সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জে বাগান থেকে ঐতিহ্যবাহী জিআই পণ্য হাঁড়িভাঙ্গা আম ছিঁড়ে বাজারজাত কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানীকে আমন্ত্রণ না দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ বিতর্কের সূত্রপাত হয়। তবে এ ঘটনার দায় নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইউএনও ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে দায়ী করলেও কৃষি কর্মকর্তা দায় চাপিয়েছেন ডিসির ওপর।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি কার্যবিধি বা ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুসারে এমপি সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রধান জনপ্রতিনিধি ও আইনপ্রণেতা। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানে তাকে প্রধান অতিথি বা সম্মানিত অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর বিধান রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের সময় ও সুবিধা বিবেচনা করে অনুষ্ঠানসূচি নির্ধারণেরও কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব বিধান জানা সত্ত্বেও মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজ এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. লোকমান হেকিমের সমন্বয়ে ১৫ জুন হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারজাতকরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্যকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়নি।
জানা যায়, অনুষ্ঠানের দুই দিন আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং এক দিন আগে ইউএনও মোবাইল ফোনে মৌখিকভাবে এমপি গোলাম রব্বানীকে অনুষ্ঠানের বিষয়টি জানান। কিন্তু ততক্ষণে সংসদ অধিবেশন চলমান থাকায় তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাধারণত উপজেলা প্রশাসনের যেকোনো সরকারি কর্মসূচির তারিখ স্থানীয় এমপির সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্ধারণ করা হয় এবং তাকে প্রধান অতিথি করা হয়। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত রীতি অনুসরণ করা হয়নি।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে একজন জনপ্রতিনিধির মর্যাদাহানির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, তারা আমাকে আগে জানায়নি। তারা ডিসির কাছে গিয়ে ডেট নিয়েছে। জনগণ ডেট নিয়েছে না কৃষি অফিসার ডেট নিয়েছে, সেটা তারাই ভালো জানেন। কৃষি অফিসার গত পরশুদিন আমাকে ফোনে অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছে। আমি বললাম, এটা তো সাধারণত ২০ তারিখের দিকে হয়। আমি অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয়কে রাখতে চেয়েছিলাম। আপনারা একা একা ডেট নিলেন কেন?
তখন আমাকে বলা হলো, কৃষকরা ডিসির কাছে গিয়ে ডেট নিয়েছে। গতকাল ইউএনও আমাকে ফোন করে জানতে চাইল আমি যাব কি না। আমি বললাম, আমার সঙ্গে তো ডেট নেওয়া হয়নি, জানানো হয়নি। আমি যাব কীভাবে? আমি তো ঢাকা চলে যাচ্ছি, সংসদ অধিবেশন চলছে। তখন বাধ্য হয়ে বললাম, ডিসি আসছেন, আপনারা অনুষ্ঠান করেন।
অভিযুক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. লোকমান হেকিম বলেন, গত শনিবার এমপি স্যারকে প্রোগ্রামের কথা জানিয়েছি। তখন উনি বললেন, এখন তো অধিবেশন চলছে, আমি কীভাবে থাকব? বন্ধের দিনে নিলেই তো হতো। তখন আমি বললাম, স্যার এটা জেলা প্রশাসক স্যার তারিখ ঠিক করেছেন। আমি দাওয়াত দেওয়ার বাহক মাত্র।
২০ তারিখ উদ্বোধনের কথা ছিল। কৃষকরা ডিসি স্যারের কাছে আপত্তি জানালে তিনি ১৫ তারিখ নির্ধারণ করেন।
তিনি আরও বলেন, হাঁড়িভাঙ্গা আমের উদ্বোধনের তারিখের বিষয়টি পুরোপুরি ডিসি স্যার করেছেন। পরে তিনি ইউএনও স্যারকে জানিয়েছেন। এরপর আমরা বিষয়টি জেনেছি।
অভিযুক্ত ইউএনও মো. পারভেজ বলেন, যারা অভিযোগ করছেন, তাদের বুঝতে হবে এই প্রোগ্রামটা আমার না। এটি কৃষি অফিসের প্রোগ্রাম। আগে থেকেই ১৫ তারিখ সময় নির্ধারিত ছিল। কৃষি অফিস আমাকে জানিয়েছে যে এমপি স্যারের সংসদ অধিবেশন চলছে, তিনি উপস্থিত থাকতে পারবেন না।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, এটা মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি অফিসের নির্ধারিত কর্মসূচি। এটা আমার প্রোগ্রাম না, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবে। আমি শুধু অতিথি হিসেবে সেখানে গিয়েছিলাম।
ওখানে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন, বিএনপির উপজেলা সভাপতি ছিলেন। এমপি মহোদয়কে কেন জানানো হয়নি, সেটা আমি জানি না। আমাকে কেউ বলেনি যে এমপি মহোদয় যেতে চান কিংবা তাকে আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে কি না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে ডিসি তারিখ নির্ধারণ করেছেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, এটা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত ছিল যে ১৫ তারিখে হাঁড়িভাঙ্গা আম হারভেস্টিং করা হবে। ১৫ তারিখের আগে কেউ বাজারজাত করতে পারবে না। আমি তারিখ নির্ধারণ করিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত ছিলেন সোমবার দুপুর দেড়টায় মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জে বাগান থেকে হাঁড়িভাঙ্গা আম ছিঁড়ে বাজারজাত কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম, ইউএনও মো. পারভেজ, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এনামুল হক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম, কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম রাকিবুল হাসান ফেরদৌসসহ স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতৃবৃন্দ, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
এনএইচ