সাকিব জানায়, জন্মের পর থেকে বাবাকে কখনও দেখেনি। বাবা কোথায় আছেন বা কী করেন, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। মা একসময় গার্মেন্টসে চাকরি করলেও বর্তমানে কর্মহীন। ফলে সংসারের দায়িত্বের একটি অংশ এসে পড়েছে তার ছোট্ট কাঁধে।

তার ভাষায়, পরিবারের অভাবের কারণে খুব অল্প বয়স থেকেই কাজ শুরু করতে হয়েছে। আগে টেম্পো ও মাহিন্দ্রা গাড়িতে হেলপারের কাজ করেছে। এখন অটোরিকশায় ভাড়া তোলার কাজ করে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টাকা আয় হয়। সেই অর্থ দিয়ে নিজের খরচ মেটানোর পাশাপাশি মাকেও সাহায্য করে। কখনও কখনও ঠিকমতো খাবার জোটে না, কিন্তু কাজ বন্ধ করলে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

একই রকম সংগ্রামের গল্প শোনাল ১৩ বছর বয়সী রবিউল। চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ কদমতলী এলাকার একটি ওয়ার্কশপে কাজ করে সে। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে দুই বছর আগে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে। তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ।

রবিউল জানায়, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। মাস শেষে যে বেতন পায়, তা মায়ের হাতে তুলে দেয়। ওই অর্থেই সংসারের খরচ চলে এবং বাবার চিকিৎসার ব্যয় মেটানো হয়।

রবিউল বলে, ‘আমার ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া করে বড় কিছু হওয়ার। এখনও যখন বন্ধুদের স্কুলে যেতে দেখি, তখন খারাপ লাগে। কিন্তু পরিবারের প্রয়োজনের কথা ভেবে কাজ করতেই হচ্ছে। দীর্ঘ সময় কাজের কারণে শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়, হাত-পায়ে ব্যথাও হয়। তারপরও সংসারের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

উদ্বেগজনক বাস্তবতা

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার শিশু শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগর ও জেলার বিভিন্ন খাতে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। পরিবহন খাত, অটোগ্যারেজ, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা, ওয়ার্কশপ এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, যখন স্কুলে ক্লাস শুরু হয়, তখন অনেক শিশু বই-খাতা হাতে নয়, বরং রেঞ্চ, হাতুড়ি কিংবা অন্যান্য কাজের সরঞ্জাম হাতে নিয়ে কর্মস্থলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া তাদের শ্রমবাজারে ঠেলে দিচ্ছে।

শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত থাকার হার বর্তমানে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১২ লাখ অতিরিক্ত শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)-এর হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, শিশুশ্রম শিশুদের শুধু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে না, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

তার মতে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুরা দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকে। সরকার শিশুশ্রম নির্মূলে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ লক্ষ্যে আরও কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাখো শিশু

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কিছুটা কমলেও কর্মরত শিশুর সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক। বর্তমানে ১০ লাখের বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে এবং তাদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে।

জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমে যুক্ত রয়েছে, যা দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করণীয়

চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ ও ভারী শ্রম থেকে রক্ষা করতে হলে শিশুশ্রমবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে।

শিশুশ্রম বৃদ্ধির পেছনে যেসব কারণ

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাব শিশুশ্রম বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। তারা মনে করেন, দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা, শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব নয়।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী হারুনুর রশীদ রুবেল বলেন, চট্টগ্রামে বিশেষ করে পরিবহন খাত, ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ, শুঁটকিপল্লি ও ইটভাটায় শিশুদের শ্রমিক হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। শ্রমের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে সচেতন না থাকায় অনেক শিশু শোষণের শিকার হয়। অন্যদিকে, আর্থিক সংকটের কারণে অনেক পরিবারও শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়।

তার মতে, শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ কারণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এনএইচ