বুধবার ১৯, জানুয়ারী ২০২২
EN

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান : এরপর কী?

কয়েক দিন ধরে জল্পনা চলছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে পারে। জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে যখন এ আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয় তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে। কিন্তু নতুন সংসদ অধিবেশন বসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে।

কয়েক দিন ধরে জল্পনা চলছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে পারে। জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে যখন এ আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয় তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে। কিন্তু নতুন সংসদ অধিবেশন বসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী (তাতমাদো) দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ বলেছেন, এই এক বছরের মধ্যে নির্বাচন করে সেনাবাহিনী বিজয়ীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সেনা মনোনীত ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এখনকার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ইউ মিন্ট সুইয়ের উপস্থিতিতে নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের (এনডিএসসি) এক বৈঠককালে সেনাপ্রধান ‘সেন্ট-জেনার’ মিন অং হ্লাইং বলেন, ‘সেনাবাহিনী ২০০৮ সালের সংবিধানের বিধান অনুসরণ করবে আর বর্তমান ক্ষমতা গ্রহণ বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করে না।’

সামরিক নেতৃত্বাধীন সংস্কার প্রবর্তনের পরে গত ১০ বছরে দু’টি আধা বেসামরিক সরকার তাদের মেয়াদ সম্পন্ন করেছিল। নতুন নির্র্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশন সোমবার শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর কয়েক ঘণ্টা আগে স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট ইউ উইন মিন্ট, এনএলডির মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্য ও অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন মন্ত্রী এবং এনএলডির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির (সিইসি) সদস্যদের অনেককে আটক করা হয়।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ইউ মিন্ট সুই ২০০৮ সালের সংবিধানের ৪১৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে এক বছরের জন্য দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, সনদের ৪১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের আইনসভা, প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এই পদক্ষেপের পক্ষে ‘যুক্তি’ প্রদর্শন করে সেনাবাহিনী বলেছে, ৮ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের সাথে জড়িত ১০ মিলিয়নেরও বেশি অনিয়ম পাওয়া গেছে যা সমস্ত রাজ্য এবং অঞ্চলে সম্ভাব্য ভোটার জালিয়াতির সূচক হিসেবে কাজ করেছে। এই সংখ্যাটি নির্বাচনের যোগ্য ভোটারের ২৫ শতাংশেরও বেশি।

সেনাবাহিনী বলেছে, নির্বাচনী জালিয়াতির ব্যাপারে প্রতিকার করার ব্যাপারে সেনাবাহিনীর দাবির সমাধানে সরকার পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর এনএলডির নতুন সরকার গঠন এবং একটি নতুন সংসদ আহ্বান করার পদক্ষেপটি সংবিধানের ধারা ৪১৭ এবং ধারা ৪০ (সি)-এর অধীনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য হয়েছিল।

সেনাবাহিনী বলেছে, ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশন (ইউইসি) ভোটার তালিকার অনিয়মকে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সরকার সামরিক বাহিনীর দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সংবিধানেই জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়েছে।

এনএলডি মিয়ানমারে গত ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছে। এনএলডি প্রার্থীরা দেশব্যাপী ইউনিয়ন সংসদ এবং রাজ্য/আঞ্চলিক সংসদে নির্বাচিত এক হাজার ১১৭ আসনের মধ্যে ৯২০টিতে জিতেছে।

অভ্যুত্থানের পর এই বিজয়ের আর কোনো মূল্য কার্যত থাকল না। সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পরপর এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য রাজধানী নেইপিদো, বৃহত্তর নগরী ইয়াঙ্গুন ও সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সেনা অবস্থান ও প্রহরা বাড়ানো হয়। এর বিরুদ্ধে বড় কোনো প্রতিরোধের খবর এখনো পাওয়া যায়নি।

সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে তদানীন্তন জান্তা প্রণীত সংবিধানের আলোকে গণতন্ত্রের পদার্পণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার আপাত অবসান ঘটল। পাঁচ বছর আগে নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি সরকার গঠন করলে তখনো ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ বেশ খানিকটা সেনাবাহিনীর হাতে থেকে যায়। ২০০৮ সালের সেনাজান্তা প্রণীত সংবিধান অনুসারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সীমান্ত-বিষয়ক মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। দুইজন ভাইস প্রেসিডেন্টের একজন সেনাবাহিনী মনোনীত। এ ছাড়া সংসদে এক-চতুর্থাংশ সদস্য সেনাবাহিনীর মনোনীত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। অন্য দিকে সংবিধানের যেকোনো সংশোধনীর জন্য ৭৫ শতাংশ এমপির সমর্থন বাধ্যতামূলক করা হয়। এর মাধ্যমে কার্যত সেনা সম্মতি ছাড়া সংবিধান পরিবর্তন অসম্ভব করে রাখা হলো।

এই সংবিধানের আরেকটি বিধান হলো- কোনো নাগরিকের স্বামী-স্ত্রী বা সন্তান অন্য দেশের নাগরিক হলে তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। এ কারণে অং সান সু চি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পরও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। স্টেট কাউন্সিলর নামে একটি পদ প্রবর্তন করে তিনি সে পদ গ্রহণ করে সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সু চি চেয়েছিলেন নতুন মেয়াদে আরো বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি সংবিধান সংশোধন করে এ বিষয়টি রহিত করবেন।

সেনাবাহিনী কোনোভাবেই চাচ্ছিল না সংবিধানে রাষ্ট্রের ওপর সামরিক বাহিনীর যে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা রহিত হোক। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় উত্তেজনা দেখা দেয় সেনাপ্রধান এবং সু চির মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ৮৩ শতাংশ আসন নিয়ে বিজয় লাভের পরও সু চিকে দ্বিতীয় দফা সরকার গঠন করতে দিলো না সেনাবাহিনী।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভের জন্য নিষ্ফল আহ্বান জানান অং সান সু চি। এরপর আগের সরকারের নেতৃস্থানীয় সবাইকে গ্রেফতার করেছে সেনাবাহিনী। এ পর্যন্ত সু চির আহ্বানে বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভের খবর না পাওয়ার অর্থ হলো- রাষ্ট্রের ওপর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে, এমন কোনো সঙ্কেত নেই।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগে থেকে ধারণা করেছিল, মিয়ানমারে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে। বিষয়টি বাস্তবে ঘটার পর কেউ খুব একটা বিস্মিত হয়নি যদিও জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ সামরিক অভ্যুত্থানের নিন্দা করে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে এ ব্যাপারে বাধ্য করতে না পারলে তেমন কোনো পদক্ষেপ আশা করা যায় না। ক্ষমতা গ্রহণকারী সেনাবাহিনী প্রধান প্রাথমিকভাবে যেসব আদেশ-নিষেধ জারি করেছেন তাতে মনে হয়, জাল-জালিয়াতির অভিযোগ এনে সাম্প্রতিক নির্বাচন বাতিল ঘোষণার মধ্যে তার পদক্ষেপ সীমিত থাকবে না। এরপর অং সান সু চির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা এ ধরনের অভিযোগ এনে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য তাকে ‘অযোগ্য’ করা হতে পারে। বলা যায়, এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি আবার ১০ বছর আগের অবস্থানে ফিরে গেলেন।

২০০৮ সালের পরবর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতারা সু চিকে জোরালোভাবে সমর্থন দিয়ে জেলমুক্তি, নির্বাচনের সুযোগ দান, ক্ষমতায় যাওয়া বা সরকার গঠনে সহায়তা করেছিল। কিন্তু যে আশায় পশ্চিমা নেতারা সু চিকে এ সমর্থন যুগিয়ে এসেছিলেন তার সামান্যই তিনি বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন বলে মনে হয়। অর্থনৈতিক উদারীকরণসহ যে কিছু সংস্কার উদ্যোগ তার পূর্বসূরি নিয়েছিলেন সু চি তা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু সু চি রোহিঙ্গা ইস্যুতে একতরফাভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে সামরিক বাহিনীর আকাক্সক্ষা অনুসারেই ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি প্রথমবার সরকার গঠনের আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে চীন সফরে যান এবং সেখানে বেইজিংয়ের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে সমঝোতায় উপনীত হয়ে পরবর্তীতে সরকার চালিয়েছেন বলে মনে করা হয়। কিন্তু আগের মেয়াদের শেষ দিকে এসে ভারতের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে গিয়ে কিছু বিষয়ে বেইজিংয়ের বিরাগভাজন হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভবত শেষ দিকে তিনি পশ্চিমের পৃষ্ঠপোষক ও মিত্রদের স্বার্থরক্ষায় কিছু ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। আর তার ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে সেটি হয়ে থাকতে পারে সক্রিয় কারণ।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বেশির ভাগ সময় মিয়ানমারে সামরিকজান্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষমতায় ছিল। সু চির পাঁচ বছরসহ খুব বেশি সময় বেসামরিক ব্যক্তিরা ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারেননি। নতুন করে অভ্যুত্থানের পর দেশটি সেই পুরনো ধারায় ফিরে যেতে পারে যদিও মিয়ানমারের শাসন ব্যবস্থায় এর মধ্যে যেসব পরিবর্তন এসে গেছে তার সবটাই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সহজ হবে না।

সহজভাবেই ধারণা করা যায়, মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে চীন সর্বোতভাবে সমর্থন জানাতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় চীন কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথাই বলেছে। ভারতের মোদি সরকারও সামরিক সরকারের সাথে বিরোধে না জড়িয়ে নিজের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করতে পারে। অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানালেও উল্লেখ করেছে, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। রাশিয়া ও ইসরাইল আগের মতোই নতুন সরকারের সাথে সব সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে বলে মনে হয়। এর মধ্যে জাপান কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে পারে। সেখানে সু চির পক্ষে বিক্ষোভও হয়েছে।

এর মধ্যে সামরিক সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে কিছু বিষয়। বিশেষত, রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যে মামলা চলছে সেখানে সু চির বেসামরিক সরকার যেভাবে ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল সেভাবে পারবে না সামরিক সরকার। এটি বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার জন্য নতুন করে একটি চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে পশ্চিমা সরকারগুলো।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও একটি চাপ হিসেবে থাকবে মিয়ানমার সরকারের জন্য। ৪২ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সেটি দ্রুত আর অগ্রসর হবে বলে মনে হয় না। সু চি সরকারের সাথে যেভাবে বিষয়টি নিয়ে চীনা মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা সামনে অগ্রসর হবে বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য বাংলাদেশ এ ব্যাপারে ইতিবাচক প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষার ওপর চীনা প্রভাব কার্যকরভাবে বিদ্যমান না থাকলে ঢাকা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য কিছুটা চাপ তৈরির নীতিও বেছে নিতে পারে। সম্ভবত বিষয়টি সামনে রেখে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের আগে থেকেই রাখাইন রাজ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। আর সেই সাথে ক্ষমতা দখলের পর সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এ রাজ্যে।

ওয়াশিংটন এবং বেইজিং এই ইস্যুতে বিপরীত পক্ষ নিলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং মার্কিন-চীন শীতল যুদ্ধে এর প্রভাব পড়তে পারে। আর মিয়ানমার সঙ্কটের সঙ্ঘাতমুখর পরিণতি শুধু এই দেশটির জন্যই নয়, একই সাথে পুরো অঞ্চলের ওপর অস্থির প্রভাব ফেলতে পারে। এর সমাধানমুখী বিকল্প হলো- আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যে রূপান্তর গত ১০ বছরে মিয়ানমারে হয়েছে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কোনো একটি ফর্মুলা বের করা। মিয়ানমার থেকে চীনা প্রভাবকে মুছে দিয়ে অথবা দেশটিতে পাশ্চাত্য অংশগ্রহণে বাধা তৈরি করে এই সমাধান সম্ভব হবে না। গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে এ ক্ষেত্রে ১৯৯১ সালে কম্বোডিয়ার জন্য জাতিসঙ্ঘ যে মডেল অনুসরণ করেছিল, তেমন একটি ফর্মুলা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। কম্বোডিয়া ইস্যুটি বৈশ্বিক প্রভাবগুলোর ক্ষেত্রে আরো বিস্তৃত ছিল এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য অনেক অংশগ্রহণকারীর প্রয়োজন হবে না কম্বোডিয়ার মতো। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য আমেরিকা, চীন, বাংলাদেশ এবং ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণের সাথে ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্ককে যুক্ত করা যেতে পারে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, অং সান সু চি গণতন্ত্রের একটি ‘আইকন’ থেকে সেনাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করতে পারেন, এমন এক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে রূপান্তরিত হতে চেয়েছিলেন। এই কৌশলটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর ভয়াবহ অত্যাচারকে সমর্থন করা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে এ কাজের প্রতি সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে তার রেকর্ডটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্ষমাযোগ্য মনে করেন কি না, সংশয় রয়েছে। তবে পাশ্চাত্যের জন্য সু চির বিকল্প খুব একটা দেখা যায় না। মিয়ানমারে একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে সু চিকে বাদ দিয়ে কিছু করা সহজ হবে না। মনে রাখতে হবে, সেনাবাহিনী যত বিতর্কই সৃষ্টি করার চেষ্টা করুক না কেন, সু চি ও তার দল সব বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনে ৮৩ শতাংশ আসন লাভ করেছে। যেখানে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সরাসরি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে; সেখানে নির্বাচন কমিশনের এককভাবে ভোট জালিয়াতি করার অভিযোগকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিযোগের সাথেই তুলনা করা যায়।

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবও থাকবে। বহু বছর ধরে এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার সেনা অভ্যুত্থানপ্রবণ দেশগুলোতে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা দখল করতে দেখা যায়নি। মিসর ও সুদান এর ব্যতিক্রম। মধ্যপ্রাচ্যের এ দু’টি দেশে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে পাশ্চাত্যের নেপথ্য ইন্ধনে। মিয়ানমারে একই ঘটনা ঘটার পর এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষমতা দখল বা পরিবর্তনে একটি প্রবণতা হয়ে দাঁড়ায় কি না সেটি দেখার বিষয়।

mrkmmb@gmail.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *