মঙ্গলবার ৭, ডিসেম্বর ২০২১
EN

সিকদার আবুল বাশার : বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষ

আমি যদি বলি সিকদার আবুল বাশারের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের তা হলে কিন্তু কথাটি সত্য বলে ধরে নেয়া যাবে না।

আমি যদি বলি সিকদার আবুল বাশারের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের তা হলে কিন্তু কথাটি সত্য বলে ধরে নেয়া যাবে না। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ২০০৬ সাল থেকে, অর্থাৎ গত প্রায় ৭/৮ বছরের। তাঁর ও আমার পরিচয়ের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন রাজশাহী শাহ মাখদুম কলেজের তৎকালীন উপাধ্যক্ষ অনুজপ্রতিম আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ড. তসিকুল ইসলাম রাজা। এ রাজা আমার অতি আপনজন এবং তাঁর ছাত্রজীবন থেকেই আমার অতি পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে আমার বাসায় রাজার আনাগোনা, সেই রাজশাহী থেকে ঢাকা অবধি যা এখনও বিদ্যমান। তিনি আমার বাসায় প্রায় আসতেন এবং লেখালেখির ব্যাপারে আমাকে উৎসাহ দিতেন।

ষাটের দশকে তৎকালীন 'The Pakistan Observer' এ মাঝে মধ্যে আমার লেখা ছাপা হতো, তার বেশির ভাগই ছিলো শিক্ষা বিষয়ক। তাছাড়াও আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বেশ কিছু পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছি এবং অসংখ্য পাঠ্যপুস্তক সম্পাদনা করেছি। সেইসব লেখার ধ্বংসাবশেষ এখানে সেখানে পড়ে ছিল।

তাছাড়াও বিভিন্ন ম্যাগাজিনে, পত্র-পত্রিকায়, স্মারক বা সংবর্ধনাগ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল আমার কিছু প্রবন্ধ। ড. রাজা সেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লেখাগুলোকে আমার কাছ থেকে অনেকটা জোর করে নিয়ে গেলেন গতিধারার স্বত্বাধিকারী সিকদার আবুল বাশারের কাছে। ড. রাজার সঙ্গে সিকদারের অতি অল্প সময়ের মধ্যেই হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল, যা ছিলো তাঁদের আদর্শগত কারণে। বাশারের কঠোর পরিশ্রম ও ঐকান্তিক চেষ্টায় মাত্র এক মাসের মধ্যে আমার প্রথম গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হলো ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।

বইটির শিরোনাম দেয়া হয়েছিল ‘শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ যার প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছিলেন সিকদার আবুল বাশার নিজেই। তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

এই গ্রন্থটিসহ বিভিন্ন লেখকের রচিত পাঁচটি গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল, রাজশাহীতে নানকিং রেস্টুরেন্টের দরবার হলে ২০০৭ সালের মার্চ মাসে। দেশে তখন জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, ফলে এই অনুষ্ঠানটি করতে কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি। এমন কি মাইক ব্যবহার করারও অনুমতি ছিল না।

আমার লেখা বইটি রিভিউ করেছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক ড. তপন বাগচী। তিনি এই বইটির উপর মূল্যবান বক্তব্য রেখে আমার মতো একজন অখ্যাত ও ক্ষুদ্র লেখককে ধন্য করেছিলেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিল, ড. তসিকুল ইসলাম রাজা। রাজশাহীর সেই প্রকাশনা উৎসবে আমার সঙ্গে প্রথম দেখা হলো সিকদার আবুল বাশারের সঙ্গে। দেখলাম হালকা পাতলা গড়নের ব্যক্তিটি, বয়স কেবল ৪০ পার হয়েছে। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। কথা প্রসঙ্গে আলাপ হলো এবং তখনই জানতে পারলাম যে বাশার এদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও দক্ষ প্রশাসক, আমার এককালের ‘বস’, পরম শ্রদ্ধাভাজন এম ফজলুর রহমান সাহেবের চাচাতো ভাই।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, স্যারের নামের সঙ্গে সিকদার নেই কেন? উত্তরে বাশার সাহেব বললেন, ‘তিনি কেন যেন সিকদার লিখতেন না।’। বলাবাহুল্য, আমার এই গ্রন্থটিতে এম. ফজলুর রহমানের জীবনী নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ ছিল।

খুলনার দৌলতপুর বিএল. কলেজ তখন বেসরকারি হলেও স্যার দীর্ঘদিন যাবৎ ডেপুটেশনে সেই কলেজের অধ্যক্ষের পদে নিয়োজিত ছিলেন। তিনিই আমাকে ঢাকা থেকে নিয়ে গিয়ে তাঁর কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষকের পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় আমার ইন্টারভিউ নেয়াতো দূরে থাক, আমাকে এই চাকরি জন্য আবেদন পর্যন্ত করতে হয়নি।

আমার দীর্ঘ চাকরিজীবনে অসংখ্য বসের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁদের মধ্যে সচিব আছেন, মন্ত্রী মহোদয়েরা আছেন, কিন্তু তাঁর মতো নীতিবান, আদর্শবাদী, বলিষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী কোনো মানুষকে পাইনি। যত বাধাবিপত্তি আসুক না কেন যেটি ভালো কাজ, ন্যায়সঙ্গত, সাধারণ মানুষের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে অথচ দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না তিনি তা করবেনই। কারও কোনো অন্যায়, বেআইনী, নীতিবিগর্হিত কাজে এবং অবিচারের কাছে কখনো মাথা নত করেন নি।

তিনি সবসময়ই সাধারণ মানুষের পাশে থাকতেন। সেই পরিবারেরই সন্তান সিকদার আবুুল বাশার। কাজেই বাশারের পারিবারিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভিত অত্যন্ত মজবুত। স্যারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কিছু গুণাবলী আমি বাশারের মধ্যে দেখতে পেয়েছি।

গত কয়েক বছর ধরে বাশারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ কিছু কমই ছিল। যদিও এর মধ্যে আমার বেশ কয়েকটি পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। পুস্তকগুলোর প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছিল গ্লোব লাইব্রেরি (প্রা.) লিমিটেড। এই লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী ছিলেন আমার অতি আপনজন এবং পরম আত্মীয় (আমার বেহাই) এসএম. হাবিবউল্লাহ সাহেব (বর্তমানে প্রয়াত)।

গত কয়েক বছর গতিধারা বেশ কিছু সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশ করেছে, যার বেশির ভাগ কপিই আমি পেয়েছি ড. রাজার মাধ্যমে। ড. তসিকুল ইসলাম রাজা সম্পাদিত সিকদারবাড়ির ইতিকথা গ্রন্থটি আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। এ পুস্তকটিতে সিকদারবাড়ির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিকড়ের কথা উঠে এসেছে, যা গবেষণার বিষয়। বাশার কেবল একজন প্রকাশকই নন, তিনি একজন গবেষক, লেখক এবং অঙ্কনশিল্পীও বটে। তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার অধিকাংশই গবেষণাধর্মী, জ্ঞান-বিজ্ঞান ভিত্তিক এবং মৌলিক।

রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও তিনি বেশকিছু পুস্তক রচনা করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঝালকাঠি জেলার ইতিহাস, দৈনন্দিন জ্ঞান-বিজ্ঞান, ছোটদের বিজ্ঞানকোষ, বিজ্ঞানের হাজারো প্রশ্ন, শত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা, প্রাণি জগতের কথা, নির্বাচিত বাণীচিরন্তনী, বিজ্ঞান জিজ্ঞাসা ইত্যাদি। তাঁর পুস্তকের সংখ্যা ৫০টির কম হবে না। এদিক থেকে তিনি একজন শিশু সাহিত্যিক এবং বিজ্ঞান লেখক। বিজ্ঞানের জটিল এবং মৌলিক চিন্তা-ভাবনাকে অতি সহজ ভাষায় এবং সহজভাবে প্রকাশ করেছেন।

১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাশারের বয়স ছিলো মাত্র ৫+। ৫ বছর বয়সে সবকিছু মনে না থাকলেও যা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন, পর্যবেক্ষণ করেছেন, শুনেছেন, তার সবকিছুই হৃদয়ে গেঁথে রেখেছেন। ঘটনাগুলো এতই বেশি মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক ছিল যে তা তাঁর স্মৃতিতে এখনও অম্লান। তখন থেকেই তাঁর সংকল্প ছিল যে, যেহেতু তিনি তাঁর শৈশবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেলেন না, কাজেই তিনি বড় হলে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে পুস্তক রচনা করবেন এবং তা নিজেই প্রকাশ করবেন। এ জন্যই বোধ করি তিনি লেখক হয়ে তাঁর ক্যারিয়ার আরম্ভ করলেও পরবর্তীকালে প্রকাশক হয়ে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন।

তিনি এদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। গতিধারার প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, লোকসাহিত্য, অভিধান, নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি। তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি প্রকাশনা পেশাকে টাকা রোজগারের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন নি। তিনি চেয়েছেন এদেশের মানুষ তাঁদের শেকড়কে জানুক, তাঁরা ভালো বই পড়–ক, নিজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করুক। চটুল গ্রন্থ রচনা করে কিংবা প্রকাশ করে তিনি রাতারাতি বিত্তবৈভবের মালিক হতে কোনোদিনই চাননি। তিনি সব সময়েই মনে করেন- ‘মানুষের জীবনে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে বেশি টাকার প্রয়োজন হয় না, টাকা একজন রেখে যায় আর একজন ভোগ করে। এই অর্থই অনর্থ এবং অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

বাশার সিকদারের জীবনদর্শনের সঙ্গে আমার জীবনদর্শনের কিছু মিল খুঁজে পাই, যা আমি পেয়েছিলাম উত্তরাধিকার সূত্রে আমার আব্বার কাছ থেকে। আমার আব্বা উচ্চশিক্ষিত না হলেও ছিলেন স্বশিক্ষিত এবং তাঁর চিন্তাধারা ছিল একটু ভিন্নধর্মী।

তিনি আমাদের সৎ উপদেশ দিতেন, যেমন ‘তোমরা সরকারি চাকরি করছ, কোনো কিছুতেই লোভ করবে না। জীবনের মান অনুযায়ী খেয়ে পরে বাঁচার জন্য খুব বেশি টাকা পয়সার প্রয়োজন হয় না। কত খাবে, আর কতইবা পড়বে। মাছ-ভাত, গোস্ত-ভাত, পোলাও-কোর্মা এর বেশি তো প্রয়োজন নেই। তবে অর্থের দিকে লোভ করবে কেন? আমার জীবনে আমি অনেক মানুষ দেখেছি, ন্যায়-অন্যায়ভাবে কামিয়ে টাকার পাহাড় গড়েছে। সেই টাকা তাদের কোনো কাজেই আসেনি। বরং পরের প্রজন্মের ছেলে মেয়েরো সব ধ্বংস হয়ে গেছে এবং নিজেও ধ্বংস হয়েছে। সমস্ত পরিবার পথে বসেছে। একটু চোখ মেলেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। তাই অবৈধভাবে এবং হারাম উপায়ে অর্জিত কোনো পয়সা-কড়ি যেন তোমাদের পকেটে স্থান না পায়। তোমাদের কাছে এটাই আমার আকুল আবেদন।’ এর চেয়ে মূল্যবান কথা আর কি হতে পারে। আমার আব্বা ষাট সত্তর বছর পূর্বেই যা বলে গেছেন বর্তমানে দেশের পরিস্থিতিতে আর অন্য কোনো প্রমাণ খোঁজার প্রয়োজন আছে কি?

সিকদার আবুল বাশার পুস্তক প্রকাশনাকে একটি ব্যবসা হিসেবে কোনোদিনই গ্রহণ করতে চান নি। এ সম্পর্কে অধ্যাপক ড. শিমুল মাহমুদ বলেছেন, প্রকাশনা শিল্পে বাজারব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মুনাফাখোরদের বিপরীতে বাশার সিকদার বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মকে সবকিছুর উর্ধ্বে তুলে ধরে যেভাবে এগিয়ে চলেছেন, বাংলাদেশের আর কোনো প্রকাশককে এমনটি করতে দেখা যায় না। অর্থাৎ আর সবার মতো ব্যবসা করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়।

উদ্দেশ্য সুচিন্তিত রূপরেখা প্রণয়ন করা এবং তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া। ফলে সঙ্গত কারনেই ব্যবসাদারদের স্থান নেই গতিধারাতে (দৈনিক বগুড়া, ১৯ নভেম্বর, ২০১৩)। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। পুস্তক প্রকাশনার ক্ষেত্রে তিনি লাভ লোকসানের হিসেব কোনোদিনই করেননি। বর্তমানে বেশির ভাগ প্রকাশককে দেখা যায় কোনো পাণ্ডুলিপি হাতে পেলেই তা নিয়ে গবেষণা আরম্ভ হয়ে যায় এবং লাভ লোকসানের হিসেব কষে তবেই মুদ্রণের কাজে হাত দেয়।

তাঁর জীবনদর্শন ও চিন্তা-ভাবনার সাথে আমার চিন্তা-ভাবনার বেশ কিছু মিল রয়েছে। যেমন তিনি মনে করেন একটি মানুষের তিনটি ভালো কাজ করা দরকার। প্রথম কাজ তাঁর যোগ্য সন্তান তৈরি করা, দ্বিতীয় কাজ একটি ভালো বই লিখে যাওয়া, তৃতীয় কাজ বৃক্ষরোপণ করতে হবে অন্তত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার যেখান থেকে মানুষ সেবা পেয়ে থাকে।

তাঁর প্রথম কাজটি সম্পর্কে কারও কোনো দ্বিমত নেই এবং ভিন্নমত থাকার কোনো অবকাশও নেই। প্রত্যেক দম্পতিই চান, তাঁদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে এদেশের যোগ্য নাগরিক হোক, দেশকে ভালোবাসতে শিখুক এবং মানবজাতির কল্যাণের জন্য আত্মনিয়োগ করুক। আমি ব্যক্তিগত জীবনে তাই করেছি। আমার চার পুত্র সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করে যথাযথ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছি।

আমার ছেলেরা আমার আদর্শেই মানুষ হয়ে এদেশের খেদমতে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। দ্বিতীয়ত তিনি যে ভালো বই লিখে যাওয়ার কথা বলেছেন, তার মতের সাথেও আমি একমত, যা বেশ দেরিতে হলেও আমি অনুধাবন করতে পেরেছি। সিকদার আবুল বাশার আমার অনেক আগে থেকেই সম্ভবত বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন। আমি গত ১০ বছরে বেশ কয়েকটি বই লিখে ফেলেছি। এর বেশির ভাগই আত্মজীবনীমূলক।

আমি আমার দীর্ঘ জীবনে যা দেখেছি, করেছি, শুনেছি এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করছি, সেগুলোকেই হাজার হাজার বাক্যে সন্নিবেশিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশের চেষ্টা করেছি। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধনের জন্য এই লেখাগুলো অতীব প্রয়োজন বলে মনে করি। এই লেখাগুলো বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে এবং তাদের সুস্থ জীবনবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস। কাজেই বাশার সাহেবের এই চিন্তাভাবনা একেবারে অমূলক নয়।

তিনি তৃতীয় যে ভালো কাজটির কথা বলেছেন তা হলো বৃক্ষরোপণ। বৃক্ষরোপণ বিষয়টি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বৃক্ষরোপণের আন্দোলন চলছে। বনায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনা হয়েছে এবং এদেশের বনায়ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার বাজেটও আছে। বৃক্ষরোপণ করা যে সোয়াবের কাজ, তা হাদিসেরও কথা। আমার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে হওয়ায় আমি আমবাগানের মধ্যেই বেড়ে উঠেছি। আমার আব্বা নিজহাতে আমগাছ রোপণ করতেন এবং তার পরিচর্যা করতেও কোনো ভুল হতো না। আমিও নিজে একজন বৃক্ষপ্রমিক। যেখানে যে অবস্থায় থেকেছি, বৃক্ষরোপণে অংশগ্রহণ করেছি।

এ জন্যই আমাদের বাড়ির আশেপাশে বৃক্ষের সমাহার লক্ষ্য করার মতো। ফলদ, বনজ, ভেষজ এই তিন রকম গাছই আমার খুব প্রিয়। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, গাছগুলো কেবলমাত্র নিজের জায়গা জমিতে রোপণ না করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার যেখানেই জায়গা পাওয়া যাবে সেখানেই গাছ লাগাতে হবে। এর মধ্য দিয়ে তিনি পরোক্ষভাবে সেবামূলক কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন এবং মানবজাতির ও অন্যান্য প্রাণীর মঙ্গলের কথাই চিন্তা করেছেন। তবে হ্যাঁ, গাছ লাগানো যতই সহজ হোক না কেন, একে যথাযথভাবে পরিচর্যা করে বড় করে তোলা তত সহজ ব্যাপার নয়। আমার ফুফু বলতেন, ‘গাছ মানুষ করা, আর নিজের সন্তান মানুষ করা একই কথা’। আমার ফুফু হয়তো জানতেন গাছেরও প্রাণ আছে, তার খাদ্যের প্রয়োজন, পুষ্টির প্রয়োজন আছে। তাদের কোনো রকমই অবহেলা করা চলবে না।

আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি সিকদার আবুল বাশার বাহুমুখী প্রতিভাধর একজন মানুষ। তাঁর চিন্তা ও কল্পনাশক্তি অত্যন্ত প্রখর, তা না থাকলে কোনো সৃজনশীল কাজ করা সম্ভব নয়। বাশার সিকদার একজন উঁচুমানের অঙ্কনশিল্পী যা তিনি সম্ভবত জন্মসূত্রেই পেয়েছেন।

বাল্যকাল থেকেই তাঁর হাতের কাজ খুবই ভালো ছিলো। ঘটনাচক্রে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট কলেজেও ভর্তি হয়েছিলেন এবং এদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, প্রচ্ছদ ও পুস্তক অলংকরণের বিশেষজ্ঞ আমার অতি স্নেহভাজন হাশেম খানের কাছেও অঙ্কনে তালিম নিয়েছিলেন। সেখানেও কোর্স শেষ করেন নি। অঙ্কনশিল্পে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তাঁর তুলির আঁচড়ে তাঁর প্রকাশিত অসংখ্য গ্রন্থের প্রচ্ছদ সুশোভিত হয়েছে। তিনি একজন উঁচুমানের চিত্রশিল্পী, যার ফলে ২০০১, ২০০২ ও ২০০৩ সালের পর পর তিনবার সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদশিল্পী নির্বাচিত হয়ে পুরষ্কৃত হয়েছিলেন। এখানেই তার শেষ নয়, অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২০০৮-এ সেরা মানের গ্রন্থ প্রকাশনার জন্য তিনি বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন, যা একটি বিরল ঘটনা এবং যা তাঁর প্রতিভারই সাক্ষর বহন করে।

এদেশের প্রথিতযশা প্রায় সকল গবেষক, লেখক ও সাহিত্যিকের রচিত বিভিন্ন সৃজনধর্মী গ্রন্থ প্রকাশ করে প্রকাশনার ক্ষেত্রে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, অথচ তিনি বিত্তবৈভবের মালিক কোনো দিনই হতে চান নি। চেয়েছেন ভালো কাজ, ভালো পুস্তক প্রকাশনা, যা তাঁর ভালো ও পরিচ্ছন্ন মনেরই সাক্ষর বহন করে। উভয় বাংলার লেখক ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কলকাতার সব্যসাচী লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (বর্তমানে প্রয়াত), শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, উপন্যাসিক আবুল বাশার, ভাস্কর মাধব ভট্টাচার্য, নাট্যকার শ্যামলেন্দু ব্যানার্জী প্রমুখ ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আলাপ-পরিচয় আছে। বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের লেখকের সঙ্গে তাঁর পরিচিতির দরুন তাঁর জীবনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

লেখক ও গবেষকদের মধ্যে রয়েছেন আমার শিক্ষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী, আবু রুশদ মতিনউদ্দিন, বন্ধুবর ড. ওয়াকিল আহমদ, ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ, ড. মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম। অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামন মিঞা, ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, সদ্য প্রয়াত, ড. শিমুল মাহমুদ, রাজিব আহমদের নাম বিষেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই তালিকায় বেশির ভাগ লেখকেরই রচনা প্রকাশ করে তিনি তাঁর প্রকাশনার ইতিহাসকে দীর্ঘ, তথ্যবহুল ও সমৃদ্ধ করেছেন।

পরিশেষে বলতে চাই সিকদার আবুল বাশারের সাফল্যের পেছনে দু’টি উপাদান কাজ করেছে, যার একটি হলো তাঁর মেধা, অন্যটি কঠোর পরিশ্রম। কেবল মেধা থাকলেই চলে না, মেধাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। মেধা কম বেশি সকলেরই আছে, কিন্তু তা অনুশীলন বা চর্চার অভাবে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ পায় না।

কারও মেধা থাকলেও হয়তো সুযোগ সুবিধার অভাবে তা কাজে লাগাতে পারেন না, কিংবা সাধারণ মেধা থাকলেও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কিছুটা হলেও জীবনে সার্থকতা আনা সম্ভব হয়। সিকদার আবুল বাশারের মধ্যে এই মেধা ও পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটার ফলেই তিনি এত কম বয়সে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন এবং প্রকাশনাজগতে বিশেষ করে সৃজনশীল প্রকাশনার ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি কঠোর পরিশ্রমী এবং একজন Self-made man।

একটি উন্নত মানের বই প্রকাশ করতে হলে যে কয়টি ধাপ পার হতে হয়, তিনি তার প্রতিটি স্তরে তদারকি করেন। তাঁর ভাই আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন মোহাম্মদ ফজলুর রহমানকে দেখেছি একই রকমের পরিশ্রমী। রাতে খুব কমই ঘুমাতেন, ৪ ঘণ্টার বেশি নয়। খুলনার দৌলতপুর বিএল. কলেজে থাকতে দেখেছি কাকডাকা ভোরে উঠে লাঠি হাতে সমস্ত কলেজ প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করছেন।

আমাদের বাসায় গিয়ে আমাদের পরিবারের ও সন্তানাদির খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। ছেলেদের হোস্টেলে গিয়ে তাঁদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন, তবেই না অধ্যক্ষ। আজকাল এসব কে করে? এই কঠোর পরিশ্রম এবং ষাটের দশকে তাঁর প্রতি যে অন্যায় অবিচার করা হয়েছিল তার ফলেই বোধকরি তাঁর হার্ট ড্যামেজ হয়ে গিয়েছিল। শেষরক্ষা হয়নি। লন্ডনে হার্টের অপারেশন করতে গিয়ে মাত্র ৫১ বছর বয়সে সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী, হাসি-খুশি এই মানুষটি বড় অকালে ও অসময়ে চলে গেলেন।

আমরা আশা করি এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে মিনতি করি সিকদার আবুল বাশার যেন দীর্ঘজীবন পান এবং আরও অসংখ্য সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশ করে প্রকাশনা জগতে একটি নক্ষত্র হয়ে বিরাজ করতে পারেন।

অধ্যাপক মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন : লেখক, গবেষক। অবসরপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।

 

ওএফ


 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *