মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

মীর জাফর ও বাঈজী বংশের নবাবগণ

১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে প্রহসনের যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব শহীদ সিরাজ উদ দৌলার পরাজয় ও মর্মান্তিক পরিণতির পর বাংলার স্বাধীনতার সূর্য্য অস্তমিত হয়। পুতুল নবাব হিসেবে বাংলার সিংহাসনে বিশ্বাস ঘাতক মীর জাফর আলী খানের অভিষেক ঘটে। শুরু হয় ইংরেজ ও এদেশীয় এজেন্টদের অপশাসন-দুঃশাসন। মূলত সিরাজ পরবর্তী বাংলা লুটেরাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। ইতিহাস পর্যালোচনায় ইংজেরদের লুন্ঠনের বিভৎস চিত্র ভেসে ওঠে। জানা যায়, ১৭৫৭ থেকে ১৭৮০ সাল পর্যন্ত মাত্র ২৩ বছরে বাংলা থেকে ইংল্যান্ডে পাচার হয় ৬০ কোটি টাকা। যা বর্তমান বাজারে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।

১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে প্রহসনের যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব শহীদ সিরাজ উদ দৌলার পরাজয় ও মর্মান্তিক পরিণতির পর বাংলার স্বাধীনতার সূর্য্য অস্তমিত হয়। পুতুল নবাব হিসেবে বাংলার সিংহাসনে বিশ্বাস ঘাতক মীর জাফর আলী খানের অভিষেক ঘটে। শুরু হয় ইংরেজ ও এদেশীয় এজেন্টদের অপশাসন-দুঃশাসন। মূলত সিরাজ পরবর্তী বাংলা লুটেরাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।  ইতিহাস পর্যালোচনায় ইংজেরদের লুন্ঠনের বিভৎস চিত্র ভেসে ওঠে। জানা যায়,  ১৭৫৭ থেকে ১৭৮০ সাল পর্যন্ত মাত্র ২৩ বছরে বাংলা থেকে ইংল্যান্ডে পাচার হয় ৬০ কোটি টাকা। যা বর্তমান বাজারে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।

এ ছাড়া বেহিসেবী হীরা, জহরত, স্বর্ণ, স্বর্ণের বার ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় দোসররা বাংলা থেকে লুন্ঠন করে। শুধুমাত্র নবাব সিরাজের  হীরাঝিল প্রাসাদ থেকেই ১ কোটি ৭৬ লাখ রৌপ্যমুদ্রা, ৩২ লাখ স্বর্ণমুদ্রা, দুই সিন্দুক অমুদ্রিত স্বর্ণপিন্ড, ৪ বাক্স হীরা জহরত, ২ বাক্স চুনীপান্না সহ অসংখ্য মহামূল্যবান জিনিষপত্র লুন্ঠন করা হয়। যার পরিণাম ছিল বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সমপরিমান।

মূলত বাংলার লুন্ঠিত অর্থেই ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। এক সময় তা পরিপূর্ণতাও পায়। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ উইলিয়াম ডিগবী (Sir William Digby) বলেছিলেন, ÔEngland's industrial supremacy owes its origin to the vast hoards of Bengal and the Karnatik being made available for her use....Before Plassey was fought and won, and before the stream of treasure began to flow to England, the industries of our country were at a very low ebb. ('Prosperous India: A Revelation,' p. 30.)

মূলত পলাশীপূর্ব বাংলার নবাবগণ ছিলেন সম্পূর্ণ রূপে বাংলা-বিহার-উরিষ্যার নওয়াবে নিজাম। মুঘল আমলে যারা সুবাহ বাংলার প্রাদেশিক শাসক ছিলেন। ১৭১৭ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত তারা সার্বভৌম বাংলার প্রধান হিসেবে এই অঞ্চল শাসন করেছেন। পদটি মুঘল আমলে পুরষানুক্রমিকভাবে নাজিম ও সুবেদার থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরবর্তিতে তারা সংশিষ্ট অঞ্চলসমূহে স্বাধীনভাবে শাসন করেছিলেন। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব শহীদ সিরাজদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফর কর্তৃক বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার হন এবং কথিত যুদ্ধে মীর নবাব  ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হন। বিশ্বাসঘাতকরতার ইনাম স্বরূপ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসায়। কিন্তু তিনি ছিলেন মূলত পুতুল নবাব। ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ছিল ইংরেজদের হাতেই।

সিরাজ পরবর্তী বাংলায় ১৭৬৫ সালে দ্বৈত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। কথিত নবাবগণ ব্রিটিশদের অধীনে শাসন করতেন এবং তারা ব্রিটিশদের হাতের পুতুল ছিলেন। ১৭৭২ সালে ধারাটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে শাসন ব্যবস্থা সরাসরি ব্রিটিশদের অধীনে নেওয়া হয়। ১৭৯৩ সালে নবাবদের কাছ থেকে নিজামত (গভর্নর) অধিকারও প্রত্যাহার করে নেয় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। তখন তাদেরকে ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র অবসরকালীন ভাতা দেওয়া হত। শাসনকাজে তাদের কোন অংশ গ্রহণ বা ক্ষমতা ছিল না।  বাংলার শেষ নবাব মনসুর আলী খান ১৮৮০ সালের ১লা নভেম্বর তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের জন্য ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করেন। আর এখানেই বাংলার নবাব পদটির অপমৃত্যু ঘটে।

মূলত মনসুর আলী খানের পদত্যাগের পর মুর্শিদাবাদের নবাব ও বাংলার নবাব পদটি মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর হিসেবে পরিচিতি পায়। যেহেতু ১৮৮০ সালে বাংলার নবাব উপাধিটি বিলুপ্ত হয়েছিল। সে সময় রাজস্ব আদায়ে তাদের খুবই কম বা অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব ছিল না বললেই চলে এবং তারা বল প্রয়োগ থেকেও বিরত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর রাজ্যসমূহের ভারত বা পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হওয়ার বাধ্যবাধাকতা ছিল। উল্লেখ্য যে, মুর্শিদাবাদ দু’দিনের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হয়েছিল।

কারণ এখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৭ই আগস্ট এটি ভারতের অঙ্গীভূত হয়। হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভারতের সাথে একত্রিত হওয়ার পর এসব রাজ্যসমূহের ক্ষমতা খর্ব হয়ে যায়। কারণ ভারত সরকার সকল রাজ্যসমূহের কর্তৃত্ব এক কেন্দ্রে কেন্দ্রিভূত করেছিল। ১৯৬৯ সালে শেষ নবাব ওয়ারিস আলী মির্জার মৃত্যুর সাথে সাথে নবাব উপাধিটিও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। যদিও তিনি তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে গিয়েছিলেন কিন্তু তার মৃত্যুর পূর্বে কোন উত্তরাধীকারী ঘোষণা না করে যাওয়ায় নবাব উপাধিটিও এখানেই সমাপ্তি ঘটে।

শহীদ নবাব সিরাজউদ্দৌলায় পরবর্তী সময়ে মীর জাফর সহ তার বংশধররা নবাবী পদ অলঙ্কৃত করলেও তারা ছিলেন নামমাত্র নবাব। ইংরেজরা তাদের হাতে কোন ক্ষমতায় দেয়নি বরং পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতার নজরানা স্বরূপ তাদের ভাগ্যে জুটেছিল প্রভূত পরিমাণ আর্থিক সুবিধা। বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে দেশের শাসনভার ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে তুলে দিয়ে সে অর্থে তারা শুধু ভোগবিলাসই করে গেছেন। বাংলা প্রায় ২’শ বছরের জন্য স্বাধীনতা হারিয়েছিল। বাংলার মানুষের ভাগ্যে নেমে এসেছিল অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা। জাতির গলায় পরাধীনতার জিঞ্জির তুলে দিয়ে মীর জাফর ও তার বংশের কথিত নবাবরা ইনাম হিসেবে যা পেয়েছিলেন তা দিয়ে তারা ইন্দ্রিয়বিলাসই করে গেছেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে জীবনকে উপভোগ করেছেন।  সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাদের পক্ষে ভাববার কোন সুযোগই ছিল না।

নবাব আলীবর্দী খানের বৈমাত্রেয় বোন শাহ খানমের গর্ভজাত এবং মীর জাফরের ঔরসজাত সন্তান মীর সাদেক আলী খান মিরনের বজ্রপাতে মৃত্যু হলে সুবে বাংলায় শুরু হয়-বাঈজী বংশের কথিত নবাবী। মিরনের মৃত্যুর কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েঠে। কারো কারো মতে ইংরেজরা তাকে হরিণ শিকারের কথা বলে গভীর অরণ্যে নিয়ে গিয়ে তাবুতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন বলে অপপ্রচার চালায়। ঘটনার ধারাবাহিকতায় এই দাবির পক্ষে প্রমাণও মিলে।

কারণ, মিরনের মৃত্যু হয়েছিল অগ্নিদগ্ধ হয়ে। দগ্ধ হওয়ার কারণে মৃতদেহ চেনার কোন উপায় ছিল না। মীর জাফর তখনও জীবিত ছিলেন। মিরনের লাশ এতই বিভৎস হয়েছিল যে, মীর জাফরকে সন্তানের লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। তিনি পুত্রশোকে বারবার মূর্চ্ছা যাচ্ছিলেন। যা ছিল মাত্র তিন বছর আগের ঘটনার পুনরাবৃদ্ধি মাত্র। কারণ, মাত্র তিন বছর আগেই নবাব সিরাজ জননী একইভাবে পুত্র শোকে মুর্চ্ছা  যাচ্ছিলেন।

১৭৬৫ সালে মীর জাফরের মৃত্যুর পর তার ঔরসজাত এবং বাঈজী মুন্নী বাঈয়ের গর্ভজাত নজমউদ্দৌলা (১৭৬৫-৬৬ খ্রিঃ)-কে কোম্পানী বাংলার নবাব বানায়। ঐতিহ্যবাহী বাংলায় শুরু হয় বাঈজী বংশের তথাকথিত নবাবী। বাঈজী বংশের দ্বিতীয় নবাব হন মুন্নী বাঈর অপর সন্তান সাইফউদ্দৌলা। বাঈজী বব্বু বাঈও ভাগ্যবতী রমণী ছিলেন। নবাব মাতা হতে তিনিও বাদ পড়েননি। সুবে বাংলায় পরবর্তী নবাব হন বব্বু বাঈর গর্ভজাত সন্তান মোবারক উদ্দৌলা (১৭৭১-৯৩)। মুন্নী বাঈয়ের চাইতে বব্বু বাঈ ভাগ্যবতী রমণী ছিলেন। কারণ, পরবর্তীতে তারই পুত্র ও পৌত্রগণ ধারাবাহিকভাবে বাংলার পুতুল নবাব হন। আর সে ধারাবাহিকতা ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আর এখন পর্যন্ত সে ধারাটিই বিশ্বাসঘাতকতার সুবিধাভোগী ও খেতাবধারী।

নবাব সিরাজের শাহাদাতের পর ইংরেজরা বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরকেই পুতুল নবাব বানিয়েছিল। কিন্তু তার হাতে কোন ক্ষমতায় ছিল না। ইংরেজরা সিরাজ পরবর্তী নবাবদেরকে শুধুমাত্র বার্ষিক ভাতা প্রদান করতো। আর এই ভাতা ছিল মীর জাফর তার বংশধরদের জন্য বিশ্বাসঘাতকতার ইনাম স্বরূপ। এছাড়া এসব পুতুল নবাবরা বাংলা ও বাংলার মানুষের জন্য কিছুই করেনি। সিরাজ পরবর্তী মীর জাফর ও তার বংশের কথিত নবাবদের তালিকা ও ভোগবিলাসের সময়কাল নিম্নরুপ-  

নবাব সিরাজকে ২ জুলাই গভীর রাতে নির্মমভাবে শহীদ করার পর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর আলী খানকে সিংহাসনে বসায়। প্রথম মেয়াদে মীর জাফরের নবাবীর মেয়াদ ছিল ১৭৫৭ থেকে ১৭৬০ পর্যন্ত। ১৭৬০ সালে ইংরেজরা মীর জাফরকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করে এবং তারই জামাতা  মীর কাসিম আলী খানকে সিংহাসনে বসায় ( ১৯৬০-১৭৬৩)। 

কিন্তু ইংরেজদের সাথে বনীবনা না হওয়ায় এবং যুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় ইংরেজরা ১৭৬৩ সালে আবারও মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসায় ( ১৭৬৩-১৭৬৫)। আত্মমর্যাদাহীন ও ক্লাইভের গর্দভ খ্যাত মীর জাফর এতে মোটেই আপত্তি করেন নি। ১৭৬৫ সালে মীর জাফরের মৃত্যু হলে মুন্নী বাঈয়ের পুত্র নাজিম উদ্দীন আলী খান ওরফে নজম উদ দৌলা (১৭৬৫-১৭৬৬৬)কে নবাব বানানো হয়।  ১৭৬৬ সালে তার মৃত্যু হলে মুন্নী বাঈয়ের আরেক পুত্র নাজাবুত আলী খান ওরফে সাইফ উদ দৌলা ( ১৭৬৬-১৭৭০) নবাব হন।

এরপর শুরু হয় বব্বু বাঈয়ের বংশধারার নবাবী। নজম উদ দৌলার মৃত্যুর পর বব্বু পুত্র আশরাফ আলী খান ওরফে মোবারক উদ দৌলা (১৭৭০-১৭৯৩) নবাবী পান। এরপর বাবর আলী খান ওরফে আজাদ উদ দৌলা ( ১৭৯৩-১৮১০),  জাইন উদ্দিন আলী খান ওরফে আলী জা (১৮১০-১৮২১), আহমেদ আলী খান ওরফে ওয়াল্লা জা, (১৮২১-১৮২৪),  মুবরক আলী খান ওরফে হুমায়ন জা (১৮২৪-১৮৩৮), মনসুর আলী খান ওরফে ফেরাদুন জা, (১৮৩৮-১৮৮১), হাসান আলী খান মীর্জা ওরফে আলী কাদির ( ১৮৮২-১৯০৬),ওয়াসিফ আলী খান ওরফে আমীর উল উমরা, ( ১৯০৬-১৯৫৯) এবং ওয়ারিশ আলী মির্জা ওরফে রেইস উদ দৌলা,  (১৯৫৯-১৯৬৯)। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ দাবি করেছেন যে, মীর জাফর পরবর্তী ২ নবাব তথা নজম উদ দৌলা ও সাইফ উদ দৌলাকে ইংরেজরাই বিষ প্রয়োগে হত্যা করে।

নবাব হুমায়ুন জাহ ছিলেন সুবে বাংলার শেষ নবাব। ১৮২৪ থেকে ৩৮ সাল পর্যন্ত নামকাওয়াস্তে বাংলার সিংহাসনে ছিলেন হুমায়ুন জাহ। অতঃপর কোম্পানী আর সমগ্র সুবে বাংলা নয়, শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদের নবাব নিয়োগ দিত। মুর্শিদাবাদের প্রথম নবাব ছিলেন ফারেদুন জাহ (১৮৩৮-৮১) এবং শেষ নবাব ছিলেন ওয়ারেস আলী মির্জা (১৯৫৯-৬৯)। ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে বৃটিশ বিদায় ভারত বিভক্তি এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি স্বাধীন দেশের জন্মলাভের পর সুবে বাংলা ও নবাবী অস্তিত্বহীন হলেও ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ভারত সরকার মীর জাফরের বংশধরকে নবাব মনোনয়ন ও ভাতা প্রদান করে। পাকিস্তান আমলে প্রজাস্বত্ব আইন নামে খ্যাত স্টেইট এ্যকুইজিমান এন্ড টেনেন্সী এক্ট পাসের ফলে তৎকালীন পূর্ব বঙ্গে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয় এবং ভূমিতে রায়ত-প্রজার স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জানা যায় নবাব ওয়াসিফ আলী থেকে এই বংশ মির্জা পদবী ধারণ করে।

সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইরাকের নাজাফি সৈয়দ মীর জাফর আলী খানের অধস্তন বংশধর নজমউদ্দৌলা থেকে ওয়ারেশ আলী মির্জা পর্যন্ত কেউ দেশ-জাতি ও মানব কল্যাণে কোন কাজ করেননি। বরং হালি হালি পত্নী, ডজন ডজন উপপত্নী এবং শত শত রক্ষিতা রেখে সুরা আর বাঈজী নিয়ে বুদ থেকেছেন। বৎসরান্তে বেহিসেবি সন্তানের পিতা হয়েছেন, বৎসরান্তে ইংরেজদের নিকট থেকে প্রভূত পরিমাণ ভাতা গ্রহণ করেছেন। এসব অকর্মন্য, অপদার্থ, চরিত্রহীন, মদ্যপ পুতুল নবাবদের কাজ ছিল মীর জাফরের বংশ বৃদ্ধি করা, ইংরেজদের মোহসাহেবী করা, বেতন ভাতা নেয়া। এসব পুতুল নবাবরা কোন ভাবেই ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন নি বরং দেশ ও জনগণের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতার পুরুস্কার হিসেবে ইংরেজরা তাদেরকে অনুগ্রহ করে কিছু ভাতা দিয়েছে। তা দিয়েই তারা শুধু ইন্দ্রিয়বিলাসের মাধ্যমেই জীবন কাটিয়েছেন। মূলত এসব নবাবদের জীবন ছিল অভিশপ্ত।

জানা যায়, মীর জাফরের বাঈজীপুত্র মুবারকউদ্দৌলার দশ জন স্ত্রীর গর্ভে বারো পুত্র, তেরো কন্যা সন্তান ছিলেন। নবাব ফারেদুন জাহর বহু বিবাহের ফল ও ফসল ষোল পুত্র, চৌত্রিশ কন্যা সন্তান। অর্ধশত সন্তানের পিতা হওয়া উপমহাদেশীয় শাসকদের মধ্যে একটি রেকর্ড বটে। অবস্থাদৃষ্টে সন্তান ও সন্ততির সংখ্যায় মনে হয় অপদার্থ এসব কথিত নবাবদের সন্তানের জন্ম দেয়া ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। বাঈজী বংশের কথিত নবাবগণ ছিলেন কোম্পানীর বেতনভুক কর্মচারী। নবাব নজমউদ্দৌলার বার্ষিক ভাতা ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ১৬১ টাকা হলেও পরবর্তী পর্যায়ে তাদের প্রভুরা বেতন ভাতা কমিয়ে দেয়। নবাব হাসান আলীর আমলে তা বার্ষিক মাত্র ২২ হাজার টাকায় নেমে আসে। ফলে বাঈজী বংশধারার পরবর্তী নবাবরা পরবর্তীতে হাস্যরসের পাত্রে পরিণত হন। কিন্তু আত্মসম্মানহীন এইসব কথিত নবাবরা বোধহয় তা উপলব্ধিই করতে পারেন নি।

নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়ে বাংলার মানুষের জীবন যাত্রা ছিল খুবই স্বচ্ছল ও উন্নমানের। কিন্তু সিরাজ পরবর্তী সময়ে বাংলার মানুষের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ও অস্বচ্ছলতা। কারণ, বেপরোয়া লুটপাটের কারণে সোনার বাংলা বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। পলাশীর যুদ্ধের মাত্র ১৩ বছর মাথায় ১৭৭০ সালে বাংলায় যে ভয়াবহ মন্বন্তর হয় তাতে বাংলা ও বিহারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। মূত এই দুর্ভিক্ষ ছিল কৃত্রিম। বাঙালী ব্যবসায়ীদের হাত থেকে সকল ব্যবসা-বাণিজ্য ইংরেজরা কেড়ে নেয়। মসলিন শিল্পিদের হত্যা করে ও তাদের আঙুল কেটে নেয়। তাতীদের তাত চালানো বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসে।

মূলত পলাশীর পরাজয়ের মাধ্যমে ভারত বর্ষে মুসলিম আধিপত্য খর্ব হতে শুরু করে। মুসলিম সমাজ তাদের অতীত গৌরব ও  ঐতিহ্য হারাতে বসে। শিক্ষা-দিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ঐতিহ্য-গবেষণায় মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে। এর ষোলকলা পূর্ণ হয় ১৭৯৯ সালে মহীশূরের নবাব টিপু সুলতানের পতনের মাধ্যমে। এতদবিষয়ে আরও স্বচ্ছ ধারণা পেতে হলে ইংরেজ লর্ড ম্যাকলে ১৮৩৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারী ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যে বক্তৃতা দিয়েছিলো সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

"I have traveled across the length and breadth of India and I have not seen one person who is a beggar, who is a thief. Such wealth I have seen in this country, such high moral values, people of such calibre, that I do not think we would ever conquer this country, unless we break the very backbone of this nation, which is her spiritual and cultural heritage, and, therefore, I propose that we replace her old and ancient education system, her culture, for if the Indians think that all that is foreign and English is good and greater than their own, they will lose their self-esteem, their native self-culture and they will become what we want them, a truly dominated nation." - Lord Macaulay)

লর্ড ম্যাকলে ভারতীয় উপমহাদেশের আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির ক্ষমতা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। বৃটিশ সরকার ম্যাকলের প্রস্তাবকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছিলো। এবং সেই অনুসারে পলিসিও তৈরী করে। ১৮৩৫ থেকে ১৯৪৭ এই সুদীর্ঘ ১১২ বছর ছিলো মূলত ঐ পলিসিরই বাস্তবায়নের যুগ। যার ফলে বাংলার উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া ইংরেজী ভাষার ব্যাপক প্রভাবে আমরা আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য, আদর্শ-আধ্যাত্মিকতা, এক কথায় স্বকীয়তা হারিয়েছি। পরাধীনতার বরণ করা ছাড়া আমাদের আর কোন গত্যন্তর ছিল না। নৈতিক মূল্যবোধ ও মনোবলের অভাবে আমরা মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াবার শক্তি অর্জন করতে পারিনি। সেই সুযোগে চলেছে আমাদের দেশে প্রচলিত পুরাতন শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য, আদর্শ-আধ্যাত্মিকতা ও মূল্যবোধের ধ্বংসযজ্ঞ। 

পলাশী যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা এবং নবাব সিরাজকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার কারণে ইতিহাসের পাতায় মীর জাফর খলনায়ক হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। তার বংশধরদেরও সেই গ্লানী নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। তবে মুর্শিদাবাদের নবাবী খেতাব ফিরে পাবার জন্য মীর জাফরের বংশধররা আদালতে যে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালাচ্ছিলেন সে লড়াইয়ে তারা বিজয়ী হয়েছেন। তারা ফিরে পাচ্ছেন নবাবী খেতাব। আসলে বিশ্বাস ঘাতকতার পুরস্কার হিসেবেই লর্ড ক্লাইভ মীরজাফরকে মুর্শিদাবাদের নবাবের আসনে বসিয়েছিলেন। সেই সময় বৃটিশ পার্লামেন্টে মীর জাফরের পরিবারকেই নবাবের স্বীকৃতি দিয়েছিল। আর ১৯৬৯ সালে কলকাতায় মারা গিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদেরর শেষ নবাব ওয়ারিশ আলি মীর্জা। এই সময়ই ভারত সরকার মুর্শিদাবাদের নবাবের উত্তরসুরী কে তা জানতে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল।

এর কিছুদিনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার হাজার দুয়ারিসহ মুর্শিদাবাদের নবাবের সব সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে নেয়। নবাবী খেতাবও হারান মীর জাফরের উত্তরসূরীরা। তবে খেতাব ফিরে পাবার জন্য মীর জাফরের উত্তরসুরিরা আদালতে লড়াই অব্যাহত রেখেছিলেন। সেই লড়াইয়ে ২০১৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাদের পক্ষেই রায় দিযেছে। মূলত বিশ্বাসঘাতকতার ইনামটা মীর জাফরের বংশধররা কড়ায়-গন্ডায় এখনও বুঝিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু সীমাহীন উপেক্ষার শিকার হচেছন শহীদ নবাব সিরাজের বংশধররা। রাষ্ট্র ও সমাজ তাদেরকে যথাযথভবে মূল্যায়ন ও  পৃষ্ঠপোষকতা করছে না। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের আত্মপরিচয় তুলে ধরার জন্যই শহীদ নবাব সিরাজের চেতনা ও মূল্যবোধের যেমন ব্যাপক প্রচার ও প্রসার হওয়া উচিত, ঠিক তেমনিভাবে তার বংশ বর্তমান বংশধরদেরও যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া জরুরি।

পলাশীর ষড়যন্ত্র ও নবাব সিরাজকে নির্মম এবং নিষ্ঠুরভাবে হত্যার পর মীর জাফর নবাব হয়েছিলেন বটে কিন্তু তা ছিল নামকাওয়াস্তে। মূলত সিরাজ পরবর্তী নবাবগণ ছিলেন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতের পুতুল। ইংরেজদের অধীনস্ত কর্মচারি বলতেও অত্যুক্তি হওয়ার কথা নয়। এসব কথিত নবাবদের বিত্ত-বৈভবের কোন কমতি ছিল না। আর এজন্য তারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়েছিল। নিজেদের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে সিরাজ পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকদের জিঘাংসা থেকে রেহাই পাননি নবাব পরিবারের পুরোনারীরা।

মীর জাফর ও তার সহযোগীরা যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ষড়যন্ত্র করেছিল তাদের সে উদ্দেশ্যও পুরোপুরি সফল হননি বরং তাদেরকে এজন্য করুণ প্রায়াশ্চিত্যও করতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। মীর জাফর সহ পশালীর ষড়যন্ত্রকারীদের অতি অল্প সময়ের মধ্যেই করুণ মৃত্যু ঘটেছিল। পুত্র মিরনকেও ইংরেজরা পুড়িয়ে হত্যা করেছিল বলে জানা যায়। মীর জাফর পরবর্তী নবাব নজম উদ দৌলা ও সাইফ উদ দৌলাকে ইংরেজরা বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিল বলে জনশ্রুতি আছে। মৃত্যুকালে তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৭ ও ২২ বছর। অতি অল্প সময়ের মধ্যে মীর জাফরের ৩ পুত্রের মর্মান্তিক বিবেকবান মানুষের জন্য অবশ্যই শিক্ষণীয়। কিন্তু শিক্ষা নেননি মীর জাফরের উত্তরসূরীরা। তারা এখনও বিশ্বাসঘাতকতার সুবিধাভোগী। 

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা-(smmjoy@gmail.com)

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)  

এমবি   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *