ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টা ২০ মিনিটে ঘূর্ণিঝড়টির স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এ সময় ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার। তবে দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে ভারতের আবহাওয়া দপ্তর। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ভারি বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে বিভিন্ন স্থানে গাছপালা উপড়ে পড়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের প্রকাশিত বুলেটিন অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূলীয় এলাকা এবং ইয়ানামের দক্ষিণাংশের কাছাকাছি ঘূর্ণিঝড়টির অবস্থান ছিল। কাকিনাড়ার নিকটবর্তী পুদুচেরির অধীন ইয়ানাম এলাকায় ঝড়টির প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া শুরুর পর অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব আরও তীব্র হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশ, ইয়ানাম ও দক্ষিণ ওড়িশার কয়েকটি এলাকায় ভারি বৃষ্টির পাশাপাশি প্রবল বেগে বাতাস বইছে। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ইয়ানামের কাছে একটি জাতীয় সড়কে বেশ কয়েকটি গাছ উপড়ে পড়ে। এতে সড়কে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত গাছগুলো সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

প্রবল ঝোড়ো হাওয়া ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অন্ধ্রপ্রদেশের তিনটি বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট। একই সঙ্গে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ট্রেন চলাচলও বাতিল করা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। ঝড়ের কারণে মানুষের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে দুই হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বহু মানুষকে সরিয়ে এসব কেন্দ্রে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ সতর্কতা হিসেবে গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দুর্যোগের সময় যাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় এলাকাসহ বিভিন্ন জেলাতেও ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া বইতে দেখা গেছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের চার জেলায় ভারি বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। জেলাগুলো হলো দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম। এসব এলাকায় ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিতে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবারও কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা বহাল থাকবে। ওই দিন পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া জেলায় ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবার আবহাওয়ার অবনতি হতে পারে পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়া জেলায়। এসব এলাকায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।

দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও ভারি বৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলায় ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া দপ্তর। পাহাড়ি অঞ্চলে চলাচলের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আগামী শনিবারও উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকা ও সংলগ্ন পাঁচ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে।

এদিকে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে নিষেধ করা হয়েছে মৎস্যজীবীদের। সমুদ্রে অবস্থানরত জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার বিভিন্ন এলাকায় আবহাওয়ার পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

সূত্র: আনন্দবাজার

এনএইচ