শুক্রবার ৩, ডিসেম্বর ২০২১
EN

সরকারি ক্রয়ে নৈরাজ্য

ইবনে নূরুল হুদা: সুশাসনের অভাবেই দেশ এখন অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য। অপরাধ করে পার পাওয়া ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এর প্রধান কারণ। রাষ্ট্রের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, লুটপাট, দুর্নীতি, সীমালঙ্ঘন মুক্ত রয়েছে। সরকারি ক্রয়খাতেও চলছে সীমাহীন হরিলুট। একশ্রেণির অসাধু আমলা ও কতিপয় রাজনীতিকের যোগসাজশেই রাষ্ট্রীয় ক্রয়খাতে নৈরাজ্য এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য। সরকার নতুন নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি অবলম্বন করেও এই খাতের লুটপাট ও অনিয়ম বন্ধ করতে পারছে না।

ইবনে নূরুল হুদা: সুশাসনের অভাবেই দেশ এখন অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য। অপরাধ করে পার পাওয়া ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এর প্রধান কারণ। রাষ্ট্রের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, লুটপাট, দুর্নীতি, সীমালঙ্ঘন মুক্ত রয়েছে। সরকারি ক্রয়খাতেও চলছে সীমাহীন হরিলুট। একশ্রেণির অসাধু আমলা ও কতিপয় রাজনীতিকের যোগসাজশেই রাষ্ট্রীয় ক্রয়খাতে নৈরাজ্য এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য। সরকার নতুন নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি অবলম্বন করেও এই খাতের লুটপাট ও অনিয়ম বন্ধ করতে পারছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে সে অবস্থার আরও বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। ৬ হাজার টাকায় প্রতিটি বালিশ, ২৭ লাখ টাকার পর্দা, ১৬ গুণ বেশী মূল্যে চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থাদির পরে বিশ্বব্যাংকের ঋণপুষ্ট ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পে সরকারি কেনাকাটায় হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। করোনাকালীন জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী মাস্ক-পিপিই ও ভেন্টিলেটরের মতো জরুরি সামগ্রী কেনায় গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর করোনার পরীক্ষার জালিয়াতির কথা তো কারোরই অজানা নয়।

মূলত আইনের শাসন ও গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতির কারণেই দেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে চলেছে। জনপ্রশাসন তো এখন রীতিমত দুর্নীতির অভয়ারণ্য। এক শ্রেণির অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তার কারণেই পুরো ব্যুরোক্রেসিই এখন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় সব ধরনের সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং ই-টেন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। যা নিঃসন্দেহে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ। দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, এ ব্যবস্থার ফলে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সরকারি কেনাকাটায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু এতেও পরিস্থিতির উন্নতি কোন উন্নতি হয়নি। বরং ক্ষেত্র বিশেষের পরিস্থিতির আরও অবনতিই হয়েছে।

রূপপুরের বালিশকান্ডে দেশে বড় ধরনের হৈচৈ সৃষ্টি হলেও বিষয়টিকে কেউ কেউ নেহাৎ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এরপরও সরকারি কেনাকাটায় আরও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জনপ্রশাসনে যত বড় দুর্নীতি হয়, সেগুলোর সামান্যই গণমাধ্যমে আসে। কিন্তু যতটুকু আসছে তাও আৎকে ওঠার মত।

দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন যে তারা কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করেন না। সাক্ষ্যপ্রমাণ রেখেই তারা এখন দুর্নীতি করে যাচ্ছেন অবলীলায়। তাদের বদ্ধমূল ধারণা যে, প্রচলিত ব্যবস্থায় তাঁদের কার্যকর শাস্তি দেয়া মোটেই সহজসাধ্য নয়। সঙ্গত কারণেই শুধু কেনাকাটা নয়, যেখানেই সরকারি অর্থসম্পদ রয়েছে, সেখানেই এর অপব্যবহার বা স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানুষ স্বভাবগতভাবেই অপরাধপ্রবণ। দুর্নীতি আগেও ছিল, এখনও আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে। কিন্তু দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বা অপরাধীদের শাস্তি বিধান করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্রের উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণেই এখন তা প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসছে। গরু-ছাগলের উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫ হাজার টাকার চেয়ারের দাম ৬ লাখ টাকায় কেনার ঘটনা সেদিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে। গাভির ভ্রুণ পরীক্ষার জন্য বাজারে ১ হাজার পিস বাক্সের কিটের দাম যার মূল্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, সেখানে তা দেখানো হয়েছে প্রায় ৫শ গুণ বেশি। কিন্তু এসব অভিযোগে অভিযুক্তদের কোন দিনই শাস্তি পেতে হয়নি। যদিও সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করলে কাজের মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের টাকার সর্বোত্তম ব্যবহার হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বিষয়টি এখনও কথামালার ফুলঝুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সরকারি কোন ক্রয় কাজে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা হয়নি।

সরকারি ক্রয়ে গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সরকার তা বন্ধে ই-জিপি’র (ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) কার্যক্রম গ্রহণ করলেও তা কোন ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি। কারণ, প্রযুক্তিও এসব অপরাধীদের কাছে হার মেনেছে। এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হলেও কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ, সিন্ডিকেট এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। ক্রয়াদেশ পর্যন্ত এর ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা, সব ধরনের ক্রয়ে ই-জিপি’র ব্যবহার না হওয়া এবং ই-জিপি প্রবর্তনের ফলে ম্যানুয়াল থেকে কারিগরি পর্যায়ে সরকারি ক্রয়ের উত্তরণ ঘটলেও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের একাংশ দুর্নীতির নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। ‘সরকারি ক্রয়ে সুশাসন: বাংলাদেশে ই-জিপি’র কার্যকরতা পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন এমন তথ্যই দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই গবেষণায় বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় খাতে সুশাসনের আঙ্গিকে ই-জিপি’র প্রয়োগ ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করার উদ্দেশ্যে ২০১৯ এর জুলাই থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের জন্য ই-জিপি বাস্তবায়নকারী প্রথম দিকের চারটি প্রতিষ্ঠান-স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)-কে বাছাই করা হয়। দেশের চারটি প্রশাসনিক বিভাগের একটি করে জেলা এবং সে জেলার একটি উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত কার্যালয় ও ঢাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

গুণগত ও সংখ্যাগত উভয় পদ্ধতি অনুসরণ করে চারটি প্রতিষ্ঠানের ৫২টি কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি’ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ই-জিপি প্রক্রিয়া, ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতা-এই পাঁচটি ক্ষেত্রের অধীনে ২০টি নির্দেশকের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় আইন কতটুকু কার্যকর তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেক নির্দেশককে উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন স্কোর দিয়ে তাদের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। স্কোরের গ্রেডগুলো হচ্ছে ‘ভালো’ (৮১ শতাংশ বা তার বেশি); ‘সন্তোষজনক’ (৬১ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ); ‘ভালো নয়’ (৪১ শতাংশ-৬০ শতাংশ); ‘উদ্বেগজনক’ (৪০ শতাংশ বা তার নিচে)।

অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ৫০ শতাংশ স্কোর পেয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ)। ৪৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ (আরইবি), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৪৩ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পেয়েছে ৪২ শতাংশ অর্থাৎ কোনো প্রতিতষ্ঠানের অবস্থানই ‘ভালো নয়’ গ্রেডে। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ স্কোর পেয়ে মোটামুটি ভালো ও প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে আছে। তবে সওজ ও আরইবির সক্ষমতা অন্য দুটো প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলকভাবে ভালো। ই-জিপি প্রক্রিয়া মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ৫৮ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশ স্কোর পেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ই-জিপি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকরতায় কোনো প্রতিষ্ঠানই কোনো স্কোর পায়নি। আবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানের স্কোর ১৯ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ তথা হতাশাব্যঞ্জক। প্রাপ্যগ্রেড অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সার্বিকভাবে ঘাটতিপূর্ণ। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকরতায় অবস্থান উদ্বেগজনক। যেসব নির্দেশকে অবস্থান উদ্বেগজনক সেগুলো হচ্ছে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, প্রাক-দরপত্র সভা, ই-চুক্তি ব্যবস্থাপনা, কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি, নিরীক্ষা, কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ, অনিয়ম ও দুর্নীতি, এবং কাজের মান।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে সওজ (৭৫ শতাংশ); এর পরেই রয়েছে পাউবো (৬৩ শতাংশ)। সবগুলো প্রতিষ্ঠানেই ই-জিপি পরিচালনার জন্য আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, এবং ই-জিপি পরিচালনার জন্য আলাদা করে অর্থ বরাদ্দেরও দরকার নেই। ভৌত ও কারিগরি সক্ষমতার দিক থেকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে সওজ এবং আরইবির সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। এলজিইডি ও পাউবোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও লজিস্টিকসের ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ই-জিপি গাইডলাইন অনুযায়ী ই-জিপি পরিচালনা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানভেদে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয় ই-জিপিতে হয় না। উপজেলা পরিষদের ক্রয়ে অনেক জায়গায়ই ই-জিপি পুরোপুরি চালু হয়নি। সামরিক বাহিনীর দ্বারা সম্পাদিত কাজের ক্ষেত্রে ই-জিপি অনুসরণ করা হয় না। এছাড়া, কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা দেওয়া হয় না।

গবেষণায় প্রকাশিত উপাত্ত থেকে জানা যায়, ই-জিপি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে সওজ (৬৪ শতাংশ); এর পরেই রয়েছে পাউবো (৬০ শতাংশ)। ই-জিপি গাইডলাইন অনুযায়ী সব ই-জিপি ব্যবহারকারীদের ই-জিপি ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তিন ধরনের প্রতিষ্ঠান ই-জিপিতে নিবন্ধিত-ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার ও ব্যাংক। ই-জিপি চালুর প্রথম দিকে অধিংকাশ ঠিকাদারই সংশ্লিষ্ট অফিসের সহায়তায় ই-জিপিতে নিবন্ধিত হয়েছে, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটরদের মাধ্যমে ই-জিপি আইডি খোলা ও নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। তবে কোনো কোনো ঠিকাদার নিজেই নিবন্ধন করেছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটি (টিইসি) গঠন ও দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। সওজ ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দরপত্র মূল্যায়ন করা হয় না। কোনো কোনো সময় টিইসির সদস্যদের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটররা তাদের পক্ষে লগ-ইন করে দরপত্র খোলেন। দরপত্র খোলার আগে ঠিকাদারদের পরিচয় গোপন থাকার নিয়ম থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেই এটি গোপন থাকে না। উপরন্তু, কোনো কোনো কার্যালয়ের অফিসের কম্পিউটার অপারেটররাই টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারদের হয়ে দরপত্র দাখিল করে। কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রাক-টেন্ডার মিটিং করে না।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ই-চুক্তি ব্যবস্থাপনায় ঠিকাদারদের কর্ম-পরিকল্পনা দাখিল করতে হয় এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ঠিকাদারকে ই-জিপি চুক্তি ব্যবস্থাপনা টুলস ব্যবহার করতে হয়। তবে ই-চুক্তি ব্যবস্থাপনা কোনো প্রতিষ্ঠানেই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি প্রক্রিয়াও এখনো ই-জিপি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এছাড়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রের অধীনে দেখা যায় যে, এলজিইডি ও সওজ কার্যালয়গুলোতে কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বিদ্যমান। অন্যদিকে পাউবো ও আরইবিতে অভিযোগ করলেও সমাধান না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধি ১৯৭৯’ অনুযায়ী সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেক পাঁচবছর অন্তর সম্পদের বিবরণী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাখিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেরই কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেন না।

মূলত, ই-জিপির প্রবর্তনের ফলে সার্বিকভাবে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। শিডিউল ছাপাতে ও নথি সংগ্রহ করতে হয় না বিধায় শিডিউল কেনা ও জমা দেয়া এবং যাচাই এর কাজ দ্রুততম হয়েছে; সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর; তৃণমূল পর্যায়ের কার্যালয়ে ক্রয়ের সুবিধা; দেশের যেকোনো জায়গা থেকে দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ; দরপত্র জমা নিয়ে সব ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, বোমা হামলা, বাক্স ছিনতাই ও চুরি, জমায় বাধা দেয়া, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি দূর হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তবে ই-জিপি প্রবর্তনের ফলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হলেও দুর্নীতি কমার সাথে ই-জিপির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বলে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই মতপ্রকাশ করেছেন। ই-জিপি প্রবর্তন সত্ত্বেও নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান। রাজনৈতিকভাবে কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় কোনো বিশেষ কাজে কারা টেন্ডার সাবমিট করবে সেটা রাজনৈতিক নেতারা ঠিক করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় লাইসেন্সের অধীনে কাজ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তার কর্মীদের মাঝে বণ্টন করে দেন। ফলে সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে ই-জিপি কোন সুফল বয়ে আনছে না বরং ভিন্ন আঙ্গিকে পুরাতন বৃত্তেই আবদ্ধ রয়েছে সবকিছু।

সরকারি ক্রয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় দুর্নীতি হ্রাস এবং কাজের মানন্নোয়নে ই-জিপি’র সুফল মিলছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই সীমাবদ্ধতা উত্তরণে ১৩ দফা সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। ই-জিপি’র কার্যকর সুফল পেতে টিআইবির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, ই-জিপি’কে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে হবে; সেই লক্ষ্যে সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির রাষ্ট্রের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্কের সুযোগ বন্ধ করতে হবে; প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ক্রয় ই-জিপি’র মাধ্যমে করতে হবে; কাজের চাপ ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে জনবল বাড়াতে হবে; সব অংশীজনকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে; প্রাক-দরপত্র মিটিং নিশ্চিত করতে হবে; ঠিকাদারদের অনলাইন ডাটাবেইজ তৈরি করতে হবে; সমন্বিত স্বয়ংক্রিয় দরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে হবে; দরপত্র সংক্রান্ত সব তথ্য ও সিদ্ধান্ত স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করতে হবে; ই-জিপির সাথে জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিজস্ব ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রতিবছর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে ও তা প্রকাশ করতে হবে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম বন্ধ ও ই-জিপি পদ্ধতি কার্যকর ফল পেতে টিআইবি’র সুপারিশমালা অনেকটাই কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু আমাদের দেশের আর্ত-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় এবং চলমান অস্থির রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তা বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। তবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদেরকে এই অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে এসে যাবতীয় সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা সহ রাষ্ট্রের সকল সেক্টর দুর্নীতি দূর করতে জাতীয় ঐক্যমতে পৌঁছা উচিত। অন্যথায় জাতি হিসেবে আমরা পশ্চাদপদই থেকে যাব।

inhuda71@gmail.com

(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

এমবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *