মঙ্গলবার ৩০, নভেম্বর ২০২১
EN

সৌদি আরবের ‘ইসরাইল ডিলেমা’ ও মধ্যপ্রাচ্য

মাসুম খলিলী: ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত সব ধরনের স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এর বহুমুখী প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। এ চুক্তির ঘোষণা দেয়ার পর বলা হয়েছিল, আরো দেশ আমিরাতকে অনুসরণ করে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করতে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো দেশই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়নি। আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আরব দেশগুলো সফর করেছেন। কিন্তু কোনো দেশই তার আলোচনায় এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়েছেন, এমন খবর পাওয়া যায়নি। সৌদি আরব বরং আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রগতি ছাড়া দেশটি ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না; যদিও এর পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও সিনিয়র উপদেষ্টা কুশনার বলেছেন, সৌদি আরবসহ মিত্রদেশগুলোকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতেই হবে।

মাসুম খলিলী: ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত সব ধরনের স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এর বহুমুখী প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। এ চুক্তির ঘোষণা দেয়ার পর বলা হয়েছিল, আরো দেশ আমিরাতকে অনুসরণ করে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করতে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো দেশই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়নি। আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আরব দেশগুলো সফর করেছেন।

কিন্তু কোনো দেশই তার আলোচনায় এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়েছেন, এমন খবর পাওয়া যায়নি। সৌদি আরব বরং আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রগতি ছাড়া দেশটি ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না; যদিও এর পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও সিনিয়র উপদেষ্টা কুশনার বলেছেন, সৌদি আরবসহ মিত্রদেশগুলোকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতেই হবে।

সৌদি আরবের দ্বিমুখী সঙ্কট
সৌদি আরবের ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকদের এক বৈঠকে আলোচনা করে বাদশাহ সালমান ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইস্যুতে ছাড় দেয়া ছাড়া ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করার কথা বলেছেন। সৌদি আরবের ঘোষণার পর এর মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইন, ওমান, মরক্কো ও সুদানের বক্তব্যও পাল্টে যায়। বাদশাহ সালমান ফিলিস্তিন ইস্যুতে সহানুভূতিশীল একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি ৮০-এর দশকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ফিলিস্তিনিদের জন্য সাহায্য তহবিল গঠন করেছিলেন। তিনি ফিলিস্তিন ইস্যুতে ‘বিশ্বাসঘাতকতার তকমা’ নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান না বলে উল্লেখ করেছেন।

সৌদি আরবের নতুন ঘোষণায় বোঝা যাচ্ছে, বাদশাহ সালমান একটি বিশেষ অবস্থান নিতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি তাতে কি সৌদি আরব ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকতার দিকে না নিয়ে থাকতে পারবে? এটি করতে গেলে সৌদি আরবকে চীন ও রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তবে ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা বলয়ের নিজস্ব রাজ্যটি অন্য শক্তিশালী এবং আরো অনুগত মিত্র খুঁজে পাবে, এমন আশা কম। দেশটির সামরিক সক্ষমতা পশ্চিমা এবং বিশেষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এর নির্মাতারা এবং প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর সাথে আবদ্ধ।

সৌদি আরব চীন থেকে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র এবং নজরদারি প্রযুক্তি কিনতে পারে; তা সত্ত্বেও চীনা সামরিক যন্ত্রপাতিতে পুরোপুরি পরিবর্তন করা দেশটির জন্য কঠিন হবে। চূড়ান্ত সৌদি অভিভাবক হিসেবে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করবে এমন আশাও নেই। বছরের শুরুতে তেলের দাম এবং উৎপাদন নিয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে রিয়াদের বিরোধ একটি উদ্বেগজনক সম্পর্কের সৃষ্টি করেছিল। তদুপরি, রাশিয়ার ইরান সম্পর্কে ইতিবাচক সমর্থন এবং আরব বিশ্বে এর ভূমিকা ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা অথবা এর শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য সৌদি আকাক্সক্ষা থেকে অনেক দূরে।

আমিরাতি ক্রাউন প্রিন্স বিন জায়েদ আর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান মিলে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়কে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে দু’দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক চলে আসছে বেশ কিছু দিন ধরে। আর এই প্রক্রিয়া থেকে সৌদি আরব ও মিত্র দেশগুলো বেরিয়ে আসতে পারবে কিনা সেটিই প্রশ্ন। সৌদি আরব ও মিত্র দেশগুলোর শাসন কাঠামো ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্নায়ু যুদ্ধকাল থেকেই তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য বলয়ে থেকে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল সৌদি জ্বালানি নিরাপত্তানির্ভর আর সৌদি আরব ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা নিরাপত্তানির্ভর। জ্বালানিনির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের কমলেও রিয়াদ আমেরিকার নিরাপত্তা আশ্রয় থেকে বের হয়ে ভিন্ন কোনো মেরুকরণ তৈরি করতে পারবে, এমনটি দেখা যাচ্ছে না। এটি সম্ভব হতো যদি কয়েক দশক ধরে ইরানের সাথে এবং সম্প্রতি তুরস্কের সাথে যে ব্যবধান রিয়াদের দেখা যাচ্ছে সেটি ঘুচিয়ে একটি সমঝোতার সম্পর্ক গড়া সম্ভব হতো। সেটি হতে দেয়া মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান কৌশলের বিপরীত।

এই কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল দুটি দেশই মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাত ও বিরোধকে জিইয়ে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের অম্ল মধুর সম্পর্ক যাই থাক না কেন তুরস্ক ন্যাটোভুক্ত এবং আমেরিকান বলয়ের একটি দেশ। ইরান ও সৌদি আরব আদর্শগতভাবে বিপরীতমুখী ধারায় রয়েছে। তিন দেশের মধ্যে ধর্ম ও বিশ্বাসগত মিল রয়েছে। কিন্তু কোনোটিই কার্যকরভাবে ঐক্যের জন্য সক্রিয় বলে মনে হয় না। আর এ ধরনের বৃহত্তর ঐক্য গঠনের জন্য যে ধরনের নেতৃত্ব তিন দেশে প্রয়োজন সেটিও দেখা যায় না। ফলে এই বিরোধ নিষ্পত্তির পরিবর্তে আরো বড় হতে দেখা যাচ্ছে।

একটি ভঙ্গুর ও মেরুকরণকৃত মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরব সুন্নি দেশগুলোর ওপর নেতৃত্ব দাবি করতে সক্ষম হবে কিনা, এখন সেই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন কারণ সৌদি আধিপত্যকে ক্রমবর্ধমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পাকিস্তান থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ক’জন নেতা সালমানের সিংহাসনের উত্তরসূরিকে সম্মান করবেন তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তরুণ সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ক্রমবর্ধমানভাবে ষড়যন্ত্র এবং হত্যার সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। তার বাবার মৃত্যুর সময় আসতে আসতে তার অবস্থা আরো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। তখন সুন্নি মুসলিম বিশ্বের ওপর প্রভাবের ক্ষেত্রে সৌদি নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে এরদোগানের তুরস্কের সাথে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে এবং ধীরে ধীরে সৌদি আরবের প্রভাব হ্রাস পেতে থাকবে।

ইসরাইলকে স্বীকৃতির প্রভাব আরব বিশ্বে
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আনুষ্ঠানিককরণ বা সাধারণীকরণের পরে, অনেক পর্যবেক্ষক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং আরব বিশ্বে এই চুক্তির প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেছিলেন। আরব বসন্ত চলাকালে আরব বিদ্রোহ ও বিপ্লবের পরে যে পাল্টা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তা ‘রাজনৈতিক আরব বিশ্বের’ ভবিষ্যতের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে বলে মনে হয়। আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাহ্যিক হস্তক্ষেপের ফলে, রূপান্তর প্রক্রিয়া প্রায় সব দেশেই ব্যর্থ হয়েছে। সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া এবং ইরাকে রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়ে। আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণে আসা মিসর আঞ্চলিক ইস্যুতে বেশির ভাগ রাজনৈতিক সুবিধা হারায়। রূপান্তর প্রক্রিয়াতে তিউনিসিয়া এখনো একমাত্র দেশ যেটি গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করে চলেছে। আরব বসন্তের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই উপসাগরীয় রাজতন্ত্র জর্দান এবং মরক্কো সফল হয়েছিল। তবে এই দুটি রাষ্ট্রই এখনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সুদানে ওমর আল-বশিরের দীর্ঘকালীন কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে আমিরাত ও সৌদি সমর্থিত সামরিক জেনারেলদের দিয়ে পরিবর্তন করা হয়। সব মিলিয়ে, শেষপর্যন্ত আরব বসন্তকে আরব শীতে পরিণত করা হলো।

আরব বিশ্বের এসব পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রভাবশালী অভিনেতা হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব। আমিরাত এবং সৌদি আরব হয়তো মনে করে যে, এই অঞ্চলে পরিবর্তনের তরঙ্গ থামানো প্রায় অসম্ভব এবং আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন বন্ধের একমাত্র উপায় হলো কর্তৃত্ববাদের এক নতুন গতিবেগ শুরু করা। আর এ জন্য ইসরাইলের সাথে সমঝোতার বিকল্প নেই।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি রাজনৈতিক শিবির হচ্ছে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের শক্তি এবং স্বৈরশাসনের শক্তি। প্রথম শিবিরটি রাজনৈতিক ইসলাম থেকে উদারপন্থী পর্যন্ত বিভিন্ন মতাদর্শের সমন্বয়ে গঠিত, দ্বিতীয় ফ্রন্টটিতে পারিবারিক রাজতন্ত্র বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্রগুলো রয়েছে। ইসরাইল এই দুর্বল সংশ্লেষ এবং আরব বিশ্বের বিপর্যয় থেকে লাভবান হয়ে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সহায়তায় ইসরাইল ‘আরব হুমকি’ নির্মূল করার জন্য এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান করতে তাদের ইচ্ছানুযায়ী পদক্ষেপ নেয়। আমিরাত এবং ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক চুক্তি হলো, বর্তমান ইসরাইল ও আমেরিকান সরকার এই অঞ্চলে তাদের অবস্থানকে আরো দৃঢ় করার জন্য গৃহীত সর্বশেষ পদক্ষেপ। কোনো আরব দেশে যাতে কোনো জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা রাজনৈতিক অভিনেতা ক্ষমতায় না আসে তা নিশ্চিত করতে এটি নেয়া হয়েছে। অন্য কথায়, এই চুক্তিটি বাহ্যিক শক্তির ওপর আরবনির্ভরতা বাড়ানোর আরেকটি আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ।

চুক্তিটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, এটি কেবল ইসরাইলি নিরাপত্তা নয় বরং দেশটির সম্প্রসারণবাদ ও দখলদারিত্বেরও নিশ্চয়তা দেবে।

প্রথমত, এই চুক্তিটির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত পবিত্র জেরুসালেমের ইসরাইলি কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দখলকে বৈধ করার পথ প্রশস্ত করেছে।

দ্বিতীয়ত, আমিরাত আরব লিগের নেয়া শান্তি উদ্যোগ তথা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে লঙ্ঘন করেছে। এতে বলা হয়েছিল, যদি ইসরাইল দখলদারিত্ব শেষ করে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে মেনে নেয় তবে সব আরব দেশ ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে এবং দেশটির সাথে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। এই চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত আরব উদ্যোগ এবং ঐক্যকে শেষ করে দিয়েছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্ন উপেক্ষা করে আমিরাত বিনা মূল্যে ইসরাইলের সাথে তার সম্পর্ককে স্বাভাবিক করেছে। এখন থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা বেশ কঠিন হবে, ফিলিস্তিন ইস্যুটিই বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আরব ঐক্যের মূল কারণ ছিল।

তৃতীয়ত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরাইলের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অন্যান্য আরব দেশকে একই পথ অনুসরণ করতে একপর্যায়ে বাধ্য করবে। ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া হবে; তবে বিনিময়ে কিছুই গ্রহণ করবে না। এটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের প্রতি কোনো সমঝোতামূলক পদক্ষেপ নেবে না। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এবং অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি ইসরাইলের সাথে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করার জন্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে চাপ দেবে এবং এই চাপকে প্রতিহত করা আরো কঠিন হবে। এছাড়া, এখন থেকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্ন আরব সরকার ও ইসরাইলের মধ্যকার স্বাভাবিকতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না।

চার স্থানে ইসরাইলের ঘাঁটি?
ইসরাইলের সাথে আমিরাতের সম্পর্ক ও সহযোগিতার সীমানা ‘আকাশ পর্যন্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন একজন শীর্ষস্থানীয় ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত। চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করার আগেই দু’দেশের মধ্যে কোথায় কোথায় সহযোগিতা হবে তা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ ইয়েমেনের এডেন বন্দরের কাছে আমিরাত-ইসরাইল যৌথ গোয়েন্দা ঘাঁটি করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্ততঃপক্ষে আরো তিনটি স্থানে ইসরাইল-আমিরাত যৌথ ঘাঁটি করার কথা বলা হচ্ছে। এর একটি হলো খলিফা হাফতারের নিয়ন্ত্রণে থাকা লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের মিসরীয় সীমান্ত অঞ্চলে, একটি ইরাকের আমেরিকান ঘাঁটি এলাকায়, অপরটি হলো সিরিয়ার কুর্দি ওয়াইপিজি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে। এডেনের ঘাঁটি থেকে এডেন বন্দর ও সন্নিহিত সমুদ্র অঞ্চল, সিরিয়ার কুর্দি এলাকার ঘাঁটির মাধ্যমে তুরস্কের ওপর এবং ইরাকের ঘাঁটি থেকে ইরানের ওপর নজরদারি করা হবে। সেইসাথে আমিরাতের সর্বত্রই ইসরাইলের উপস্থিতি নানা অবয়বে থাকবে।

নতুন উদ্যোগের অর্থ হবে, ইসরাইলকে আমিরাতের ওপর ভর করে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এলাকায় তৎপরতা চালানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। এটি চার পাশের দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।

তুরস্কের পদক্ষেপ
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তিচুক্তির পর ‘আঞ্চলিক দাবা বোর্ডে’ তুরস্ক প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতি এরদোগান ইস্তাম্বুলে হামাসের নেতা ইসমাইল হানিয়া এবং উপ-নেতা সালেহ আল-আওরোরিসহ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের সাথে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তুরস্কের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হাকান ফিদান এবং এরদোগানের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক ফাহেরেতিন আলতুন এবং রাষ্ট্রপতির মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিনের দুই প্রধান সহযোগী।

এ অনুষ্ঠানের প্রতীকী গুরুত্ব অনেক গভীর। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর হানিয়া ও অরোরিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। আর হামাসের সাথে তুরস্কের যোগসূত্র ইসরাইলের জন্য এক সঙ্কটজনক বিষয় এবং এটি উভয় দেশের মধ্যকার ঐতিহ্যগতভাবে সম্পর্ককে ব্রেকিং পয়েন্টে নিয়ে এসেছে। মার্কিন-পৃষ্ঠপোষকতায় আমিরাত এবং ইসরাইলের মধ্যে চুক্তির পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য, একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি করা। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকাকে পুনরায় সজ্জিত করার প্রচেষ্টা শুরু হতে পারে।

এরদোগান অনুমান করেছেন যে, আমিরাত-ইসরাইল চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো তুরস্ক। তিনি তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে দেখছে। তিনি সচেতন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তুরস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি গোষ্ঠীর সাথে জোটবদ্ধ এবং তাদের সহযোগিতা করবে তুরস্কের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে। তুরস্ক এবং আমিরাত লিবিয়ার দ্বন্দ্বে দুই বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করছে।

হামাস নেতাদের সাথে বৈঠকের জন্য এরদোগানের সমালোচনা করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আঙ্কারা তার জবাব দেয়। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটন কর্তৃক হামাসের বৈধতার প্রশ্ন তুলে উল্লেখ করে যে, ‘গাজায় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে হামাস যা এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।’

মার্কিন নীতির প্রতি ইঙ্গিত করে, তুর্কি বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘এটি এমন একটি দেশ যে পিকেকেকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে অথচ তাদের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তালিকার মধ্যে রয়েছে এরা। এমন একটি দেশের তৃতীয় কোনো দেশকে নিয়ে কিছু বলার অধিকার নেই।’

তুরস্ক অনেক স্বাধীন আঞ্চলিক পর্যবেক্ষক এবং পশ্চিমা বিশ্লেষকের মূল্যায়নের সাথে একমত যে, ফিলিস্তিনিরা সাত দশকব্যাপী তাদের রাজনৈতিক অধিকার ত্যাগ করে আত্মসমর্পণ করার মতো মেজাজে নেই। প্রকৃতপক্ষে, ফিলিস্তিনের জনপ্রিয় প্রতিরোধে ক্লান্তির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ফিলিস্তিনি নেতারা সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের নিন্দা করার জন্য খুব কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন। ক্রোধের তরঙ্গ গভীরভাবে জ্বলে উঠেছে যে, তারা আবুধাবি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন। এই ক্ষোভ ২০০৭ সালের গাজার গৃহযুদ্ধের পর থেকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ ও হামাসকে যৌথ রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এখন হামাসের সাথে কাজ করার জন্য উন্মুক্ত। গত সপ্তাহে, ফাতাহর সাধারণ সম্পাদক জিব্রিল রাজউব হামাস নেতা আরোরির সাথে একই প্ল্যাটফর্মে কথা বলেছেন।

নেতৃত্ব আসবে কার হাতে?
তুরস্ক আঞ্চলিক রাজনীতিতে সম্ভাব্য অগ্রগতি অনুভব করেছে। কারণ বিন জায়েদ কর্তৃক বিশ্বাসঘাতকতায় ফিলিস্তিনি জনগণের ক্ষোভ ও বিরক্তি অনেকাংশেই আরব জনগণের মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছে। দোহার আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ পরিচালিত জরিপ অনুসারে, ২০১১ সালে ৮৪.৮৪% আরব ইসরাইলকে কোনো কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদানের বিরোধিতা করেছিল, ২০১৮ সালে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮.৭%।

একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের সৃষ্টি যা মধ্যযুগীয় অভিজাতদের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক নীতি ও জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন; তার প্রতিষ্ঠা ছিল এরদোগানের একটি স্বপ্নের প্রকল্প। এরদোগান মনে করেন যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত-ইসরাইল চুক্তি বালির উপরে নির্মিত এবং সুপ্ত দ্বন্দ্বের ভারে এটি চূর্ণ হয়ে যেতে বাধ্য।

ডেভিড হার্শ গত সপ্তাহে লিখেছিলেন, ‘যেখানে আগে ইসরাইলি নেতারা আরব বিশ্বে স্বৈরশাসনের অশান্তির প্রতিপক্ষ হওয়ার ভান করতে পারতেন, আমিরাতের সাথে এই চুক্তির পর সেটি আর পারবেন না। এখন ইহুদি রাষ্ট্রটি সম্পর্ক স্থাপন করেছে তার চার পাশের স্বৈরাচার এবং দমন-নিপীড়ক সরকারগুলোর সাথে। ... এটি কেবল ফিলিস্তিনেই নয়, আরব বিশ্বজুড়ে একটি নতুন জনপ্রিয় বিদ্রোহের নিশান উড়িয়ে দেবে। এই বিদ্রোহ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে থাকতে পারে।’

আমিরাতি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিতকারী পোস্টারগুলো সৌদি মিডিয়া ছাড়া পুরো আরব এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছেন আরব বিশ্বজুড়ে লেখক এবং বুদ্ধিজীবীরা।

তবে এ ব্যাপারে সৌদি ভূমিকা এখনো বেশ খানিকটা দ্বিধাগ্রস্তই রয়ে গেছে। গত শুক্রবার আতাশার্ক আল-আওসাতে প্রকাশিত একটি কলামে প্রভাবশালী সৌদি প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক চুক্তি করার আরব আমিরাতি সিদ্ধান্তকে রক্ষা করেছেন, কিন্তু বলেছেন যে, রিয়াদকে গত সপ্তাহে ঘোষণার আগে চুক্তি সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি। প্রিন্স তুর্কি লিখেছেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়ে আমাদের অবাক করে দিয়েছেন। তবে তিনি আরো যোগ করেন যে আবুধাবির এমন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার ছিল, যা এটি তার জনগণের জন্য উপকারী বলে মনে করে।’ এই বক্তব্যেই সৌদি ডিলেমাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটা সময় আসবে যখন একটি পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে সৌদি আরবকে। তখন মুসলিম দুনিয়ার গতিপথটি অনেকখানি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়ে যাবে।

mrkmmb@gmail.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *