বক্তাদের মধ্যে ছিলেন; আজিজুল বারী হেলাল,এম পি (খুলনা - ৪) এবং কেন্দ্রীয় তথ্যবিষয়ক সম্পাদক,বিএনপি; শফিকুল আলম তুহিন,সাধারণ সম্পাদক, খুলনা মহানগর,বিএনপি; অ্যাড. শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল,এম পি (খুলনা - ২) ও সেক্রেটারি,বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী,খুলনা মহানগর; শেখ মো. নাসির উদ্দিন বলেন সহ-সভাপতি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খুলনা মহানগর; অ্যাড. মো. বাবুল হাওলাদার,সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি খুলনা মহানগ; ডা. আবদুল্লাহ চৌধুরী,সংগঠক,এনসিপি, খুলনা মহানগর ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জিল্লুর রহমান, প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)
অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবাই একই টেবিলে বসে কথা বলতে পারেন। দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ নারী ও তরুণ হলেও রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। প্রকৃত তরুণদের জন্য রাজনীতির দরজা কতটা উন্মুক্ত এবং তাঁদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাপক পরিবর্তনের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে হতাশ করেছে। কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেই তা গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জবাবদিহির কাঠামোয় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে। বাহ্যিক পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, নেতা-কর্মী ও সমাজের প্রতিটি স্তরে এর প্রতিফলন ঘটতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্লোগানের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামো, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের অধিকার নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দিতে হবে। জুলাইয়ের আন্দোলনে নারীদের ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ থাকলেও সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত। নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ প্রতীকী নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের সুযোগ, সুরক্ষা, আইনি নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করেই বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে সবার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আজিজুল বারী হেলাল বলেন, গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য হলো মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে; তবে কোনো নিয়মই মানুষের বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে না। কারও বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলেও তাঁর কথা বলার অধিকার রক্ষা করাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচয়। তিনি কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কার্যকারিতা ও অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। গণঅভ্যুত্থানে নারী ও তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তাই নারী ও তরুণদের শুধু মিছিলকারী, ভোটার বা আন্দোলনের শক্তি হিসেবে ব্যবহার না করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। বয়সের অজুহাতে তরুণদের দাবিয়ে না রেখে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনে তাঁদের উপযুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী, বাজারমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ খাতে তরুণদের দক্ষ করে তুলতে হবে। তিনি জনগণের মতামত গ্রহণে অভিযোগ বাক্স স্থাপনের প্রস্তাব দেন এবং খুলনাকে আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্যনগরী হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও ঐক্যের রাজনীতি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।
অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল বলেন, গণতন্ত্রের যে সংজ্ঞা আমরা দিই এবং বাস্তবে যে চর্চা করি, তার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দলের কাজ শুধু বিরোধিতা করা নয়; বরং সরকারের ভুল সংশোধনে ভূমিকা রাখা। গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো সঠিক সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। তিনি বলেন, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং বিভাজন থেকে দূরে থাকতে হবে। প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার দেওয়া এবং অন্যের অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়াই গণতন্ত্র। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারী ও তরুণদের জন্য যথাযথ রাজনৈতিক পরিসর তৈরির পাশাপাশি তাঁদের দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, তাঁর দল কোনো নারী প্রার্থী দিতে না পারলেও দলে নারীর নেতৃত্ব রয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো পর্যাপ্ত নারী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে না পারা তাঁদের দুর্বলতা। নারীদের এমনভাবে দক্ষ ও সক্ষম করতে হবে, যাতে তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন। গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে নারী ও তরুণদের উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে নিরাপদ ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
শেখ মো. নাসির উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ এবং প্রায় অর্ধেক নারী। তাই জাতীয় উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। সততা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতেই প্রকৃত নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।
অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭৮ শতাংশ নারী ও তরুণ। তাই রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও তাঁদের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ৫ আগস্ট জাতির জন্য বড় অর্জন হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে অশালীন ভাষা ও অসহিষ্ণু আচরণ হতাশাজনক। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি আরও বলেন, জনগণের আন্দোলনের অর্জন ধরে রাখতে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাইকে সংযত ভাষা, দায়িত্বশীল আচরণ ও পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা করতে হবে।
শফিকুল আলম তুহিন বলেন, দেশের তরুণ ও যুবসমাজ যে স্বপ্ন নিয়ে ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার ফ্যামিলি কার্ড প্রদান, তরুণদের বিদেশি ভাষা শিক্ষা, ২৫ কোটি গাছ রোপণ এবং খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের সম্পৃক্ত করা হবে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবার কথা বলার ও মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে; তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও সমালোচনা অবশ্যই শালীনতা, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক আচরণের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। অসত্য, উদ্ভট ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য একসময় মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। শুধু প্রধানমন্ত্রী সৎ ও দায়িত্বশীল হলেই হবে না; তাঁর দৃষ্টান্ত, সংযম ও রাজনৈতিক বার্তা দলের প্রত্যেক নেতা-কর্মীকে ধারণ করতে হবে।
ডা. আবদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, নারী ও তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হলেও বর্তমানে সেই পরিসর আবারও সংকুচিত হচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য অটুট রাখতে হবে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং জেন-জিদের ভাষা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব না দিলে নারী ও তরুণদের রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের পথ পুনরায় রুদ্ধ হবে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীদের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বক্তারা। এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে।
এমএম