গানজুড়ে রয়েছে, এক গায়কের শূন্য থেকে সফল হওয়ার গল্প। যাকে তার বাবা হারমোনিয়াম কিনে দেয়, কিন্তু গ্রামবাসী গানের চর্চা করতে দেয় না। গান গাওয়ার অপরাধে তার নামে মামলা হয়, বাড়িছাড়া হতে হয়। এমনকি তাকে ও তার বাবাকে মারও খেতে হয়।
সেই অবর্ণনীয় কষ্টের ঘটনা নিছক গল্প নয়, মনির খানেরই জীবনের অংশ। সম্প্রতি মাছরাঙা টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে তা-ই জানালেন শিল্পী। মনির খান জানান, তাদের বাড়ির পাশেই মসজিদ। ফলে গানের চর্চা করায় এলাকার অনেকেই বিরোধিতা করতেন। এমনকি তার নাম ৭-৮টি মামলাও করা হয়েছিল। থাকতে হতো পালিয়ে পালিয়ে।
মনির খান জানান, ছোটবেলা থেকেই তার গানের গলা ভালো ছিল। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় না বুঝেই প্রথম হয়ে যেতেন। এই দেখে শিক্ষক বাবা ভাবলেন, ছেলেকে গান গাওয়ানো যেতে পারে। তাই এসএসসি পরীক্ষার পর ছেলেকে কিনে দেন হারমোনিয়াম। সেটা নিয়েই গানের চর্চা করতেন।
বাবার সঙ্গে মনির খান
স্মৃতি হাতড়ে মনির খান বলেন, ‘সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা পেতাম। কিন্তু আমার বাবা পাশে ছিলেন, আমার ভেতরের প্রতিভা তিনি সেটাকে সামনে আনার জন্য যত বাধা আসুক, সেটা তিনি অতিক্রম করতে প্রস্তুত ছিলেন। মসজিদের পাশে আমাদের পুরনো বাড়ি ছিল। হুজুররা এসে অভিযোগ করতেন। এক পর্যায়ে তো বেশ সমস্যাই হলো, আমার নামে ৭-৮টা মামলা করা হলো। কারাগারে গেলাম, জামিন নিলাম কাঠগড়ায় গান গেয়ে! লম্বা ইতিহাস।’
গানের চর্চার কারণে একবার এলাকার কিছু লোক এসে হামলাও করেছিল মনির খানের বাড়িতে। তিনি জানান, সে সময় তিনি হারমোনিয়ামটি বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন, আর তাকে রক্ষার জন্য বাবা এগিয়ে আসেন। সে সময় বাবার পিঠেও আঘাত লাগে। ভেঙেছিল হারমোনিমের একটি অংশ। সেই ভাঙা অংশ মেরামত না করেই স্মৃতিটা রেখে দিয়েছেন শিল্পী। এখনো সেই হারমোনিয়াম একইভাবে রেখে দিয়েছেন তিনি।
গ্রামে এত এত ঝামেলা, আবার গানে বড় হওয়ার স্বপ্ন, দুই মিলিয়ে ঢাকায় আসেন মনির খান। সে সময় বাবার জমানো ৪০ হাজার টাকা ছিল সঙ্গে। আসেন গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক মিল্টন খন্দকারের কাছে। যাকে ‘সংগীত পিতা’ বলে মানেন মনির খান। তার কথা-সুরেই মনির খানের সিংহভাগ জনপ্রিয় গান এসেছে।
শিল্পী জানান, ওই ৪০ হাজার টাকা মিল্টন খন্দকার নেননি। বরং ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে মনির খানকে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। গান করতে করতেই একদা বাবার ওপর আক্রমণের সেই ঘটনা জানান মিল্টনকে।
মিল্টন খন্দকার ও মনির খান
মনির খান বলেন, ‘আমি পাশাপাশি বসে ঘটনাটি মিল্টন ভাইকে বললাম। এক পর্যায়ে দেখি, তার চোখ ভিজে গেছে। পাঁচ-সাত দিন পর তিনি আমাকে ডাকেন, গানের কথা-সুর শুনে খুব পছন্দ হলো। আমার কণ্ঠে রেকর্ডিং করা হলো। ডেমো ভয়েস দিয়েই ক্যাসেট রেকর্ড করে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। বাবাকে সেটা শোনালাম, তিনিও অবাক হলেন। পরে বাবা ক্যাসেল প্লেয়ার নিয়ে এলাকার মানুষের সামনে গিয়ে গিয়ে সবাইকে গানটি শোনাতেন। ছেলেকে নিয়ে গর্ব করতেন, আনন্দ অশ্রু ঝরাতেন।’
প্রসঙ্গত, মনির খানের বাবা মাহবুব আলী খান মারা গেছেন ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। বাবার শেখানো আদর্শ আর দিকনির্দেশনা মেনেই তিনি পথ চলেছেন, এখনো চলছেন।
এমএম











