>>

কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের সাতটি জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলো, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল। পাশাপাশি চট্টগ্রামের নিচু এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যা।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামে একদিনে ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৯৮৩ সালে দেশে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।

এবারের বৃষ্টি কেন অস্বাভাবিক

সাধারণত বাংলাদেশে সারাবছরের মোট বৃষ্টিপাতের ৭১ শতাংশ হয় বর্ষাকালে। তবে এবারের বৃষ্টিপাতের ধরন ছিল ভিন্ন।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ জানান, এ বছর মৌসুমি নিম্নচাপটি বাংলাদেশের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে সরাসরি পশ্চিমমুখী অগ্রসর হয়েছিল। এর ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের পূর্বদিকের পাহাড়ে আর্দ্র বাতাস আটকে যায় এবং একই এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়।

তিনি আরো জানান, বছরের শুরুতে জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে শক্তিশালী ‘এল নিনো’র প্রভাব এবং অনুকূল আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে অল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।

পাহাড়ধসের মূল কারণ ও মানবসৃষ্ট সংকট

পাহাড়ধস কেবল একদিনের ভারী বৃষ্টির কারণে ঘটে না। কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে মাটি পানি শোষণ করে সম্পৃক্ত হয়ে পড়লে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে যায়, যার ফলে মাটির স্তর ধসে পড়ে। তবে শুধু বৃষ্টি নয়, মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডই এর বড় কারণ।

আবহাওয়াবিদদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা কারণে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক হারে পাহাড় কাটা হয়েছে। ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গাছপালা ও পরিবেশ নষ্ট হয়ে মাটির বাঁধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন আগের চেয়ে কম বৃষ্টিতেই ভূমিধস হচ্ছে।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার জানান, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর বয়স প্রায় ২৫ লাখ বছর এবং এগুলো মূলত বালুময় ক্ষয়িষ্ণু পাহাড়। পাথর হওয়ার মতো বয়স এগুলোর হয়নি। পাহাড় ধ্বংস ও স্বাভাবিক ক্ষয় এক বিষয় নয়। অনিয়ন্ত্রিত বসতি, পাহাড় কাটা এবং উদ্ভিদের বিনাশ—এই তিন কারণেই মূলত পাহাড়ধস ঘটছে।

তিনি আরো বলেন, সিলেটে পাহাড় থাকলেও সেখানে বালি কম ও সিলিকা বেশি থাকায় ধস হয় না। কিন্তু চট্টগ্রামের বালুময় মাটিতে অল্প সময়ে বেশি পানি জমলে মাটির ওজন বেড়ে যায় এবং মাধ্যাকর্ষণের টানে পুরো মাটির স্তর নিচে নেমে ধসের সৃষ্টি করে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও অতীতের চিত্র

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দুর্যোগে নিহত ৫৪ জনের মধ্যে ৫৩ জনই রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাসিন্দা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ঘেঁষা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই দশকে চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড়ধসে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জুন ২৪ ঘণ্টায় ৪২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর লালখান বাজারের মতিঝর্ণাসহ ছয়টি স্থানে ১২৭ জন নিহত হন। এরপর ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ। এছাড়া ২০০৮, ২০১০, ২০১১, ২০১৫ ও ২০১৯ সালেও বহু মানুষ মারা যান।

বর্তমান ঝুঁকি ও সমাধানের উপায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ের মাটি এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। এই ভেজা মাটিতে নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে আলগা হয়ে থাকা অংশ ভেঙে পড়তে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও পরবর্তী পাহাড়ধস কত বড় হবে তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।

ঝুঁকি কমাতে প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার ও আবহাওয়াবিদরা কিছু পদক্ষেপের কথা বলেছেন। যেমন—কোন পাহাড় কতটা খাড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ, তা চিহ্নিত করে আগেই প্রশাসন ও জনগণকে অবহিত করা। পাহাড়ের প্রাকৃতিক রূপ অপরিবর্তিত রাখা এবং নতুন করে পাহাড়ে হাত না দেওয়া। পাহাড় কাটার অপরাধে শাস্তির মাত্রা ও জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বাড়ানো, যাতে কেউ জরিমানা দিয়ে পার না পেতে পারে। পাহাড় কাটার পেছনের অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।

সূত্র: বিবিসি বাংলা