শুক্রবার বিকেলে বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাজেট নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে করা সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন দলটির এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ। তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, জয়নাল আবেদীন শিশিরসহ নেতারা।
ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিনের দুর্বল ভিত্তি, ঋণনির্ভরতা ও বৈষম্যের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় একটি রূপান্তরমুখী বাজেট প্রয়োজন ছিল, যা অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারত। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে ইশতেহারধর্মী ও অবাস্তব লক্ষ্যনির্ভর বাজেট দিয়েছে।
তিনি বলেন, এটা একটা প্রতারণার বাজেট। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এতে ঘটেনি। আমরা চরমভাবে হতাশ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
বাজেটের আকারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট একটি ‘কাল্পনিক’ বাজেট। গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড় এই বাজেটের আয় লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। তার দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সরকার বলছে— প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজস্ব আহরণের চিত্র বিবেচনায় এ পরিমাণ আদায় সম্ভব নয়। সর্বোচ্চ ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় হতে পারে। ফলে আড়াই লাখ কোটি টাকারও বেশি ঘাটতি তৈরি হবে।
ব্যাংক ঋণনির্ভর অর্থায়নের সমালোচনা করে ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় আরও ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শেষ পর্যন্ত টাকা ছাপানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। বাজেটে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। একই সঙ্গে করব্যবস্থার বিভিন্ন প্রস্তাব সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতির সাথে ব্যাংক ঋণের একটি ইস্যু আছে। আমাদের ১০ লক্ষ্যের অধিক বৈদেশিক ঋণ আছে। স্থানীয়ভাবে ৮ লাখ কোটি টাকা ঋণ ব্যাংকিং খাত থেকে নিয়েছেন। আবার যদি এক লাখ বাড়ে, এভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকের থেকে যদি ঋণ নিতে থাকেন, তাহলে ব্যাংকের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে!
তিনি বলেন, আমাদের অনেক ব্যাংক ডেথ। ফলে এখান থেকেও ঋণ না পেলে বিকল্প হিসেবে আপনাকে টাকা ছাপাতে হবে। যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, কিন্তু আপনি বলছেন, ঘাটতি কমিয়েছি। এটিও জনগণের সাথে একটি প্রতারণার শামিল হয়েছে। তৃতীয়ত, নতুন নিয়ম করা হয়েছে, ব্যাংক একাউন্ট খুলতে গেলে টিএইএন সার্টিফিকেট লাগবে। ফলে মানুষ ফরমাল চ্যানেলে যে টাকা লেনদেন করবে সেটাও করতে তারা ভয় পাবে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের অনেকে করের ভয়ে তা করবে না। ফলে ইনফর্মাল ইকোনোমি বেশি হয়ে গেলে এটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
করমুক্ত আয়সীমা প্রসঙ্গে ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু সরকার সামান্য বৃদ্ধি করেছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য হতাশাজনক। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, এই বাজেটে যদিও কিছু ভালো দিক আছে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তায় কিছু বিষয় মনে হয়েছে।
ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, একটা কথা আছে, যত বড় বাজেট, তত বড় নেতাকর্মীদের পকেট ভারী। এটি করা হয়েছে কী না, সেটিও এখন একটি প্রশ্ন বোধহয়।
তিনি বলেন, এত বড় বাজেটের টাকা কোথা থেকে আয় করবেন, তা তো পরিষ্কারভাবে বলতে হবে। আপনি হয়ত এনবিআরকে একটি লক্ষ্যমাত্রা দিলেন যে, আমাদের এত টাকা দেবেন। কিন্তু এনবিআরকে যে সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটিতে বড় বাধা দেওয়া হয়েছে, এবং আপনারা বড় দল হিসেবে কোনো কথা বলেননি। ফলে এখনকার যে লক্ষ্যমাত্রা, এটি কোনোভাবেই আদায় করা সম্ভব নয়। শেষ বাজেটে ৩ লক্ষ্য ৩০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে। ফলে এখনো অর্ধেক বাজেট মিসিং রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা আহরণে যে সিস্টেমের কথা বলা হয়েছে, এতে আমাদের হিসেবে সর্বোচ্চ চার লাখ কোটি টাকা আয় করা যাবে। তার মানে এখানে আড়াই লক্ষ্য কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে কয়েকদিন পর সরকার টাকা না থাকায় বাজেট কাটছাঁট করবে।
ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় আমরা দেখেছি, ঢাকা শহরে বসবাস করতে অন্তত ৩৬ হাজার টাকা লাগে। ফলে আমরা বলেছিলাম, করমুক্ত আয়সীমা যেন ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা রাখা হয়। কিন্তু সেটি এবার মাত্র ২৫ হাজার বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ধরে করলেও তো ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা হয়। ফলে আপনি ৩১ হাজার টাকার মতো আয় করলেই আপনাকে করের আওতায় আসতে হবে। আমি প্রথমেই বলেছি, এই বাজেট একটি প্রতারণার শামিল বাজেট। কারণ আপনার আয়ের সোর্স ক্লিয়ার না।
আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, বাজেটটি জনকল্যাণমুখী হওয়ার পরিবর্তে একটি জনতুষ্টিমূলক বাজেটে পরিণত হয়েছে। গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন লুটতরাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি যেভাবে দুর্বল করেছে, অর্থনীতিকে বৈদেশিক ঋণ এবং সুদ নির্ভর করেছে। সেই প্রেক্ষিতে আমাদের এই বাজেটটি হওয়া দরকার ছিল একটি ট্রান্সফরমেটিভ বা রূপান্তরগামী বাজেট। যেটি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে ভিত্তিটা ধ্বংস হয়েছে, সে ধ্বংসস্তূপ থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলবে। কিন্তু বাজেটে অর্থনীতির ভিত্তির দিকে, মূল স্টেকহোল্ডারসদের দিকে না তাকিয়ে এটি ম্যানিফেস্টো নির্ভর, একটি বড় এবং শ্বেতহস্তীর মতো বাজেট করা হয়েছে।
এমএম