রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ র্যাব-৮ এর সাবেক কর্মকর্তা ও মামলার ১৩ নম্বর সাক্ষী মেজর (অব.) সাব্বির রহমানকে দীর্ঘ জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. সাইদুর রহমান। জেরা চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
চাকরির বিনিময়ে সাক্ষ্যের দাবি নাকচ
বর্তমানে খুলনার ‘বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-তে ডেপুটি এক্সাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত সাব্বির রহমান সাফ জানান, তিনি কোনো অনৈতিক সুবিধার জন্য র্যাব-৮ এ বদলি হননি কিংবা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অসত্য বক্তব্য দেননি। জিয়াউলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার বিনিময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন—আসামিপক্ষের এমন জেরা তিনি দৃঢ়ভাবে নাকচ করে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া নিজের জবানবন্দির সত্যতা পুনর্ব্যক্ত করেন।
‘গলফ প্যাটার্ন’: পেট কেটে ও বস্তা বেঁধে নদীতে সলিলসমাধি
জেরায় সাক্ষীর জবানবন্দিতে উঠে আসে চরম নৃশংসতার চিত্র, যাকে জিয়াউল আহসান বলতেন ‘গলফ অপারেশন’।
যম টুপি ও রশি: বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে জিয়াউল আহসান প্রায় ১৫ থেকে ২০টি এমন ‘গলফ অপারেশন’ চালিয়েছিলেন। হাত বাঁধা এবং যম টুপি পরানো অবস্থায় বন্দিদের গোপনে ট্রলারে পরিবহন করা হতো।
নৃশংস হত্যা: বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানীতে ট্রলারে বন্দিদের মাঝদরিয়ায় নিয়ে জিয়াউলের নির্দেশে পেট কেটে, সিমেন্টের বস্তা বেঁধে এবং মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, যাতে লাশ কোনোদিন ভেসে না ওঠে।
নাটক সাজিয়ে ‘এনকাউন্টার’ ও অস্ত্র উদ্ধার
সাক্ষী সাব্বির রহমান ট্রাইব্যুনালকে জানান, সুন্দরবনের নিশানখালী, কটকা ও মরা ভোলা এলাকায় র্যাবের অভিযানগুলো ছিল মূলত সাজানো এনকাউন্টার।
স্পটিংয়ের নামে আগে থেকেই উপস্থিতি: মূল অভিযানের আগেই জিয়াউলের নেতৃত্বাধীন ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা গোপনে ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নিত।
ভূয়া গোলাগুলি: দস্যুদের একনলা বা দোনলা বন্দুকের পরিবর্তে সেখান থেকে হুইসেল ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ পাওয়া যেত।
ঢাকা থেকে এনে হত্যা: নিশানখালী অভিযানে দু’টি মৃতদেহ পাওয়া গেলেও মামলায় ছয়টি লাশ দেখানো হয়। জিয়াউলের নির্দেশে ঢাকা থেকে চারজনকে এনে সেখানে হত্যা করে মূল অভিযানের সাথে চালিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় ট্রলারমাঝি আলকাছ গুম
সাক্ষীর বিবরণীতে উঠে আসে ট্রলারমাঝি আলকাছ গুম হওয়ার রোমহর্ষক ঘটনা। ২০১১ সালের জুনে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে মাঝি আলকাছকে ‘এলিমিনেট’ (হত্যা) করার নির্দেশ দেন, কারণ আলকাছ চরদুয়ানী বাজারে গলফ অপারেশনের গোপন তথ্য প্রকাশ করে দিচ্ছিল। সাক্ষী অসুস্থতার অজুহাতে অপারেশনে যেতে অস্বীকৃতি জানান। এর কিছুদিন পরই জিয়াউলের নাম করে আলকাছকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সে আর কখনো ফিরে আসেনি।
যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে স্বেচ্ছায় অবসর
ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের মাধ্যমে চলা এসব বেআইনি কর্মকাণ্ড মানসিকভাবে মেনে নিতে না পেরে সাক্ষী নিজের অধিনায়কের কাছে অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু অধিনায়ক তাকে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, "জিয়াকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?"
পরবর্তীতে কোনো প্রতিকার না পেয়ে নিজের ১৮ বছর চাকরি পূর্ণ হতেই ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে ফিরে যান এবং পরবর্তীতে অবসরে যান।
জেরা শেষে সাক্ষী সাব্বির রহমান দৃঢ়তার সাথে জানান, ট্রাইব্যুনালে তিনি যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য এবং জিয়াউল আহসানের নির্দেশেই এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল।
এমএম











