চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথাও তুলে ধরতে পারেন। এ লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ, জনগণের আর্থিক পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজস্ব আয় ও বাজেট ঘাটতি

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব ও বৈদেশিক অনুদান মিলিয়ে মোট আয় ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর ফলে অনুদানসহ মোট বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশের সমান।

অন্যদিকে, অনুদান বাদ দিলে ঘাটতির পরিমাণ হবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

ঘাটতি পূরণে ঋণ পরিকল্পনা

বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক উৎস থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য নতুন করে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে এবং ৪৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে। ব্যাংক-বহির্ভূত উৎসের মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ

দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান।

আগের দুই বাজেটের চিত্র

২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল হাসান মাহমুদ আলী ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন, যা এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে আগের বছরের তুলনায় বাজেটের আকার ৭ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়, যা ছিল একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত।

সবচেয়ে বেশি বাজেট উপস্থাপন করেছেন যারা

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বাজেট উপস্থাপন করেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং এম সাইফুর রহমান। দুজনই ১২ বার করে জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন।

আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে, যার আকার ছিল ৪ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তিনি ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন।

অন্যদিকে এম সাইফুর রহমান প্রথম বাজেট দেন ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে ৪ হাজার ২২৭ কোটি টাকার। পরবর্তীতে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি মোট ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেন।

বাংলাদেশের প্রথম বাজেট

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন তাজউদ্দীন আহমেদ। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের সেই বাজেটের আকার ছিল ৭১৯ কোটি টাকা। পরবর্তী দুই অর্থবছরেও তিনি যথাক্রমে ৮২০ কোটি ও ৯৯৫ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন।

এরপর ড. আজিজুর রহমান, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, ড. এম এন হুদা, এম সায়েদুজ্জামান, মেজর জেনারেল এম এ মুনিম, ড. ওয়াহিদুল হক, শাহ এএমএস কিবরিয়া, ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, আ হ ম মুস্তফা কামাল, আবুল মাল আবদুল মুহিত, এম সাইফুর রহমান, আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং সালেহউদ্দিন আহমেদসহ বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী ও অর্থ উপদেষ্টারা জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন।

আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচটি বাজেট উপস্থাপন করেন। তার শেষ বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

দেশের অর্থনৈতিক যাত্রাপথে ৭১৯ কোটি টাকার প্রথম বাজেট থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের অর্থনীতির বিস্তার ও পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।

এনএইচ