রায় নিয়ে প্রসিকিউশনের প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, শহীদ আবু সাঈদ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম শহীদ। তিনি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার। পৃথিবীর সব মানুষ সেটা অবলোকন করেছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিষয় জাতিসংঘ রিপোর্টে উঠে এসেছে। আমাদের তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ আমরা পেয়েছি। আমরা অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করেছি। ট্রাইব্যুনালে অকাট্যভাবে আসামিদের অপরাধ প্রমাণ করতে পেরেছি। আশা করছি, প্রত্যাশিত বিচার পাব।
এই বিষয়ে প্রসিকিউটর মঈনুল করিম বলেন, আমরা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছি, তারা সবাই এ মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আসামিদের বিরুদ্ধে ২৫ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছি। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রসিকিউশন পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অকাট্যভাবে আসামিদের অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আশা করি, আসামিরা অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি পাবে।
যেভাবে আবু সাঈদকে শহীদ করা হয়
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুর নগরীর লালবাগ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়। পরে দুপুরে পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন প্রথমে আবু সাঈদকে গুলি করেন । প্রথম গুলি আবু সাঈদের পেটে লাগার পর তিনি হতবাক হয়ে যান এবং আবার বুক প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় তাকে পরপর দুটি গুলি করেন। আবু সাঈদ সড়ক বিভাজক পার হয়ে বসে পড়েন। তাকে উদ্ধার করতে গেলে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাওহিদুর হকের শরীরে প্রায় ৬০টি ছররা গুলি লাগে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আবু সাঈদ শহীদ হন।
মামলার বিচার প্রক্রিয়া
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের দিন নির্ধারণের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের পর প্রসিকিউশনের পক্ষে জবাব দেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। এরপর পাল্টা জবাব দেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
গত ২১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ২৫ জানুয়ারি। তিন কার্যদিবসে যুক্তিতর্কে এ মামলার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়। এছাড়া বেরোবি ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সিসিটিভি ফুটেজ ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়, যা ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সময় ধারণ করা হয়েছিল। মামলার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত এসব ভিডিওতে আসামিরা কে কোথায় ছিলেন এবং তাদের কার্যকলাপ শনাক্ত করে দেয় প্রসিকিউশন। একই সঙ্গে ৩০ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়।
এরপর আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলু, আবুল হাসানসহ স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা। তারা তাদের মক্কেলদের বেকসুর খালাস আবেদন জানান।
গত বছরের ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। পলাতক আসামিদের পক্ষে ২২ জুলাই স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় ৩০ জুন। ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।
এ মামলায় বেরোবির তৎকালীন ভিসি হাসিবুর রশীদসহ মোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেনÑএএসআই আমির হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।
পলাতক ২৪ জনের মধ্যে রয়েছেন— বেরোবির সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল, চিকিৎসক সরোয়ার হোসেন (চন্দন), আরপিএমপির সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, সাবেক উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান।
এমএম