১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে ভোট দেন নাগরিকরা। নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৪ কোটি ৮২ লাখের বেশি।

এখন সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার এই প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী জোটের মতপার্থক্যের মধ্যেই নতুন গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারপক্ষ বলছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পরিবর্তন বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সংসদের মাধ্যমে করা সম্ভব। অন্যদিকে বিরোধী জোট গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দাবি করছে।

সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন সংসদে আনা হবে। রাজনৈতিক দল, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করছে। এরপর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে তোলার কথা রয়েছে।

বিশেষ কমিটির এই অবস্থানের পরই প্রশ্ন উঠেছে আগের গণভোটে জনগণ যে মতামত দিয়েছেন, সেটির পর আবার গণভোটের প্রয়োজন কেন? নতুন গণভোট হলে আগের গণভোটের সিদ্ধান্তের কী হবে? প্রথম গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আগেই দ্বিতীয়বার ভোট আয়োজন করা হলে তার সাংবিধানিক ভিত্তিই বা কী হবে—এমন প্রশ্ন তুলছেন আইনজীবীদের কেউ কেউ।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে পাশ কাটিয়ে নতুন গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা সাংবিধানিকভাবে স্ববিরোধী হতে পারে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে গণভোটের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে ওই রায় ও প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে ভিন্ন পদ্ধতিতে এগোনোর প্রশ্নে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

শরীফ ভূঁইয়া আরও মনে করেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ কোনো বিষয়ে মতামত দেওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আরেক সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, বর্তমান সংবিধানে গণভোটের বিধান পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়। ১৪২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে গণভোটের বিধান কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে পৃথক সাংবিধানিক পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

শিশির মনিরের বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তবে গণভোট আয়োজনের বাধ্যবাধকতা নিয়ে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তার সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের মতপার্থক্য ইতোমধ্যে সংসদেও প্রভাব ফেলেছে। সরকারপক্ষ বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে।

এ অবস্থায় বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয় প্রথমত, ফেব্রুয়ারির গণভোটের রায় কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে; দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে নতুন কোনো গণভোটের প্রয়োজন বা সুযোগ আছে কি না।

ফলে নতুন গণভোটের প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিষয় নয়, এটি গণভোটের আগের রায়, সংবিধানের সংশোধন পদ্ধতি এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট কীভাবে কার্যকর হবে এসব সাংবিধানিক প্রশ্নের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, সংসদীয় সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজন হলে আদালতের ব্যাখ্যার ওপর।

এনএইচ