শুক্রবার ১, জুলাই ২০২২
EN

মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্ব বন্ধে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক শস্যগোলা ঋণ

মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম বন্ধে এবার সরকারের পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের আওতায় শস্যগোলা ঋণ নামে বিশেষ ঋণ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় কৃষক ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাবদ দেনা পরিশোধ করে তার শস্য দুই থেকে তিন মাস পর ন্যায্য মূল্যে সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে বিক্রয় করতে পারবে।

মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম বন্ধে এবার সরকারের পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের আওতায় শস্যগোলা ঋণ নামে বিশেষ ঋণ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় কৃষক ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাবদ দেনা পরিশোধ করে তার শস্য দুই থেকে তিন মাস পর ন্যায্য মূল্যে সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে বিক্রয় করতে পারবে।

প্রান্তিক কৃষকদের ফসল উৎপাদনের জন্য নানান খরচের একটা অংশ ফসল তোলার পরপরই পরিশোধ করতে হয়। তাই কৃষক ফসল তোলার সাথে সাথে সাধারণত স্বল্পমূল্যে ফসল বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মধ্যসত্ত্বভোগীরা অধিক মুনাফা করে। প্রান্তিক কৃষকদের এই সমস্যা সমাধানে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক শস্যগোলা ঋণ কর্মসূচি চালু করেছে।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকবর হোসেন জানান, বিশ্বব্যাপি করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এঅবস্থায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কৃষকদের উপর করোনভাইরাসের প্রভাব কমাতে এবং তাদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবছর ‘শস্যগোলা ঋণ কর্মসুচি গ্রহণ করে।

তিনি জানান, করোনার কারণে এবার হাওর অঞ্চলে ধানের দাম বেশ কমে গিয়েছিল। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় কমমূল্যে ধান বিক্রির হাত থেকে কৃষকদের বাঁচাতে ২৫ মণ ধানের সমমূল্য বাবদ ২০ হাজার টাকা করে ঋণ দিয়েছে, যা দুই থেকে তিন মাস পরে ধান বিক্রি করে মাত্র ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে পরিশোধ করা যাবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সদ্য চালু হওয়া এই ঋণ কর্মসূচি বিষয়ে বলেন, এই কর্মসুচি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ব হ্রাস এবং প্রান্তিক কৃষকদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পেতে সহায়তা করবে।

প্রকল্প কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, বর্তমানে এই ঋণ ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। তবে যে কেউ সমিতির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় আসতে পারবে। এই ঋণ কর্মসূচির ফলে প্রকল্পের সদস্যগণ আগের চেয়ে লাভবান হচ্ছেন এবং সিন্ডিকেটের হাত থেকে ফসলের বাজারও রক্ষা পাচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসেন জানান, চলমান স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইতোমধ্যেই ৩ হাজার ২শ’ সদস্যেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে এর ইতিবাচক প্রভাব উপলব্ধি করে সদস্যদের মধ্যে ব্যপক সাড়া পড়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার লকমা ও রতনশ্রী গ্রামের আমার বাড়ি আমার খামার সমিতির সদস্য গোলজাহান বেগম ও জিল্লুর রহমানের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা উভয়েই ২০ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়েছেন। জরুরি চাহিদা মিটে যাওয়ায় ধান কাটার মৌসুমেই তাড়াহুড়ো করে তাদের ধান বিক্রি করতে হয়নি।

উভয়ের বাড়িতেই বিক্রয়যোগ্য প্রায় ৪০ মণ করে ধান রয়েছে। এরমধ্যে ৩ মাস পরে ২৫ মণ ধান সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে দিতে পারলে ২৫-২৬ হাজার টাকা আসবে বলে তারা জানান। এই টাকা দিয়েই তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারবে।

গোলজাহান বেগম বলেন, এই ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা খুবই উপকৃত হয়েছি। আমাদের ঋণের সার্ভিস চার্জ বাবদ দিতে হবে মাত্র ২৫০ টাকা। গত একমাস আগে ধান তোলার সাথে সাথে ধান বিক্রি করলে মণ প্রতি দাম পাওয়া যেত মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কিন্তু মাত্র দুই মাস পর সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে এই ধান বিক্রি করলে দাম পাওয়া যাবে মণ প্রতি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা।

গোলজাহান বেগম ও জিল্লুর রহমান জানান, এ ঋণের মাধ্যমে তাদের অনেক উপকার হয়েছে। এ কর্মসূচি সব মৌসুমে চালু থাকলে তাদের মত প্রান্তিক কৃষকরা উপকৃত হবেন। তারা ভবিষ্যতে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বিশেষত: নারী উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসাই পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ব্যাংক দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে জামানতবিহীন ঋণ দিয়ে আসছে।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক অন্যান্য প্রচলিত ব্যাংক থেকে আলাদা। এই ব্যাংক সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে আয়বর্ধক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে সহায়তা এবং সঞ্চয় গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। এ ছাড়াও এ ব্যাংক সদস্যদের সঞ্চয় থেকে আবর্তিত ঋণ স্কিমের আওতায় তাদের ঋণ দেয়া হয়।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। যেসব ক্ষেত্রে এই ব্যাংক ঋণ দেয়, তা হলো গরু মোটাতাজাকরণ, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, গাভী পালন, কুটির শিল্প, মৎস্য চাষ, নার্সারী, কৃষিভিত্তিক-শিল্পের জন্য নানা পণ্য উৎপাদন, শাক-সবজি এবং মশলা উৎপাদন।

ঋণ গ্রহিতাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনার ওপর ঋণের পরিমাণ নির্ভর করে। তবে সাধারণভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সর্বাধিক ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা, মধ্যম উদ্যোক্তাদের ৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ টাকা এবং বিশেষ উদ্যোক্তাদের ৩ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা দেয়া হয়। এসব ঋণের সুদের হার ৮ শতাংশ। ঋণ নেয়া ছাড়াও সদস্যরা এ ব্যাংকের সঞ্চয় প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারেন। সঞ্চয় প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- সাধারণ সঞ্চয়, বিশেষ সঞ্চয়, সামাজিক সুরক্ষা সঞ্চয়, ছাত্র সঞ্চয়, মেয়াদি আমানত এবং গ্রামীণ পেনশন স্কিম।

ব্যাংক আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্যদের হাঁস-মুরগী পালন, মৎস চাষ, গবাদিপশু পালন, নার্সারী ও কৃষি খাতের বিভিন্ন আয়বর্ধক কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এছাড়াও তাদের উৎপাদিত পণ্য কার্যকরভাবে মজুত ও বিপণনের লক্ষ্যে গুদাম নির্মাণের জন্য ঋণ দিয়ে সদস্যদের সহায়তা করে। তথ্য সূত্র- বাসস

এমবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *