উল্লেখ্য, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজীকরণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে গত ১৬ মার্চ ২০টি বিশেষ উদ্যোগের ঘোষণা দেয় ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এ বিষয়ে জানান, “বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি ও স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, এই পরিকল্পনা তারই অংশ। আমরা মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন, সেবার গুণগত মান বাড়ানো এবং বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের পাইপলাইন তৈরিতে জোর দিয়েছি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, তবে বড় প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে।”
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রোচি বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, উদ্যোগগুলোকে প্রধানত তিনটি স্তম্ভের অধীনে ভাগ করা হয়েছে— শক্তিশালী অবকাঠামো, সমন্বিত বিনিয়োগ সহায়তা এবং গতিশীল বিনিয়োগ উন্নয়ন।
বাস্তবায়িত ৭টি প্রধান উদ্যোগ ও সার্বিক অগ্রগতি
১. লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল: ৫৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে। এপিএম টার্মিনালস ২০৩০ সালের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ করবে। এটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়বে এবং ৭০০’র বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে।
২. চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল: চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের সামগ্রিক বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে (যার মধ্যে ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সক্রিয়)।
৩. চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪/৭ কার্যক্রম: কাস্টমস ছাড়পত্র এবং ব্যাংকিং সেবাসহ চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বক্ষণিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা পণ্য খালাসের সময় ও ব্যবসায়ীদের অযাচিত বিলম্ব অনেক কমাবে।
৪. এক ছাতার নিচে সমন্বিত বিনিয়োগসেবা: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) বিনিয়োগ কার্যক্রম একীভূত করে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ'-এর যাত্রা শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে জমি, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পিপিপি সংক্রান্ত সার্বিক সুবিধা এক ছাতার নিচে মিলবে।
৫. দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সিইপিএ চুক্তি: বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পন্ন হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ায় অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে এবং ৮,৪২৮টি পণ্যে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ ইলেকট্রনিকস ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতে বড় বিনিয়োগের পথ সুগম হয়েছে।
৬. প্রধানমন্ত্রী-ব্যবসায়ী সংলাপের সাফল্য: বিনিয়োগকারীদের সমস্যা দ্রুত মেটাতে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী-ব্যবসায়ী সংলাপে উত্থাপিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টি সমাধান করা হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অগ্রগতির মুখ দেখা গেছে।
৭. নতুন এফডিআই প্রণোদনা কর্মসূচির অনুমোদন: দেশে বিদেশি মূলধন আনতে সক্ষম যোগ্য ব্যক্তিদের সংগৃহীত ইক্যুইটির ১.২৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর নির্দেশিকা অনুমোদিত হয়েছে এবং আগামী ১৫ অক্টোবর ডেডিকেটেড ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে এ কর্মসূচি শুরু হবে।
পাইপলাইনে ১৩০ কোটি ডলার ও বাকি ১৩ উদ্যোগের চিত্র
নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনার অংশ হিসেবে চীন থেকে ৬০ কোটি ডলার, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি ডলার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রবাহের আশা করা হচ্ছে। খাতভিত্তিক বিচারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ৩০ কোটি ডলার করে এবং স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে ২০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রক্রিয়াধীন বাকি ১৩টি বড় উদ্যোগ:
নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি): সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্বখ্যাত লজিস্টিকস অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর সাথে পিপিপি কাঠামোর আওতায় আগামীকাল চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্ষমতা আনবে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল: ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালু হতে যাওয়া এ টার্মিনালের ফলে বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১৫০% বেড়ে ৫ লাখ টনে উন্নীত হবে এবং ৬ হাজার প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
অন্যান্য প্রকল্প: মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, প্রথম পিপিপি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ), ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ, চীনের গুয়াংজুতে কার্যালয় স্থাপন, এবং দেশব্যাপী শিল্প খাতের ম্যাপিং বা 'এফডিআই হিটম্যাপ'।
এছাড়া দ্রুততম সময়ে সার্ভিস দিতে ৩ দিনের ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ’ ও ১৪ দিনের ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ চালুর কাজ চলছে। ৫টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা ১০ হাজার একরের বেশি জমিতে ৪৪টি প্রজেক্ট পোর্টফোলিও তৈরির কাজও শেষ পর্যায়ে, যা দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ও অনুমোদনজনিত জটিলতা দূর করে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করবে।সূত্র: বাসস
এমএম











