ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ওপর অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের আঘাত হানতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, আগামী সপ্তাহেই তেহরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এদিকে নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে আয়োজিত রাজনৈতিক সমাবেশে হাস্যরসের সুরে ট্রাম্প বলেন, ‘খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছি।’ তবে তিনি মন্তব্যটি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে করেছেন, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যের কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিদাবাদি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, হুমকি বা শক্তি প্রদর্শনে তেহরান ভয় পায় না। হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইরানের নিজস্ব এখতিয়ার বলেও দাবি করেন তিনি। গারিদাবাদি বলেন, পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের অবরোধ অব্যাহত রাখবে। কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, বিমানবাহী রণতরী, নির্দেশনা কিংবা নির্বাচনী বক্তব্যের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলেও। জাহাজ ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মাত্র দুটি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে, যার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে আবুধাবি।
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টির বেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি এই জলপথের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়।
জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্নের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি জ্বালানির দাম প্রায় ৪ ডলারে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিকদের কিছুটা বেশি দামে জ্বালানি কেনার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। তার ভাষ্য, একটি ‘দুষ্ট দেশকে’ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এই অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে।
তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এর আগে বলেছিলেন, পারমাণবিক ইরান ঠেকানোর চেয়ে মার্কিন নাগরিকদের জন্য কম দামে জ্বালানি নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিকদের দুর্দশা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি নাকচ করেছেন ট্রাম্প। প্রায় নয় মাস ধরে সমুদ্রে থাকা রণতরীটির নাবিকদের পরিবার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এমন কোনো সমস্যা নেই এবং রণতরীটির মোতায়েনের সময়কালও ‘যথেষ্ট দীর্ঘ নয়’। তবে শিগগিরই রণতরীটি সরিয়ে একই ধরনের আরেকটি জাহাজ মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে এরই মধ্যে মার্কিন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে কয়েকজন নাবিকের সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করার কথা উঠে এসেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হাং কাও মানসিক অবসাদে আক্রান্ত কয়েকজন নাবিককে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রচারের জন্য গণমাধ্যমকে দায়ী করেছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত নিরসনে গত জুনে হওয়া চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে শুধু বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে। তবে এটিকে যুদ্ধ বন্ধের আনুষ্ঠানিক আলোচনা বলা যাবে না।
মূলত জুনের চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই ইরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর আবারও হামলা শুরু হয়েছে।
এনএইচ