মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

সংক্ষিপ্ত সিলেবাস শিক্ষার সর্বনাশ

চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রস্তুত করা হয়েছে। গত ০৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সিলেবাসের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেটি যাচাই বাছাই করে অনুমোদন দিলেই সেটি শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবারের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে উভয় স্তরে প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে বলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে।

চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রস্তুত করা হয়েছে। গত ০৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সিলেবাসের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেটি যাচাই বাছাই করে অনুমোদন দিলেই সেটি শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবারের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে উভয় স্তরে প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে বলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে।

গত ২৭ জানুয়ারি এনসিটিবিতে কারিকুলাম বিশেষজ্ঞদের সাথে বৈঠক করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। ৬০ দিন এসএসসির এবং এইচএসসির ৮৪ দিনের সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করার নির্দেশ দেয়া হয়। বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছে, ৯ মে এসএসসির এবং ১৫ জুন এইচএসসির সব ক্লাস শেষ করতে হবে। জুনে এসএসসি এবং জুলাই বা আগস্টে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে যতটুকু পড়ানো যাবে, সে রকম সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তৈরি করা হবে। শিক্ষামন্ত্রীর এমন নির্দেশনার পর এসএসসি-এইচএসসির প্রতিটির দুই দিন করে ওয়ার্কশপ করে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের কাজ শেষ করেছেন এনসিটিবির বিশেষজ্ঞরা। এর আগে গড়ে ২৫-৩০ শতাংশ সিলেবাস কমানো হলেও এবার প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিটিবির চেয়ার অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক এসএসসি ও এইচএসসির সংক্ষিপ্ত সিলেবাস নিয়ে আবার প্রস্তাব করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২৫ জানুায়রি এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সিলেবাস কমিয়ে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এই সিলেবাস তিন মাসে শেষ করা সম্ভব নয়- দাবি করেছিলেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এরপর শিক্ষামন্ত্রী সেই সিলেবাস আরো সংক্ষিপ্ত করে নির্দিষ্ট ক্লাসও উল্লেখ করে দেন।

অর্থনীতিতে উপযোগের ‘ক্রমহ্রাসমান বিধি’ নামে একটি তত্ত্ব পড়েছিলাম। এই তত্ত্ব অনুযায়ী একটি দ্রব্যের চাহিদা ক্রমেই কমতে থাকে। যেমন ধরুন, আপনাকে রসগোল্লা খেতে বলা হলো। একসাথে ১০টি রসগোল্লা খেয়ে ফেললেন। পরে আরো ১০টি আনা হলো। আপনি আটটি খেলেন। তৃতীয় পর্যায়ে আরো পাঁচটি রসগোল্লা আনা হলো। আপনি অনুরোধে ‘ঢেঁকি গিললেন’। হয়তো বা তিনটি রসগোল্লা খেয়ে ফেললেন। এরপর আবারো আপনাকে অনুরোধ করা হলো। আপনি কোনোক্রমেই রসগোল্লার মতো রসালো জিনিস আর খেতে চাইবেন না। তার মানে হলো, রসগোল্লা খাওয়ার স্বাদ ও সাধ্য- দুটোই অতিক্রম করে ফেলেছেন আপনি। এরপর রসগোল্লা খেতে জোর করলে আপনি হয়তো বমি করে দেবেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তথা সিলেবাসের সাথে এই তত্ত্বকথার অপূর্ব মিল লক্ষ করা যায়। এটি সবাই জানি ও বুঝি। বাংলাদেশে প্রতিটি শ্রেণীতে যে সিলেবাস দেয়া হয় তার বেশ কিছুটা অংশ বাকি থেকে যায়।

আগের দিনে বিদ্যা অর্জনের জন্য, লেখাপড়া শেখার জন্য পড়াশোনা হতো। এখন আর তা নেই। এখন লেখাপড়া হয় জিপিএ পাওয়ার প্রতিযোগিতার জন্য। সার্টিফিকেট গ্রহণই প্রধান উদ্দেশ্য, বিদ্যা অর্জন নয়। জিপিএ এর লক্ষ্য অর্জনের জন্য নতুন টেকনোলজি বেরিয়েছে। তার নাম ‘গাইড বুক’। অনেক ছাত্রছাত্রীর সাথে কথা বলে দেখেছি, তারা মূল পাঠ্যবইয়ের ছবিও দেখেনি। বিশেষভাবে এসএসসি ও এইচএসসির ক্ষেত্রে কথাটি নির্মম সত্য। শিক্ষাব্যবস্থায় এমন সব কায়দা-কানুন ঢুকানো হয়েছে, যেগুলো আমাদের ছাত্রজীবনে কখনো দেখিনি। এখন পাশ্চাত্যের অনুকরণে, অনুসরণে সিলেবাস প্রণীত হয়। তাদের সাথে সমকক্ষতা এবং প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় বাংলাদেশের অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেমেয়েরা। এসব করা হয় পাশ্চাত্যেরই অনুদানে। তাদের টাকা না হলে আমাদের চলে না। তাদের মতো না হলে আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে উত্তরণ ঘটাতে পারি না।

সুতরাং বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাস ঐতিহ্য, শিক্ষার্থীর মন ও মনন এবং আর্থসামাজিক ব্যবস্থার চিন্তা না করে নটের মতো নবীশ হতে চাই আমরা। এর ফলে একটি কৃত্রিম ও দুর্বোধ্য শিক্ষাব্যবস্থার আবর্তে পড়ে গেছে এ জাতি। আমি একদিন ক্লাস ফাইভের ইংরেজি বইটি দেখলাম। সেখানে বিষয়বস্তু যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তার জন্য ওই ছেলের পূর্ব জনমে অথবা এর আগে এসএসসি পাস হতে হবে। ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়া’ হয়েছে। বিগত ৫০ বছরে অনুসৃত শিক্ষাব্যবস্থায় দেশজ তথা একান্তই আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ করা হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে তথাকথিত সৃজনশীল প্রশ্নমালার উল্লেখ করা যেতে পারে। পত্রিকায় প্রতিবেদন এসেছে ওই সৃজনশীল বিষয়টি শিক্ষকরাও বোঝেন না। তা হলে কী ধরনের সর্বনাশ ঘটানো হচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়। ক্ষমতাসীন সরকার প্রকৃত শিক্ষার চেয়ে পরিসংখ্যানে বেশি বিশ্বাস করে। বিগত ১২ বছরে পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা যাবে যে, শিক্ষার শনৈঃশনৈ উন্নতি হয়েছে। খাতায় যাই লেখা থাকুক না কেন শিক্ষার্থীকে পাস করাতেই হবে। এ ধরনের নির্দেশনার সাথে এরই মধ্যে আমরা পরিচিত হয়েছি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় বিগত বছরগুলোতে পাসের পরিসংখ্যান লক্ষ করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। এ সরকার অতীতে যা ছিল সেটুকুরও সর্বনাশ সাধন করেছে। সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত তিনটি পরীক্ষার আয়োজন করে শিক্ষাকে লেখাপড়ামুখী না করে সার্টিফিকেটমুখী করে তোলা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো লেখাপড়ার কেন্দ্র না হয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এত কুফল সত্ত্বেও এখনো এই সর্বনাশা এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

শিক্ষার এতটাই ‘উন্নয়ন’ হয়েছে যে, প্রাইমারি স্কুলেও নকল ঢুকেছে। আর মহান শিক্ষক ও মহান অভিভাবকরাও নকল সরবরাহে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করছে, ‘যদি হয় প্রশ্ন ফাঁস-পড়ব কেন বারো মাস?’ করোনাকালীন সময়ের অজুহাত দিয়ে এসএসসি ও এইচএসসির সিলেবাস যেভাবে ক্রমেই কমিয়ে আনা হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের ১২ মাস না পড়ার দাবির সম্পূরক। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, আগে শিক্ষার্থীরা এ দাবি করেছে, এখন শিক্ষামন্ত্রী স্বয়ং সিলেবাস কমাতে কমাতে ২৫-৩০ শতাংশে নেমে এসেছেন। যে দেশে আদৌ কোনো সময়ই কোনো কালেও সব স্কুলে সিলেবাস শেষ হয় না সে দেশে পদ্ধতিগতভাবে সিলেবাস কমিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করা না পড়ানোরই শামিল। করোনাকালীন একটি পর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনলাইন ক্লাসের নির্দেশনা দিয়েছিল।

বলা হয়েছিল, মহা সমারোহে অনলাইন ক্লাস চলছে। তা হলে তারা এত দিন কী পড়ালেন? আজকাল ছেলেপেলেরা বেশ উইটি। এক ছেলে শিক্ষককে বলছে- যেভাবে সরকার পাস করে সেভাবেই আমরা পাস করব। জানা গেছে, দু-একটি উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার্থীরা অটো পাসের দাবি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। আমাদের সদাশয় সরকার ছাত্রদেরকে সেই পথ বাতলে দিয়েছে। তারা বিগত এইচএসসি পরীক্ষায় অটো পাস দিয়ে সর্বনাশের সূত্রপাত করেছে। আগামী এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা যদি রাস্তায় নামে, আন্দোলন জোরালো করতে পারে তা হলে সরকার কী করবে? আমার তো মনে হয়, শিক্ষামন্ত্রী যেভাবে সিলেবাস কমিয়ে এনেছেন ক্রমেই- শতভাগ থেকে ৫০, ৫০ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থনীতির সেই ক্রমহ্রাসমান উপযোগ বিধি অনুযায়ী অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী শূন্যের কোঠায় পৌঁছবেন।

তার কারণ, এ সরকার ক্ষমতায় থাকাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। নির্বাচন নিয়ে তারা যে নমুনা দেখিয়েছেন তা বিশ্ব রেকর্ড করার মতো। দায়িত্বশীল সরকার বলতে যা বোঝায়, তারা তা নন। সুশাসনের যে নীতিমালা আমরা জানি- সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা- তা একেবারেই উবে গেছে। সরকার জাতির শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে ছাত্রদের খুশি করার তালে আছে। অবশ্য এ রেকর্ড নতুন নয়।

১৯৭১ সালে লাখো মানুষের রক্ত, শ্রম ও কষ্টের বিনিময়ে যখন স্বাধীনতা অর্জিত হলো তখন দরকার ছিল সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা। তা না করে শিখানো হলে স্বার্থসিদ্ধির নীতিমালা। দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করলেন, যেহেতু গোটা জাতি ৯ মাস যুদ্ধ করেছে সেহেতু এই সময়কালকে স্যাক্রিফাইস করে সব শিক্ষার্থী নতুন করে জীবন শুরু করবে। কিন্তু যাদের রক্তে-মাংসে স্বার্থপরতা, লোভ-লালসা তাদের এ প্রস্তাব যুৎসই মনে হয়নি। তারা যা করেছেন তা নকলকে জাতীয়করণের মতো। সে ইতিহাস জাতির কপালে চিরকালই কলঙ্কময় তিলক হয়ে থাকবে। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, শিক্ষকদের যেখানে প্রতিবাদের কথা সেখানে তারা প্রশস্তি গাইছেন। রাজনৈতিক সরকারের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অন্যায়ের সাফাই গাওয়া কোনো শিক্ষক সমিতির কাজ নয়। অথচ তারা তাই করছে।

শিক্ষাব্যবস্থার যে সর্বনাশ এরই মধ্যে সাধিত হয়েছে, তা সহজে পূরণ সম্ভব নয়। এখনো সময় আছে। দলমত নির্বিশেষে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব শিক্ষকের কাছে গোটা জাতির নিবেদন- শিক্ষার মেরুদণ্ডকে রক্ষা করুন। দেশকে বাঁচান।

লেখক: ড. আব্দুল লতিফ মাসুম, অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *