মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

মাদকাসক্তির ভয়াবহতা

দেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তার ও ভয়াবহ মাদকাসক্তি আমাদের জাতীয় জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিভিন্ন সীমান্ত পথে নির্বিঘ্নে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ ঘটলেও সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বরাবরই উদাসীন। সঙ্গত কারণেই দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা বাড়ছে গাণিতিক হারে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ, ১৬ ভাগ নারী। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দেশ জুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দেশে মাদকাসক্তদের শতকরা ৯০ ভাগকে কিশোর-তরুণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের শতকরা ৪৫ ভাগ বেকার এবং ৬৫ ভাগ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট। আর উচ্চশিক্ষিত মাদকসেবির সংখ্যা ১৫ শতাংশ। যা সত্যিই উদ্বেগজনক।

দেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তার ও ভয়াবহ মাদকাসক্তি আমাদের জাতীয় জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিভিন্ন সীমান্ত পথে নির্বিঘ্নে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ ঘটলেও সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বরাবরই উদাসীন। সঙ্গত কারণেই দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা বাড়ছে গাণিতিক হারে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ, ১৬ ভাগ নারী। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দেশ জুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দেশে মাদকাসক্তদের শতকরা ৯০ ভাগকে কিশোর-তরুণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের শতকরা ৪৫ ভাগ বেকার এবং ৬৫ ভাগ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট। আর উচ্চশিক্ষিত মাদকসেবির সংখ্যা ১৫ শতাংশ। যা সত্যিই উদ্বেগজনক।

পরিসংখ্যান বলছে, মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকে। অন্যদিকে সারাদেশে প্রায় ৩০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় ২শ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদকাসক্তদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সিসা। সিসা অথবা হার্বাল তামাকের কারণে মানুষ উচ্চমাত্রার কার্বন মনোক্সাইডজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একবার সিসা সেবনে একটি সিগারেটের চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশি কার্বন মনোক্সাইড গ্রহণ করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী একজন মাদকাসক্ত তার নেশার পেছনে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫শ থেকে সর্বনিম্ন ৫০ টাকা খরচ করে। এই নেশার টাকার জোগান দিতে আসক্তরা বেছে নেয় খুন, ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির মত ঘৃণ্য ও অপরাধমূলক পথ। যা সামাজিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।

দেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ লাখ। কোন কোন সংস্থার মতে ৭০ লাখ। নব্বইয়ের দশকে এই সংখ্যা ছিল ১০ লাখেরও কম। মূলত বিড়ি-সিগারেট তথা ধূমপান থেকে নেশা করা শুরু হলেও মাদকের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে শুরু হয়। আর মাদকের অর্থ জোগাড় করতেই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে।

এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করে থাকে। একবার মাদকের নেশায় জাড়িয়ে পড়লে তা থেকে বেড়িয়ে আসা কারো পক্ষেই তেমন সহজসাধ্য হয় না। ফলে মাদক সেবীরা দিনে দিনে আরোও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে কিশোর অপরাধীদের ক্রমবর্ধমান দাপটের যে তথ্য সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে তার মূল কারণও মাদকাসক্তি। কিন্তু এসব প্রতিরোধে সরকার বা সংশ্লিষ্টদের কর্মতৎপরতা বা উদ্যোগ কাঙ্খিত পর্যায়ের নয়।

আশির দশকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেলে এই সমস্যা মোকাবেলায় মাদকের অপব্যবহার, পাচার রোধ ও ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ১৯৮৯ সালে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-১৯৮৯’ জারি করা হয়। ১৯৯০ সালে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০’ প্রণয়ন এবং ‘নারকটিকস এন্ড লিকার পরিদপ্তর’এর স্থলে একই বছর রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীনে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৯১ সালে এই অধিদপ্তরকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখাতে পারেনি বরং অতীতের তুলনায় দেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তার ও মাদকাসক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সম্প্রতিককালে মাদকদ্রব্য জব্দের পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, দেশে হেরোইন ও গাঁজার অপব্যবহার স্থিতিশীল রয়েছে। কোডিন মিশ্রিত ফেন্সিডিলের অপব্যবহার কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে। তবে মিথাইল এ্যামফিটামিন দ্বারা তৈরি ইয়াবার অপব্যবহার ও আটক বর্তমানে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশে ইয়াবাসহ মাদকাসক্তি অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরই উদাসীন থেকেছে। দেশে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ থাকলেও তা এখন রীতিমত ‘সাক্ষী গোপাল’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হচ্ছে মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ বন্ধ, মাদক ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সাথে বেকারদের কর্মসংস্থান ও স্কুল-কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা, মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান দান এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তেমন কোন সাফল্য নেই।

মাদক ও মাদকাসক্তি এখন আমাদের জাতীয় জীবনের অভিশাপ। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণেই প্রাণঘাতি এই অনুসঙ্গটি কোন ভাবেই নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এর বিস্তৃতি ঘটেছে বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২শ মিলিয়ন মানুষ মাদক গ্রহণের সাথে জড়িত। আর এই মরণ নেশার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামাজিক কাঠামোয়, আর্থ সামাজিক উন্নয়নে, ভারসাম্যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। আমারাও এই বৈশ্বিক সমস্যার বাইরে নয়। আমাদের দেশে মাদক উৎপাদন না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদকদ্রব্য অপব্যবহারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহার আর জনসচেতনতার অভাবে মাদক সমস্যা দিন দিন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

দেশে মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ ও মাদকাসক্তি রোধে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে বেশ তৎপর মনে হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক ক্ষেত্রে এই মরণ নেশা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। দেশের এলিট শ্রেণির একাংশও এ অভিযোগ থেকে মুক্ত নন। আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের ভার যাদের ওপর ন্যস্ত আছে ক্ষেত্র বিশেষে তাদের বিরুদ্ধেও মাদক বিস্তৃতিতে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে। মূলত বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার কারণেই সময়ের সাথে পাল্টে গেছে বাংলাদেশের মাদক গ্রহণের চালচিত্র।

শহর থেকে সর্বনাশা মাদক ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে উচ্চবিত্তের পাশাপাশি মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। মাদকের নেশায় আসক্ত হবার পেছনে অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে, বন্ধু-বান্ধবের কুসংসর্গ, অনাকাঙ্খিত কৌতূহল, মানসিক সমস্যা, অবসাদ, বিকারগ্রস্ততা, হতাশা, পারিবারিক অশান্তি, পরিবারে মাদকের ব্যবহার, মাদকদ্রব্যের, সহজলভ্যতা, বেকারত্ব ও সচেতনতার অভাব। মূলত মাদকদ্রব্যের বিস্তাররোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগে দুর্বলতাকেই মূলত দায়ি করা যেতে পারে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবনতাও এজন্য কম দায়ি নয়।

মাদক দ্রব্য সম্পর্কে আমাদের দেশে গণসচেতনতার অভাবও উপেক্ষা করার নয়। মূলত বিভিন্ন ধরণের মাদক ও এসবের কুপ্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানাশোনা খুবই কম। আসক্তি কিভাবে সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কেও জনগণের মধ্যে ধারণা খুব একটা নেই। তাই এ ব্যাপারে নতুন প্রজন্মকে মাদকের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব জাগিয়ে তোলা দরকার। এজন্য সরকার সহ যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের অতিমাত্রায় সতর্ক থাকতে হবে। পরিবারের কোন সদস্যের এমন কোন বদঅভ্যাস কাঙ্খিত নয় যা পরবর্তী প্রজন্ম অনুসরণ করে বিপথগামী হয়। নিজে যেমন স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে অন্যদেরকেও। তবেই একটি মাদকমুক্ত শান্তির সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তার একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাদকদ্রব্যের ছোট-বড় চালান আটক করার ঘটনা দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃত চিত্রের তুলনায় তা যৎসামান্যই। মাদক সেবন ও মাদকের ব্যবসা এখন নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থান-বস্তির ঝুপড়ি ঘরে নয় বরং এখন এর বিস্তৃতি ঘটেছে সর্বত্রই। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে যে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে মাদক সেবন ও ব্যবসা রয়েছে। জাতির অগামী দিনের ভবিষ্যত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে মাদকাসক্তি। যা কোন শুভ ইঙ্গিত বহন করে না।

প্রাপ্ত তথ্যে জ্ঞাত হওয়া গেছে, আমাদের দেশে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীরা বড় শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাদক পৌঁছে দেয়। এসব মাদক ব্যবসায়ীর সম্পর্ক রয়েছে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে। এমনকি এর সাথে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উপেক্ষা করার মত নয়। তাই সহজেই এসব সমাজবিরোধীরা মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারে। মাদকের অবৈধ ব্যবসার সাথে অবৈধ লেনদেন থাকার কারণে এর সাথে নানা মহলের অনৈতিক সম্পর্কও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে সরকার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও।

দেশে ভয়াবহ মাদকদ্রব্যেও বিস্তারে সমাজিক সচেতনতার অভাবও কম দায়ি নয়। সমাজে এক শ্রেণীর লোক আছেন, যারা অনেক অনৈতিক ব্যাপার দেখার পরও না দেখার ভান করেন। অথবা কেউ কেউ অহেতুক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নীরব ভূমিকা পালন করে থাকেন। ফলে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীরা অতি উৎসাহ নিয়ে এই অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সাহস পায়। ফলে পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক রীতিনীতি ও শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে। মা কর্তৃক মাদকাসক্ত ছেলে হত্যা, মেয়ে কর্তৃক মা-বাবাকে হত্যা, আরও অনেক অপ্রতীতিকর ও অনাকাঙ্খিত ঘটনা মাদকাসক্তির ফলশ্রুতি।

‘সমাজকে কলুষিত করা মাদক ব্যবসা ও সেবনকে কেবল আইন দিয়ে রোধ করা সম্ভব নয়’- সম্প্রতি এমনইটিই মন্তব্যটিই মন্তব্য করা হয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। অবশ্য প্রায়ই দেখা যায় মাদকদ্রব্য সহ মাদক ব্যবসায়ী আটক করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আদালতে চালান দেওয়ার পর, জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় জড়িয়ে পড়ে এই অনৈতিক ব্যবসার সাথে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মাদকের চালানের সঙ্গে যাদের আটক করা হয় তারা শুধুই বাহক মাত্র। যারা মূলহোতা তারা রয়ে যায় ধরাছোয়ার বাইরে। ফলে মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয় না বরং অপ্রতিরোধ্যই থাকে মাদকাশক্তি ও মাদক ব্যবসা। উল্লেখ্য, বর্তমান সময়ের আলোচিত নেশার ট্যাবলেট ইয়াবা যা উৎপাদিত হয় মিয়ানমার সীমান্তে। এই ট্যাবলেটটির বিপুল সংখ্যক ক্রেতা হচ্ছে ছাত্ররা। ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও চারিত্রিক অধপতন ঘটছে। অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের যুবশক্তি। যা জাতির গন্তব্যকেই অনিশ্চিত করে তুলেছে।

স্মরণ করা দরকার যে, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ বাংলাদেশের মাদক চোরাচালান এবং ব্যবসা নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে মাদক চোরাচালানের রুট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়ার বাজারে বিভিন্ন ধরনের মাদক নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ অঞ্চলের বন্দরগুলোর দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই চোরাচালানের রুট হিসেবে এ পথ পাচারকারীদের কাছে জনপ্রিয় ও নিরাপদ হয়ে উঠছে। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ এখন মাদক ও মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য।

এক অনাকাঙ্খিত বাস্তবতায় আমাদের দেশে মাদকসেবীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের উপর। অতিমাত্রায় মাদক সেবনের কারণে সেবনকারীর কিডনি, লিভার ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাদক সেবন সাময়িক যৌন উত্তেজনা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে যৌন ক্ষমতা নষ্টের অনুসঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া ইয়াবার কারণে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ক্রমবর্ধমান।

আমাদের দেশে যে মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য থেকেই স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এই আইনে ২০১৮ সালে সারাদেশে মোট মামলা হয়েছে ১,০৬,৫৩৬টি। এই মামলাগুলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং কোস্টগার্ডের অভিযোগ, আটক এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ভিত্তিতে করা হয়েছে। আর এ সংখ্যা ২০১৭ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধরা পড়ে তা বিক্রি হওয়া মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ। আর ৯০ শতাংশ মাদকই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইউএনওডিসি)-র মতে, বাংলাদেশে বছরে শুধু ইয়াবা ট্যাবলেটই বিক্রি হচ্ছে ৪০ কোটির মতো, প্রতিটির দাম দুইশ' টাকা হিসেবে যার বাজারমূল্য প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। ২০১৮ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ইয়াবার ব্যবহার ৮০ শতাংশ বেড়েছে।

আর ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। ২০১২ সালে মোট মাদকসেবীর মধ্যে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ২০১৭ সালে তা হয়েছে ৩১ দশমিক ৬১ শতাংশ। যা আমাদের দেশে ভয়াবহ মাদক বিস্তার কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

মূলত সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উদাসীনতা, আইনশৃঙ্খলাবাহীর পৌণপৌণিক ব্যর্থতা ও জনসচেতনতার অভাবেই আমাদের দেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তৃতি ও মাদকাসক্তদের দৌড়াত্ম্য ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফলে জাতি হিসেবে আমাদের গন্তব্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই এই সর্বনাশা প্রবনতা থেকে দেশ ও নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে মাদক ও মাদকাসক্তের বিরুদ্ধে শূণ্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় জাতি হিসেবে আমাদের পথ চলা নির্বিঘ্ন হবে না।

লেখক: ইবনে নূরুল হুদা 
inhuda71@gmail.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *