রোববার দিবাগত রাত ১টায় নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে গতবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
দক্ষিণ আমেরিকার দল আর্জেন্টিনা জিতলে ১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২ সালের পর চতুর্থবারের মতো শিরোপা জিতে নিয়ে বিশ্বকাপ জয়ীদের তালিকায় জার্মানি ও ইতালির সাথে স্থান করে নেবে। ইতালি ও পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মতো টানা দুইবার বিশ্বকাপ জেতার গৌরবও অর্জন করবে তারা।
অন্যদিকে ২০১০ সালে শিরোপাজয়ী স্পেন জিতলে তা হবে তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় এবং ফাইনাল গেলে জয়ী হওয়ার তাদের রেকর্ড শতভাগ অক্ষুণ্ণ রাখবে।
দু’দলই এই টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠেছে।
আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টের নকআউট ম্যাচগুলোর প্রায় প্রতিটিতে ফিরে আসার দারুণ গল্প লিখে চলেছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও মেসির অসাধারণ নেতৃত্বে এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে আনে, এর আগে শেষ ষোলোতেও মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে ফিরে আসার মতো নাটকীয়তা দেখায়।
বিশেষত শেষ ১৫ মিনিটে প্রায় প্রতি ম্যাচেই একাধিক গোল দিয়ে আর্জেন্টিনা নিজেদের দৃঢ় মানসিকতা ও জয়ের তীব্র ইচ্ছার প্রতিফল ঘটিয়েই চলছে।
এখনো পর্যন্ত সাত ম্যাচে আর্জেন্টিনা ১৯টি গোল দিয়েছে যা দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং এই পরিসংখ্যান দলটির দারুণ আক্রমণভাগের প্রমাণ দেয়।
অন্যদিকে স্পেন তুলনামূলকভাবে কম নাটকীয়তায় ফাইনালে উঠেছে।
টুর্নামেন্টজুড়ে দারুণ খেলতে থাকা সেমিফাইনালে ২-০ গোলে হারিয়ে মাটিতে নামিয়েছে ফ্রান্সকে। সেইদিনও স্পেন পুরো খেলা নিয়ন্ত্রণ করেছে।
এর আগের ম্যাচগুলোতে পর্তুগালকে শেষ মুহূর্তের একমাত্র গোলে এবং বেলজিয়ামকে শেষমুহূর্তের দেয়া গোলে ২-১ ব্যবধানে হারায় তারা এবং দুটি ম্যাচেই স্পেনের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
এখন পর্যন্ত সাত ম্যাচ খেলে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে। এই বিশ্বকাপের সাত ম্যাচসহ টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকা স্পেন দলের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে দলটির রক্ষণভাগ সন্দেহাতীতভাবে এই টুর্নামেন্টের সেরা।
সেই হিসেবে বলা যেতে পারে যে বিশ্বকাপের ফাইনালটি হতে যাচ্ছে সেরা আক্রমণ বনাম সেরা রক্ষণভাগের মধ্যে।
তবে দুই দলেরই প্রধান শক্তি মাঝমাঠ দখল করে খেলা। এখন পর্যন্ত খেলাগুলোতে উভয় দলই গড়ে ৬০ ভাগ করে বলের দখল রেখেছে, আর নিজেদের মধ্যে সর্বাধিক পাস দিয়েছে (আর্জেন্টিনা ৪৭৭২, আর স্পেন ৪৫৯২) ।
লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনাও ৪-৩-৩ ছকে খেলছে, যেখানে সামনে মেসি কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। স্কালোনি লেয়ান্দ্রো পারেদেসকে মধ্য মাঝমাঠে খেলাচ্ছেন, তার পাশে আছেন আলেক্সিস মাক এলিস্টার, এনজো ফের্নান্দেজ ও রদ্রিগো দে পাউল, যারা মাঝমাঠ দিয়ে খেলা গড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে উইংয়েও সরে যেতে পারেন।
আক্রমণভাগে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। হুলিয়ান আলভারেজের তীব্র রক্ষণাত্মক প্রেসিং ক্ষমতার কারণে তিনি লাউতারো মার্তিনেজের চেয়ে এগিয়ে থেকে শুরুর একাদশে জায়গা ধরে রাখতে পারেন, কারণ স্পেনের গভীর থেকে বল বাড়ানোর ধরন ভাঙতে এই প্রেসিং জরুরি।
তবে কৌশল ছাপিয়ে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি গত টুর্নামেন্টের মতো একজোট হয়ে খেলা। এই দলটি মেসিকে কেন্দ্র করে নিজেদের উজাড় করে খেলে। খেলার অবস্থা যতোই প্রতিকূলে থাক, এই দলটি প্রয়োজনীয় গোল বের করে ফেলে। বক্সের ভেতর প্রতিপক্ষের একগাদা খেলোয়াড় থাকলে বক্সের বাইরে থেকেই দৃষ্টিনন্দন শটে অথবা এমনকি অপেক্ষাকৃত লম্বা খেলোয়াড়দের বিপক্ষেও দারুণ হেডে কিংবা অবিশ্বাস্য রক্ষণ চেরা পাসে।
দলটির খেলা দেখে মনে হয় মেসিকে বিশ্বকাপ পাইয়ে দিতে প্রতিটি সদস্য নিজেদের সর্বশেষটুকু দিতেও প্রস্তুত। যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা ফুটবল মাঠ যেখানেই হোক, জয়ের জন্য যারা এইরকম মনোভাব ধরে রাখতে পারে সাধারণত জয়টা তাদেরই হয়।
আর ৩৯ বছর বয়সী মেসি যেন দিন দিন নিজেকে ছাপিয়েই যাচ্ছেন। ইতোমধ্যেই টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ৮ গোল দিয়েছেন মেসি, করেছেন ৪টি গোলে সহায়তা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে মোট ২১টি গোল করেও তিনি শীর্ষে। মেসির নেতৃত্ব এবং মেসিকে ঘিরে থাকা আর্জেন্টিনা দলটি যেন আবেগ ও সংহতির এক চূড়ান্ত মাত্রা প্রদর্শন করছে।
অন্যদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন ৪-৩-৩ ছকে খেলছে। আক্রমণে মিকেল ওইয়ারসাবাল, দুই উইংয়ে লামিন ইয়ামাল ও আলেক্স বেইনা এবং মাঝমাঠে রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো। রক্ষণভাগে আইমেরিক লাপোর্তে ও পাউ কুবারসির নেতৃত্বাধীন স্পেনের প্রতিষ্ঠিত কাঠামো যেন একটি দুর্দান্ত দক্ষ যন্ত্র।
দলের মূল কৌশলগত দর্শন হলো বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করা।
রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজ মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর দানি ওলমো, আলেক্স বেইনা ও লামিন ইয়ামাল আক্রমণ গড়া ও রক্ষণাত্মক কাজ- দুটিতেই সাহায্য করছেন।
স্পেন দলটির প্রতিটি খেলোয়াড় অপরের খেলা সমন্ধে ওয়াকবিহাল। বল যখন নিয়ন্ত্রণে থাকে তখন তারা এমন জায়গায় পাস দেয় যেখানে একজন খেলোয়াড় থাকবেন বলে আশা করা যায়। এবং বেশিভাগ সময়ে কেউ না কেউ সেইখানে পৌঁছে যান।
স্পেনের গোলগুলোর বেশিভাগই দলীয় আক্রমণের ফল। দেখে মনে হয় দলটি মাঠে নিখুঁত ফুটবল বিজ্ঞানের চর্চা করে সাফল্য অর্জন করে। এই দলের প্রতিটি খেলোয়াড় নিজেদের স্ব-স্ব ভূমিকা নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন।
সেই হিসেবে বলা যেতে পারে, ফাইনালটি হতে যাচ্ছে একদল তীব্র আবেগী, একজোট শৈল্পিক দলের বিপক্ষে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ও শৃঙ্খলা মেনে চলা একটি দলের।
আর্জেন্টিনা-স্পেন দ্বৈরথের ইতিহাস সমানে সমান। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচসহ সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দুই দল ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে উভয় দলই ৬টি করে ম্যাচ জিতেছে এবং বাকি ২টি ড্র হয়েছে।
তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের সাক্ষাৎ অত্যন্ত বিরল। দুই দল বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল, আর সেটা এতটাই পুরনো যে বর্তমান কোনো খেলোয়াড়ই তখনো জন্মাননি- এমনকি আর্জেন্টিনার কোচ স্কালোনিরও জন্ম হয়নি, আর দে লা ফুয়েন্তের বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর।
সেই ম্যাচটি ছিল ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব, যেখানে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জিতেছিল।
অর্থাৎ রোববারের ফাইনালই হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের প্রথম নকআউট পর্বের সাক্ষাৎ এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চের লড়াই।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বর্তমান ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন দল ফাইনালে একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে।
এছাড়াও আরেকটি আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটছে ৯৬ বছর পর। সেই প্রথম বিশ্বকাপে ১৯৩০ সালে ফাইনালে উঠেছিলো একই ভাষাভাষী দেশ উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। এরপর এবারই প্রথম একই ভাষাভাষী দু’টি দেশ ফাইনালে খেলছে। কাকতালীয়ভাবে, এবারো দু’টি দেশের ভাষা স্প্যানিশ। উপনিবেশিক আমলের কথা বিবেচনা করলে এই ফাইনালটা ভীষণ আবেগী হয়ে উঠতে পারে।
এই ফাইনালের আরেকটি বড় আবেগীয় দিকটি হলো মেসি-ইয়ামাল মুখোমুখি হওয়া। লামিন ইয়ামালের পরিবার একটি দাতব্য র্যাফেলে জিতে ছোটবেলায় লিওনেল মেসির সাথে প্রচারণামূলক ফটোশুটে অংশ নিয়েছিল এবং সেই ছবিটি ২০২৪ ইউরোর পর ইয়ামালের বাবার শেয়ার করার পর ভাইরাল হয়েছিল।
২০০৭ সালে তোলা সেই ছবির প্রায় ১৯ বছর পর সেইদিনের শিশু থেকে জাতীয় দলের তারকা হয়ে উঠা ইয়ামাল এবং সেইদিনের তরুণ থেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি হয়ে উঠা মেসি আন্তর্জাতিক মঞ্চে একে অপরের প্রতিপক্ষ।
মেসি এবং ইয়ামাল যেন একই সাথে দুই দলের প্রতীকও। আর্জেন্টিনা গত আসরের বেশিভাগ খেলোয়াড় নিয়ে এসেছে এবারো। দলটির সদস্যদের গড় বয়স ২৮.৬২ যা নিয়ে ৪৮টি দলের মধ্যে আর্জেন্টিনার অবস্থান ৪০। স্পেনের খেলোয়াড়দের গড় বয়স ২৬.১৯ এবং ৪৮ দলের মধ্যে দেশটির অবস্থান ষষ্ঠ।
সেই হিসেবে বলা যেতে পারে, এই ফাইনালটি হতে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের অন্যতম বয়স্ক বনাম অন্যতম তরুণ দলের মধ্যে। লড়াইটা তারুণ্য বনাম অভিজ্ঞতার।
এই যাবতকালে সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের (৪৮ দল, ১০৪টি ম্যাচ) ফাইনাল ঘিরেও থাকছে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। ফাইনালের ৯০ মিনিট আগে শুরু হবে সমাপনী অনুষ্ঠান, যেখানে হেডলাইনার হিসেবে থাকছেন পোস্ট ম্যালোন। পাশাপাশি টম ক্রুজ, লরা পাউসিনি, নিকোল শেরজিঙ্গার, রবি উইলিয়ামস ও ইউটিউবার আইশোস্পিডও থাকবেন অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে।
প্রাক-ম্যাচ মার্কিন জাতীয় সংগীত গাইবেন জেনিফার হাডসন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো হাফটাইম শো অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে কোল্ডপ্লের ক্রিস মার্টিনের কিউরেট করা এই শো-তে হেডলাইনার থাকছেন ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএস ও জাস্টিন বিবার, সাথে থাকছে দ্য মাপেটসের চরিত্রও।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মাঠে না গেলেও ফাইনালে তার উপস্থিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে সব ছাপিয়ে অতি অবশ্যই মূল আকর্ষণ হবে মাঠের খেলা। সারা দুনিয়ার চোখ থাকবে রক্ষণ বনাম আক্রমণ, আবেগ বনাম শৃঙ্খলা, তারুণ্য বনাম অভিজ্ঞতার লড়াইয়ে; দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে, কে হতে যাচ্ছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন?
সূত্র : বিবিসি
এস