করছে বলে দাবি শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ফিরোজ সালাহ উদ্দিনের।

শরনাথীদের স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও রোহিঙ্গা শরনার্থী ইস্যুতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা স্পষ্ট করার দাবি সচেতন মহলের।

এসএইচ/ এআর

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *